মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বিস্তীর্ণ সবুজে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এখন শুধু পর্যটনকেন্দ্র নয়, এটি দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা, প্রাকৃতিক গবেষণাগার ও ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। গভীর অরণ্যের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, বিরল বন্যপ্রাণী ও বৈচিত্র্যময় উদ্ভিদরাজি প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের পর্যটকদের আকৃষ্ট করছে।
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের আওতাধীন এ বনাঞ্চলের ইতিহাসও বেশ পুরোনো। ১৯২০ সালে প্রায় ১ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকাজুড়ে প্লান্টেশন থেকে গড়ে ওঠা বন ধীরে ধীরে ঘন প্রাকৃতিক বনের রূপ ধারণ করে। পরবর্তীতে, ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইন অনুসারে প্রায় ২ হাজার ২৫০ হেক্টর এলাকা নিয়ে ১৯৯৬ সালে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান প্রতিষ্ঠা করা হয়।
লাউয়াছড়ার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য এর সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। এখানে রয়েছে মিশ্র চিরহরিৎ বন, বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্ম ও বুনো অর্কিড। পাশাপাশি বিভিন্ন প্রজাতির উভচর, স্তন্যপায়ী ও পাখির বিচরণও এ বনকে করেছে বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। উল্লুক, বানর, হনুমান, ধনেশ, শ্যামা, অজগর ও মেছোবাঘসহ নানা বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে এ উদ্যানের আকর্ষণ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
শুধু বিনোদনের জন্য নয়, শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রেও লাউয়াছড়ার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও গবেষকরা জীববৈচিত্র্য, বন ও পরিবেশ নিয়ে গবেষণার কাজে এখানে আসছেন। ফলে লাউয়াছড়া ধীরে ধীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক গবেষণাক্ষেত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।
সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বদলে গেছে এ উদ্যানের পর্যটনচিত্রও। গত কয়েক বছরে রেকর্ডসংখ্যক দেশি-বিদেশি পর্যটকের সমাগম ঘটেছে। পর্যটকদের সুবিধা বাড়াতে ইতোমধ্যে জাতীয় উদ্যান কার্যালয়, তথ্যকেন্দ্র, পর্যটক থাকার ব্যবস্থা, পিকনিক স্পট, বাঁশের তৈরি অবকাঠামো, টয়লেট, টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন সুবিধা গড়ে উঠেছে। রয়েছে একাধিক হাইকিং ট্রেইল, যার মাধ্যমে পর্যটকরা গহিন অরণ্যের সৌন্দর্য কাছ থেকে উপভোগ করতে পারেন।
তবে লাউয়াছড়ার প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় পর্যটন ব্যবস্থাপনায় আরও পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, প্লাস্টিক ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ এবং বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্র সুরক্ষার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিয়ে পরিবেশবান্ধব পর্যটন নিশ্চিত করা জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লাউয়াছড়াকে দেশের অন্যতম আদর্শ ইকো-ট্যুরিজম কেন্দ্রে পরিণত করা সম্ভব। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ হবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, শিক্ষা, গবেষণা ও পর্যটনের সমন্বয়ে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান তাই শুধু শ্রীমঙ্গলের নয়, পুরো বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদ। এর সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই বন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রকৃতিপ্রেমীরা।
সময়ের আলো/আতা