ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের মানালি শহরটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য। এ শহরের দুটো অংশ, পুরনো ও নতুন মানালি। বাজেট ভ্রমণের জন্য পুরনো মানালি বেশি জনপ্রিয়। আজ আমরা জানবো, মানালিতে কীভাবে বাজেট ভ্রমণ করা যায় তার আদ্যেপান্ত।
কুল্লু জেলার বিয়াস নদীর উপত্যকার অপূর্ব সুন্দর এই শহরটিতে আসতে আপনাকে অতিক্রম করতে হবে সুন্দর একটি পথ। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২০৫০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত এই রাস্তাটা বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মোটরওয়ে হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
নতুন ও পুরনো মানালি
সারা বছর জুড়ে মানালি শহরে থাকে পর্যটকের আনাগোণা। একদিকে আধুনিক, ব্যস্ত নতুন মানালি, অন্যদিকে নির্জন, গ্রামীণ আবহে ভরা পুরনো মানালি। অনেকে সিদ্ধান্ত নিতে হিমসিম খান, ভ্রমণ পরিকল্পনায় কোনটিকে বেছে নেবেন। কারণ, দুটোই অনেক আকর্ষণীয়, আলাদা আলাদা আবেদন রাখে।
বরফঢাকা পর্বতশৃঙ্গ, পাইন বন আর উপত্যকার দৃশ্য মানালিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে। তবে, এই অপার সৌন্দর্যের মাঝেই রয়েছে জীবনযাপনের দুটি ভিন্ন চিত্র।
নতুন মানালি মূলত শহুরে ভাবধারায় গড়ে উঠেছে। সারি সারি দোকান, ক্যাফে, হোটেল, রিসর্ট আর আলো ঝলমলে পরিবেশ এখানকার নিত্যচিত্র। পর্যটকদের ভিড়, যানজট কিংবা ব্যস্ততা দেখলে মনেই হবে না, এটা কোনো পাহাড়ি শহর। কেনাকাটা, খাবার নিয়ে যাদের আগ্রহ বেশি, যারা জাঁকজমকপূর্ণ সন্ধ্যা উপভোগ করতে চান, তাদের কাছে নতুন মানালি বেশি আকর্ষণীয়।
অন্যদিকে, মূল শহর থেকে মাত্র দুই থেকে তিন কিলোমিটার দূরের পুরনো মানালিতে এখনও টিকে আছে গ্রামীণ আবেশ। সেখানে দেখা মেলে কাঠের পুরনো ঘর, সরু পথ, আপেল বাগান আর পাহাড়ি নির্জনতার। স্থানীয় জীবনযাত্রাকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ থাকলে, পুরনো মানালি ভ্রমণ করতে হবে।
পাইন ও ওক গাছে ঘেরা এই অঞ্চল নিরিবিলি সময় কাটানোর জন্যেও উপযুক্ত। নতুন মানালিতে পাহাড়ের দৃশ্য দেখার সুযোগ থাকলেও, কোলাহলের দরুণ পাহাড়কে নিবিড়ভাবে উপভোগ করা যায় না।
নতুন মানালিতে বড় বড় শোরুম ও ব্র্যান্ডের দোকান থাকলেও পুরনো মানালিতে ছোট গুমটি ও হস্তশিল্পের দোকান বেশি। এমনকি তুলনামূলক কম দামে স্থানীয় পণ্য পেতে চাইলেও পুরনো মানালিতে যেতে হবে।
কেনাকাটার পাশাপাশি থাকার ব্যবস্থাতেও রয়েছে ভিন্নতা। নতুন মানালিতে আধুনিক হোটেল ও বিলাসবহুল রিসর্ট বেশি। অন্যদিকে, পুরনো মানালিতে হোমস্টে, ছোট হোটেল ও অতিথিশালায় প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ রয়েছে। বাজেট ভ্রমণের জন্য এটা উপযুক্ত।
দর্শনীয় স্থান
সোলাং ভ্যালী: মানালি থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরে রয়েছে সোলাং ভ্যালী। এডভেঞ্চার প্রেমীদের জন্য সোলাং ভ্যালী উপযুক্ত স্থান। প্যারাসুটিং, প্যারাগ্লাইডিং, স্কেটিং, জরবিং, বাঞ্জি ও জিপলাইনের মতো দারুণ সব এডভেঞ্চার করার সুযোগ রয়েছে এখানে।
বিয়াস নদী: মানালি শহরের গা ঘেঁষে বয়ে চলা এই নদীর হিমশীতল পানিতে রয়েছে রাফটিং করার সুযোগ।
রোথাং পাস: মানালি শহর থেকে ৫১ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই জায়গাটিতে রয়েছে সাদা বরফে ঢাকা বিশাল পাহাড়সারি। এখানে পর্যটকদের স্কেটিং ও টবগ্যানিং করার সুযোগ রয়েছে। এমনকি এখানে যাওয়ার পুরো সময়টাই চোখে পড়েবে পাহাড়ি আঁকাবাঁকা সুন্দর রাস্তা। এমন রাস্তা ধরে মাইলের পর মাইল যাত্রা করতেও ক্লান্তি লাগে না কখনো। তবে, ভারী তুষারপাতের কারণে ডিসেম্বর থেকে জুনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত এখানে যাতায়াত বন্ধ থাকে।
রেহালা জলপ্রপাত: রোথাং পাস থেকে ফেরার পথে দেখা মিলবে এই সুন্দর জলপ্রপাতের। বিয়াস নদীতে গিয়ে মেশে এই জলপ্রপাতের পানি।
গুলাবা: রেহালা জলপ্রপাতের কাছেই এর অবস্থান। এখানে প্রাকৃতিক দৃশ্য যেমন উপভোগ করা যায়, তেমনই বরফের ভেতর স্কিং করারও সুযোগ রয়েছে।
এছাড়া ঘুরে দেখতে পারেন বিখ্যাত রাশিয়ান চিত্রকর লিকোলাস রোয়েরিকের রোয়েরিক আর্ট গ্যালারি, মানু মন্দির, মানালি স্যাংচুরি, নাগার ক্যাসেল, মহাদেব মন্দির, সামস লেক, বন বিহার, হিড়িম্বা দেবী মন্দিরসহ আরও বেশ কিছু আকর্ষণীয় স্থান।
কীভাবে যাবেন
বাংলাদেশ থেকে মানালি যাওয়ার দুটো উপায় আছে। বাজেট আর সময় অনুযায়ী যেকোনো একটা বেছে নিতে পারেন। বাংলাদেশ থেকে প্রথমে কলকাতা গিয়ে, সেখান থেকে ট্রেনে বা বিমানে করে দিল্লী চলে আসুন। দিল্লী থেকে বাসে বা প্রাইভেট কার ভাড়া করে মানালি চলে যান। সুযোগ থাকলে, প্রাইভেট কার ভাড়া করাই বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, যাওয়ার পথে বেশ কিছু সুন্দর জায়গা পড়বে। বাসে গেলে, সেসব জায়গায় নামতে পারবেন না। প্রাইভেট কারে গেলে, জায়াগুলো দেখে নিতে পারবেন ভালোভাবে।
এছাড়া, কলকাতা থেকে ট্রেনে শিমলা আসতে পারেন। শিমলা থেকে বাসে বা প্রাইভেট কারে মানালি। সময় থাকলে এক বা দুদিন শিমলা ঘুরে দেখে, তারপর মানালি যেতে পারেন। এটা আরও ভালো হবে।
কী এবং কোথায় খাবেন
মানালিতে গুজরাটি, মাদ্রাজি, পাঞ্জাবি খাবার যেমন রয়েছে, তেমনই বাঙালি খাবারও আছে। আপনি ভিন্ন অভিজ্ঞতা নিতে চাইলে বাঙালি খাবারের বাইরে এসব খাবার টেস্ট করে দেখতে পারেন। আবার, স্বাচ্ছন্দ্যবোধ না করলে বাঙালি খাবার হোটেল থেকেও খেতে পারেন। শান্তিনিকেতন হোটেল, আশাপুরি বাঙালি রেষ্টুরেন্ট, হোটেল আদর্শ এমন বেশ কিছু বাঙালি খাবার হোটেল পেয়ে যাবেন সেখানে। চিকেন মমো, পাপড়ি চাট, দোসা, আলু গোবি এসব খাবারের স্বাদ নিতে পারেন।
কেনাকাটা
তুলনামূলক কম দামে কেনাকাটার জন্য পুরনো মানালি যেতে পারেন। আর তাছাড়া, নতুন বা পুরনো মানালি উভয় স্থানেই অল্প দামে শীতের পোশাক পাওয়া যায়। তাই সেখান থেকে সুন্দর সুন্দর শীতবস্ত্র কিনতে মিস করবেন না।
খরচ
বাজেট ভ্রমণে মানালি গেলে, চার পাঁচদিনের জন্য জনপ্রতি ২০ থেকে ২২ হাজার টাকা পড়বে। মানালিতে গ্রুপ করে যাওয়াই ভালো। নাহলে, গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে একার জন্য খরচ বেশি পড়ে যায়।
পরামর্শ
- মে থেকে অক্টোবর মানালি যাওয়ার উপযুক্ত সময়।
- মানালি গেলে শিমলাও ঘুরে আসার চেষ্টা করুন। দুটো শহরের দূরত্ব খুব বেশি নয়।
- মানি এক্সচেঞ্জ করে নিন কলকাতা থেকেই। মানালিতে পর্যাপ্ত সুব্যবস্থা নেই।
- মানালিতে স্মোকিং করলে জরিমানা দিতে হয়। এ ব্যপারে সতর্ক থাকুন।
- মানালি যেহেতু শীতের শহর, তাই হোটেল বুকিং করার আগে জেনে নিন হিটার ও গিজার আছে কি না।
- আবহাওয়া খারাপ থাকলে প্যারাগ্লাইডিং করবেন না।
- পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নিয়ে যাবেন।
- রোথাং পাসে গেলে প্যাকেজের মাধ্যমে ঘুরলে খরচ কম পড়বে।
- গুলাবাতে যাওয়ার আগে অবশ্যই ভারী শীতবস্ত্র পরে যাবেন।
- মানালিতে গাড়ি ভাড়া করে ঘোরা ছাড়া বিকল্প নেই। তাই বুঝেশুনে দরদাম করে নিবেন।
ভ্রমণের সময়, বাজেট ও পছন্দ অনুযায়ী পরিকল্পনা করাই সবচেয়ে ভালো। পাঁচ দিনের সফরে তিন দিন পুরনো মানালিতে নিরিবিলি সময় কাটিয়ে বাকি দুই দিন নতুন মানালির ব্যস্ত জীবন উপভোগ করা যেতে পারে। অথবা, শিমলাতে দুদিন, পুরনো মানালিতে দুদিন আর নতুন মানালি শহরে একদিন থাকতে পারেন।
/মহু