দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্যগুলোর একটি এখন মৌলভীবাজার। ছোট-বড় মিলিয়ে এ জেলায় প্রায় ৫০টি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ২১টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে এখানে বসবাস করছেন। একটি জেলায় একসঙ্গে এত পর্যটন আকর্ষণ খুব কমই দেখা যায়।
এর মধ্যে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ হচ্ছে প্রধান পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলা। বিশেষ করে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মণিপুরি সম্প্রদায় অধ্যুষিত কমলগঞ্জ পর্যটন আকর্ষণে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকরা প্রতিদিন ছুটে আসছেন এই উপজেলায়।
কমলগঞ্জের অন্যতম আকর্ষণ লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান। শুধু বাংলাদেশ নয়, আন্তর্জাতিকভাবেও এর পরিচিতি রয়েছে। পরিচিতির দিক থেকে সুন্দরবনের পরেই এর অবস্থান।
১২৫০ হেক্টর আয়তনের এই বন জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। ইতিহাস থেকে জানা যায়, ১৯২৫ সালে ব্রিটিশ সরকার এখানে বৃক্ষায়ণ শুরু করে। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী ১৯৬ সালের ৭ জুলাই এটিকে জাতীয় উদ্যান হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
উদ্যানটিতে ৪৬০ প্রজাতির দুর্লভ উদ্ভিদ ও প্রাণী রয়েছে। এর মধ্যে ১৬৭ প্রজাতির উদ্ভিদ, ৪ প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির সরীসৃপ, ২৪৬ প্রজাতির পাখি এবং ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী রয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় উল্লুকের জন্য এই বন বিশেষভাবে বিখ্যাত। বিখ্যাত পাখি বিশারদ ডেভিড জনসন ও পল থমসন লাউয়াছড়াকে ‘পৃথিবীর অন্যতম উন্মুক্ত চিড়িয়াখানা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
বনের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে অনেক পাহাড়ি ছড়া। প্রকৃতি ভ্রমণের জন্য রয়েছে ৩টি ট্রেইল। শীত ও বসন্তে এখানে পর্যটক, শিক্ষার্থী ও গবেষকদের সবচেয়ে বেশি আনাগোনা থাকে।
লাউয়াছড়ার পাশেই রয়েছে মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জী। ১৯৫০ সালে হলিউডের বিখ্যাত সিনেমা ‘অ্যারাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড ইন এইটি ডেজ’-এর কিছু দৃশ্য এখানে ধারণ করা হয়েছিল।
কমলগঞ্জ উপজেলার মাধবপুর লেক চারদিকে সুউচ্চ সবুজ চা বাগানের মাঝখানে অবস্থিত। লেকের ঝকঝকে পানি, নিরিবিলি পরিবেশ ও শাপলা ফুল একে দৃষ্টিনন্দন করে তুলেছে।
খানাখন্দে ভরা চা বাগানের রাস্তা দিয়ে এখানে যেতে হয়। শীতকালে অতিথি পাখির দল আসে এই হ্রদে। লেকের দুই পাশে টিলায় টিলায় ছড়ানো চায়ের গাছ। প্রতিবছর হাজার হাজার দেশি-বিদেশি পর্যটক এখানে আসেন। ভানুগাছ চৌমুহনা থেকে লেকটির দূরত্ব প্রায় ৬ কিলোমিটার।
কমলগঞ্জের হাম-হাম জলপ্রপাত এখন রোমাঞ্চপ্রিয়দের তীর্থস্থান। ২০১০ সালে পর্যটন গাইড শ্যামল দেববর্মার সঙ্গে একদল পর্যটক গহিন জঙ্গলে এটি আবিষ্কার করেন।
উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে ইসলামপুর ইউনিয়নের কুরমা বনবিটের প্রায় ৮ কিলোমিটার অভ্যন্তরে এর অবস্থান। সরাসরি সড়ক নেই, শেষ ৮ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে যেতে হয়। যেতে সময় লাগে প্রায় ৩ ঘণ্টা।
প্রায় ৩০ ফুট প্রশস্ত ও ১৩৩ ফুট উচ্চতাবিশিষ্ট এই জলপ্রপাতটি বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ। জলপ্রপাতের অর্ধকিলোমিটার দূর থেকেই শোনা যায় জলধ্বনি। পথে দেখা মিলবে ডুমুর গাছ, বেতবাগান ও চশমা বানরের।
কমলগঞ্জে আরও রয়েছে পদ্মছড়া লেক, ক্যামেলিয়া লেক, পাত্রখোলা লেক, বাম্বোতল লেক, শমশেরনগর গল্ফ মাঠ ও বিমানবন্দর।
শমশেরনগর চা বাগানের ক্যামেলিয়া লেক স্থানীয়দের কাছে ‘বিসলার বান’ নামে পরিচিত। চা বাগান কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে এখানে ঘুরে আসতে পারেন।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমান স্মৃতি কমপ্লেক্সও এখানকার অন্যতম দর্শনীয় স্থান। পথেই পড়বে মণিপুরিদের সবচেয়ে বড় রাস উৎসবের স্থান শিববাজার জোড়া মন্দির।
দেশের যেকোনো প্রান্ত থেকে বাসে মৌলভীবাজার হয়ে কমলগঞ্জ আসতে হবে। রেলপথে ঢাকা থেকে সিলেটগামী আন্তঃনগর ট্রেনে কমলগঞ্জের ভানুগাছ বা শমশেরনগর স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে সিএনজি বা অটোরিকশায় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে যাওয়া যায়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, চা বাগান ও ইকো রিসোর্টে ভরা কমলগঞ্জ সত্যিই প্রকৃতির এক জীবন্ত জাদুঘর। ছুটির দিনে পরিবার-বন্ধু নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন চায়ের রাজ্য থেকে।
সময়ের আলো/আতা