তুরাগ নদীবেষ্টিত এই দ্বীপসদৃশ জায়গায় অবস্থিত বিরুলিয়া জমিদার বাড়িটি আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ভাবুন তো, চারপাশে নদী, মাঝখানে কিছুটা জায়গা দ্বীপের মতো, আর সেই দ্বীপে জমিদার বাড়ি। কত সুন্দর হতে পারে জায়গাটা! আজ আপনাদের তেমনই এক জমিদার বাড়ির গল্প শোনাব।
ভ্রমণের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে প্রথমে কারওয়ান বাজার থেকে মেট্রোতে উঠে নামলাম পল্লবীতে। তখন দুপুর ম্লান হতে শুরু করেছে। পল্লবী থেকে সিএনজি নিয়ে চলে গেলাম মীরপুর বেড়িবাঁধের সোনালি বাজারে। সেখান থেকে বাস কিংবা অটোতে করে যাওয়া যায় বিরুলিয়া ঘাটে। আমরা অটোতে করেই গেলাম। বিরুলিয়া ঘাট থেকে নৌকায় তুরাগ নদী পার হয়ে পৌঁছে গেলাম আমাদের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে।
জমিদার নলিনী মোহন সাহার প্রপৌত্রের বাড়ি।
আমরা আতিথেয়তা গ্রহণ করলাম জমিদার নলিনী মোহন সাহার প্রপৌত্রের বাড়িতে। যে ঘরে বসে ছিলাম, সেটি জমিদার নলিনী মোহন সাহারই একটি জরাজীর্ণ পুরোনো বাড়ি। ঘরটি আগে আস্তাবল ছিল। জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার পর আস্তাবলও অপ্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। একসময় অনেকদিন পর্যন্ত সেখানে কেউই থাকতেন না। তারপর বসবাসের উপযুক্ত করে ঘরটিতে তারা বসবাস করতে শুরু করেন। উঁচু সিলিং, নিখুঁত কারুকাজ দেখছিলাম মুগ্ধ চোখে। খানিক বাদে দোতলা পেরিয়ে চলে গেলাম ছাদে। ছাদ থেকে তুরাগ নদী এত সুন্দর লাগছিল দেখতে!
এখানে জমিদার বাড়ি ছাড়াও কিছু ধনী বণিকের বাড়িও ছিল।
এখন আর জায়গাটি আগের মতো সুন্দর নেই। দখলদাররা অনেককিছুই দখল করে নিয়েছে। গড়ে উঠেছে ঘিঞ্জি বাড়িঘর। পুরোনো বাড়িগুলোর অবস্থাও নাজুক। চোখ বন্ধ করে অনুভব করার চেষ্টা করলাম, অনেক বছর আগে এখানে জমিদার কিংবা গুটিকয়েক ধনী বণিক ছাড়া অন্য কারও বাড়ি ছিল না। জমিদারবাড়ির প্রতিটি ভবন ছিল নান্দনিক সৌন্দর্য ও আভিজাত্যে ভরপুর। চারপাশজুড়ে ছিল মোহনীয় তুরাগ নদী। কী অপূর্ব সুন্দর লাগত তখন এই জায়গাটা!
ছাদ থেকে নিচে নামার পথে দোতলার বারান্দায় চোখ আটকে গেল। দেয়ালের গা ঘেঁষে জন্মানো লতাগুলো দুলছে নদী ছুঁয়ে ভেসে আসা বাতাসে। বারান্দায় একটা পাটি বিছানো, কিন্তু কেউ নেই সেখানে; অদ্ভুত মন কেমন করা শূন্যতা ভর করেছে তাতে। ইচ্ছে করছিল, অনেকক্ষণ বসে থাকি ওই বারান্দায়।
যত্নের অভাবে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনাগুলোর এখন জরাজীর্ণ অবস্থা।
কিন্তু আমাদের নামতে হলো; দোতলার বাসিন্দা ও বারান্দার সঙ্গে আলাপ না জমিয়েই। তারপর আমরা পাড়া ঘুরতে বের হলাম। দশটিরও বেশি পুরোনো স্থাপনা ঘুরে দেখলাম। তার ভেতর জমিদার রজনীকান্ত ঘোষের মূল বাড়ি অন্যতম, যা বর্তমানে বিরুলিয়া জমিদার বাড়ি নামে পরিচিত। বিরুলিয়ার এই বিখ্যাত জমিদারের কলকাতায় ছিল কাপড় ও কাপড়ের রঙের ব্যাবসা। জমিদার নলিনী মোহন সাহার কাছ থেকে ৮ হাজার ৯৬০ টাকা ৪ আনি দিয়ে বাড়িটি কিনে নিয়েছিলেন তিনি। আগে জমিদার বাড়ি সংলগ্ন ভবন ছিল ১৪-১৫টি। কালের পরিক্রমায় এখন টিকে আছে ৭-৮টি। তবু, যেটুকু দেখতে পেলাম, তাতেই তৃপ্ত থাকার চেষ্টা করলাম।
রজনীকান্ত ঘোষের মূল বাড়ি ও আরও একটি ভবন।
বিরুলিয়া গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাই সেখানে মন্দিরও রয়েছে। মন্দির লাগোয়া তিনতলা জমিদার বাড়িটি বণিক বাড়ি নামেও পরিচিত। এটিই ছিল জমিদার রজনীকান্তের থাকার ঘর। ঝুল বারান্দা বাড়িটির সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। পুরান ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় রজনীকান্ত ঘোষের আরও কয়েকটি বাড়ি ছিল; যা ১৯৬৪ এর দাঙ্গা এবং বিভিন্ন সময় অন্যেরা দখল করে নেয়। বর্তমানে বিরুলিয়ার এই বাড়িটি ছাড়া রজনীকান্তের আর কোনো সম্পত্তি অবশিষ্ট নেই। বাড়িটিতে আছে সদরঘর, বিশ্রামঘর, বিচারঘর, পেয়াদাঘর, ঘোড়াশালসহ উল্লেখযোগ্য আরও কিছু ঘর। একটি ঘাটও আছে সেখানে। সেই ঘাটেই একসময় ভিড়ত জমিদার বাবুদের বড় বড় বজরা নৌকো।
জমিদার বাড়ির ছাদ থেকে তুরাগ নদীর দৃশ্য এবং সেই ঘাট, যেখানে একসময় জমিদারদের বজরা ভিড়ত।
জমিদারবাড়ির কারুকাজের নানা অংশ মনে করিয়ে দেয় শত বছরের আভিজাত্য। ভবনের নানা অংশ এখনও সেই সময়কার ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে। জমিদারবাড়ির মূল ভবনের জানালাগুলো মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছিল। প্রতিটি ভবনে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশের জন্য রয়েছে একাধিক জানালা। বাড়ির দেয়াল ফুল, পাখি, লতাপাতার নকশায় সজ্জিত। বর্তমানে তার বংশধরেরা বাড়িটিতে বসবাস করছেন।
প্রতি বৈশাখী ও দুর্গাপূজায় নিজ বাড়ির আঙিনায় দশমী মেলা বসাতেন রজনীকান্ত ঘোষ। এখনও শতবর্ষী বটবৃক্ষের ছায়ায় প্রতি পহেলা বৈশাখে বসে মেলা। ঐতিহ্যবাহী মেলাটি ঘুরে দেখতে দূরদূরান্ত থেকে অনেক মানুষ ছুটে যান সেখানে।
ভবনগুলোতে এখন জমিদারদের উত্তরাধিকাররা বসবাস করেন।
দেখতে দেখতে আমরা তুরাগ নদীর ধারে এসে দাঁড়ালাম। তখন সন্ধ্যা আসি আসি করছে। সেখান থেকে দেখতে পেলাম, সামনে নদীর ভেতর একটা শ্মশানঘাট। জানতে পারলাম, দ্বীপটিতে একসময় তারকচন্দ্র সাহা, গোপিবাবু, নিতাইবাবু নামে ধনী ব্যবসায়ীরা বসবাস করতেন। তারা বংশী, ধলেশ্বরী ও তুরাগ নদীপথে ব্যাবসা-বাণিজ্য করতেন। আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের পূর্বজরাও এখানে থাকতেন। আর ওই শ্মশানঘাটটাও তাদেরই। এমনকি কলকাতায় আদি ঢাকেশ্বরী বস্ত্রালয়ের প্রধান শো-রুমে ওই শ্মশানঘাটের ছবি বড় করে টাঙানো আছে। ওই ছবি প্রমাণ করে, তারা তাদের শিকড়কে ভুলে যায়নি, আজও পরম যত্নে লালন করছে।
নদীর ধারে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। ডিঙি নৌকা ভেসে যাচ্ছিল আপনমনে। সেই মুগ্ধতায় ভরা দৃশ্য চোখে নিয়ে ফেরার পথ ধরলাম। নৌকায় পার হয়ে অটোতে করে চলে গেলাম চটবাড়ি ঘাটে। সেখানে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে মীরপুর বেরিবাঁধের সোনালি বাজারে এসে জম্পেশ ঝালমুড়ি খেয়ে ফিরে এলাম বাসায়।
কীভাবে যাবেন
যেকোনও জায়গা থেকে বিরুলিয়া ঘাটে চলে আসুন। তারপর নৌকায় দুই মিনিটের নদীপথ পেরোলেই পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। বিরুলিয়াতে এলে আরও ঘুরে দেখতে পারেন গোলাপগ্রাম। হাজার হাজার গোলাপের সমারোহ আপনাকে মুগ্ধ করবে নিশ্চিত।
কী খাবেন
চা, বিস্কুট, ঝালমুড়ি, কোল্ড ড্রিংকসের মতো হালকা খাবার খেতে চাইলে বিরুলিয়া বাজারে যেতে পারেন।
কোথায় থাকবেন
বিরুলিয়া গ্রামে থাকার ব্যবস্থা নেই। সেখানে সাধারণত সবাই সাময়িক সময়ের জন্যেই ঘুরতে যায়। তবে, পরিচিত কারও বাড়ি থাকলে আলাদা ব্যাপার।
সতর্কতা
যেহেতু জায়গাটি নদীবেষ্টিত, তাই সতর্ক থাকা উচিত, বিশেষ করে যারা সাঁতার জানেন না তাদের অবশ্যই অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। এ ছাড়া, স্থানীয় বা দখলদারদের সঙ্গে সচেতনভাবে আন্তরিক ব্যবহার করুন।