কাপ্তাইয়ে লিচুর দ্বীপ ‘গরবা গুদি’, ঘোরাঘুরির আদর্শ ঠিকানা

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

কাপ্তাই হ্রদের ভেতর অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপের দেখা মেলে রাঙামাটিতে। তেমনই এক দ্বীপ গরবা গুদি, যাকে লিচুর দ্বীপ বললেও ভুল

2026-05-16T20:15:37+00:00
2026-05-16T21:06:15+00:00
 
  শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬,
১ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
কাপ্তাইয়ে লিচুর দ্বীপ ‘গরবা গুদি’, ঘোরাঘুরির আদর্শ ঠিকানা
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: শনিবার, ১৬ মে, ২০২৬, ৮:১৫ পিএম  আপডেট: ১৬.০৫.২০২৬ ৯:০৬ পিএম
গ্রাফিক : সময়ের আলো
কাপ্তাই হ্রদের ভেতর অসংখ্য ছোট ছোট দ্বীপের দেখা মেলে রাঙামাটিতে। তেমনই এক দ্বীপ গরবা গুদি, যাকে লিচুর দ্বীপ বললেও ভুল হবে না। কারণ এই দ্বীপে আছে ১০০টিরও বেশি লিচু গাছ। গ্রীষ্ম মৌসুমে পুরো দ্বীপ লিচুর লাল আভায় ভরে ওঠে।

কাপ্তাইয়ের সেই ছোট্ট দ্বীপে গড়ে উঠেছে রাঙামাটি জেলার প্রথম হোম স্টে। সেখানে গেলে থাকা যাবে চাকমাদের বাড়ি, খাওয়া যাবে তাদের হাতের রান্না, শীতকালে উপভোগ করা যাবে ক্যাম্পিং। বারবিকিউ, নৌকা চালানো, হ্রদের জলে গোসল করা, আদিবাসীদের বিভিন্ন কার্যক্রম দেখারও সুযোগ আছে। এ ছাড়া সারাক্ষণ আপনাকে কাপ্তাই হ্রদের জল আর পাহাড় সারির স্নিগ্ধতা তো মুগ্ধ করে রাখবেই। 

প্রথমে শুধু রেষ্টুরেন্ট হলেও, পরে গরবা গুদিকে হোম স্টে হিসেবেও গড়ে তোলা হয়।

প্রথমে শুধু রেষ্টুরেন্ট হলেও, পরে গরবা গুদিকে হোম স্টে হিসেবেও গড়ে তোলা হয়।


এই সুন্দর দ্বীপের স্বত্বাধিকারী নিলা চাকমা। নিলার জন্ম ও বেড়ে ওঠা পাহাড় এবং হ্রদবেষ্টিত জেলা রাঙামাটিতে। চাকরির পেছনে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে একপর্যায়ে সিদ্ধান্ত নিলেন কাপ্তাই লেকের যে দ্বীপে তার বাড়ি, সে দ্বীপটিকে গড়ে তুলবেন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে। সেই ভাবনা থেকেই প্রথমে শুরু করলেন ‘গরবা গুদি’ রেস্তোরাঁ, তারপর হোমস্টে। এখন বছরজুড়ে গরবা গুদিতে লেগে থাকে পর্যটকদের আনাগোনা। 


আশপাশে কোনও কোলাহল নেই, চারদিকে সবুজের ছোঁয়া। নৌকা আর মাঝিদের চলাচলের শব্দে সেখানে সময় যেন বয়ে চলে আপন গতিতে। রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মগবান ইউনিয়নের কাপ্তাই নেভি ক্যাম্পের বিপরীতে, দোখাইয়াপাড়া এলাকায় এই নির্জন দ্বীপটির অবস্থান।

‘গরবা গুদি’অর্থ কী- জানতে চাইলে নিলা বলেন, “চাকমা ভাষায় ‘গরবা’ মানে মেহমান, আর ‘গুদি’ মানে ঘর। অর্থাৎ গরবা গুদি মানে অতিথি বা মেহমানের ঘর।” প্রকৃতির ছোঁয়া রেখে নিলা নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলেন মেহমানদের এই ঘরকে। 

পর্যটনশিল্প কিংবা গরবা গুদি নিয়ে নিলার কিছু স্বপ্ন আছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের আশপাশের গ্রামের মানুষ খুব গরিব। বেশিরভাগই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এসব জনগোষ্ঠীকে পর্যটন খাতে সম্পৃক্ত করার ইচ্ছে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি চাই বাংলাদেশে প্রচুর হোমস্টে গড়ে উঠুক। পর্যটনশিল্পে হোমস্টে খুব জরুরি। বিভিন্ন দেশেই এই হোমস্টের কালচার বা সুব্যবস্থা থাকলেও আমাদের দেশে তা নেই বললেই চলে। পাহাড়, গাছ, নদী-নালা ভরাট করে গড়ে তোলা হয় বড় বড় হোটেল, রিসোর্ট। অথচ পরিবেশকে অক্ষত রেখেই সুন্দর কাজ করা যায়। এই খাত খুবই সম্ভাবনাময়। এখানে প্রতিটি সেক্টরে লোকবলের দরকার হয়। প্রশিক্ষণ নিয়ে হাউসকিপিং, শেফ, ফুড অ্যান্ড বেভারেজ— এমন অনেক কাজ নিয়ে হোটেল ও রিসোর্টে কাজ করা যায়। শুধু তাই নয়, বিদেশেও রয়েছে এর বিরাট সম্ভাবনা। আমি মনে করি, এই খাতে বেকারদের যুক্ত হওয়া উচিত।’

লিচুতে রঙিন গরবা গুদি।

লিচুতে রঙিন গরবা গুদি।


কাপ্তাই হ্রদে সবচেয়ে ভালোলাগে বিকেল নেমে এলে। বিকেলের হাওয়া গায়ে মেখে গরবা গুদির নিজস্ব নৌকায় কিছুক্ষণ ঘুরলে ভীষণ ভালোলাগবে। সন্ধ্যায় মাচাঙয়ের খোলা বারান্দায় বসে আকাশের তারা দেখতে পারেন। পূর্ণিমা হলে তো কথাই নেই। জ্যোৎস্নায় ভেসে যায় তখন পুরো গরবা গুদি। বৃষ্টির মৌসুমে গেলে ঝুপ করে বৃষ্টি নামা দেখতে পারেন। যখন দূরের কিছু কৃত্রিম আলো এসে পড়বে হ্রদের জলে, সেই আলোয় নৌকা চলাচল দেখতে দেখতে মোহাচ্ছন্ন হয়ে যাবেন। রাতদিন নৌকা চলাচল করে দ্বীপটিতে। জলের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ে মাচাঙয়ের কাছে। কী যে মোহনীয় সেই ঢেউয়ের শব্দ। তবে লিচুর মৌসুমে গেলে লেকের জল কম পাবেন। একইসঙ্গে বিজু উৎসব আর লিচু পেতে চাইলে যেতে হবে এপ্রিলে।

মাচাঙয়ের পেছনের খোলা দরজা বরাবর যখন প্রথম সূর্য উঁকি দিবে, একটু একটু করে সোনারঙা আলো ছড়াতে শুরু করবে, তখন এক রূপকথার জগৎ সৃষ্টি হবে। মাছ ধরা নৌকাগুলো সেই ভোরেও চলাচল করে। পেছনে বড় বড় পাহাড়, লেকের জলে নৌকা ও অবাক সূর্যোদয়- এ কী রূপকথা না হয়ে পারে?

গরবা গুদিতে পুরো দ্বীপে একটাই বাড়ি। সেখানে অনেক প্রজাতির ফুলগাছ। বাড়িটা যেন ফুলের বাড়ি। শিউলি, নয়নতারা, অলকানন্দা কত কত ফুল। দ্বীপের আশপাশে জনবসতি খুব কম। এত নিখুঁত প্রকৃতি ছেড়ে যখন চলে আসবেন, তখন হয়ত শেষ বিকেল। সূর্যটা চলে যাওয়ার সময় তার সোনালি আভার পুরোটাই ঢেলে দিবে লেকের জলে। সেই মায়াময় বিভা ও বিভ্রমের মুহূর্তে জলে ভেসে চলে আসবেন এসএসডি ঘাট। সেখান থেকে সিএনজিতে নতুন বাজার। চাইলে নতুন বাজার থেকে কেনাকাটা ও খাওয়াদাওয়া সেরে নিতে পারেন। তারপর সেখান থেকে রাতের বাসে ফিরে আসবেন ঢাকা। 



গরবা গুদি' হোমস্টে'র বর্তমান প্যাকেজ
সন্ধ্যা-সকাল 
সন্ধ্যার নাস্তা-রাতের খাবার-সকালের খাবার ও থাকা ১৩০০ (প্রতিজন/ মিনিমাম ৫জন) 
যদি ২-৩ জন হন, সেক্ষেত্রে এই প্যাকজটি জনপ্রতি ১৫০০ টাকা

দুপুর-সকাল 
দুপুরের খাবার-সন্ধ্যার নাস্তা-রাতের খাবার-সকালের খাবার ও থাকা ১৫০০ (প্রতিজন/ মিনিমাম ৫জন)
যদি ২-৩ জন হন, সেক্ষেত্রে এই প্যাকজটি জনপ্রতি ১৮০০ টাকা

কাপল প্যাকেজ
দুপুর-সকাল 
দুপুরের খাবার-সন্ধ্যার নাস্তা-রাতের খাবার-সকালের খাবার ও থাকা ৪০০০ টাকা
বিশেষত্ব : ক্যান্ডেল লাইট ডিনার, ফানুস উড়ানো, ট্রেডিশনাল পোশাকে ফোটোশেসান

খাবারে যা থাকবে
সকাল - পরোটা/ ডিম/ চা অথবা ভুনা খিচুড়ি, ডিমকারি, সালাদ, চা
দুপুর- সোনালি মুরগি কারি/ সবজি/ ভর্তা, ডাল/ সালাদ
বিকেল- ছোলা, মুড়ি/ চা
রাত- কাপ্তাই লেকের মাছ, ভাজি, ডাল, সেদ্ধ প্লেটার, সালাদ 
বার-বি-কিউ পার্টি- চিকেন ১ পিস, পরোটা তিনটা, কোক, সালাদ, সস

যাতায়াত ব্যবস্থা
ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে কাপ্তাইয়ের বাস যায়। যেমন, পান্থপথ, কলাবাগান, আব্দুল্লাহপুর, আরামবাগ। ভাড়া নন এসি ৭৫০-৮০০ টাকা। বাসে সরাসরি কাপ্তাইয়ের নতুন বাজার গিয়ে নামবেন। সেখান থেকে জনপ্রতি ৩০ টাকা ভাড়া দিয়ে সিএনজিতে যাবে এসএসডি ঘাট। ঘাট থেকে নৌকাযোগে মাত্র পাঁচ মিনিটে পৌঁছে যাবেন এই দ্বীপে। নৌকা বা ট্রলারের আকার অনুযায়ী ভাড়ায় তারতম্য আছে। প্রথম দিন গরবা গুদিতে সকালের নাস্তা পাওয়া যাবে না, যেহেতু ১২ টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত প্যাকেজ। সেক্ষেত্রে নতুন বাজার নেমে নাস্তা সেরে নিতে পারেন।

কাপ্তাইয়ে আরও যা যা দেখতে পারেন
গরবা গুদির কাছেই আছে স্থানীয় ধনেপাতা বাজার। সেখানে একদম কাপ্তাই হ্রদের গা ঘেঁষে শতবর্ষী একটা বটগাছ দাঁড়িয়ে আছে ডালপালা মেলে। দেখতে খুব সুন্দর। সেই বাজার থেকে ঘুরে আসতে পারেন, কিনে আনতে পারেন জাম্বুরা, কলা বা চাকমাদের পোশাক। এছাড়া কাপ্তাই বাঁধ ও কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কাপ্তাই জাতীয় উদ্যান, নেভি ক্যাম্প, কর্ণফুলি কাগজ কল, চিৎমরম বৌদ্ধ বিহার, বনশ্রী পর্যটন কমপ্লেক্স, প্যানারোমা জুম রেস্তোরাঁ, রিভারভিউ পার্ক ইত্যাদি দেখতে পারেন।

/মহু

  বিষয়:   গরবা গুদি  রাঙামাটি  কাপ্তাই 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: