বিশ্বের একমাত্র ভাসমান জাতীয় উদ্যান এবং ভারতের সর্ববৃহৎ মিষ্টি জলের হ্রদ লোকটাক। মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলার মৈরাংয়ে অবস্থিত এই হ্রদ পর্যটকদের কাছে খুব আকর্ষণীয়। রাজধানী ইম্ফল থেকে লোকটাকের দূরত্ব প্রায় ৪০ কিলোমিটার। প্রায় ২৮৬ বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত এই হ্রদের বুকে রয়েছে কীবুল লামজাও জাতীয় উদ্যান।
এই উদ্যানের সুনির্দিষ্ট কোনো অবস্থানের কথা বলা বেশ কঠিন। কারণ, এর ভূমি কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় স্থির থাকে না, বরং তা পানির বুকে ভেসে বেড়ায়। এই অবিশ্বাস্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই কীবুল লামজাও বিশ্বের একমাত্র ‘ভাসমান জাতীয় উদ্যান’ হিসেবে নিজের জায়গা করে নিয়েছে।
জলের উপর গাছপালা, মাটি ও জৈব পদার্থের সমন্বয়ে গোল গোল বৃত্ত তৈরি হয়ে থাকে পুরো হ্রদ জুড়ে। এগুলোকে বলে ফুমডি। এই ফুমডিগুলো বেশ শক্তপোক্ত। এর উপর দিয়ে দিব্যি হাঁটাচলা করা যায়। এই ফুমডি পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না, কেবল লোকটাক হ্রদেই এদের বাস। মাটি ও উদ্ভিদের এই ভাসমান আস্তরণগুলো কয়েক ইঞ্চি থেকে শুরু করে সাড়ে ৬ ফুট পর্যন্ত পুরু হতে পারে। হ্রদের দক্ষিণ-পূর্ব অংশেই এদের বেশি দেখা যায়। সেখানে অসংখ্য ছোট-বড় ফুমডি একত্রে যুক্ত হয়ে এক বিশাল ফুমডির জন্ম দিয়েছে- যাকে একটি সুবিশাল ভাসমান তৃণভূমি বললেও ভুল হবে না।
ফুমডিগুলো কেবল বর্ষাকালেই পানিতে ভেসে থাকে। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গেলে উদ্ভিদের এই আস্তরণগুলো হ্রদের তলদেশে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা নিচের মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান শোষণ করে নিজেদের টিকিয়ে রাখে।
মাছ চাষের জন্য মানুষও কিছু কিছু ফুমডির আকার দেয়। স্থানীয় অধিবাসীরা বাঁশ ও দড়ি ব্যবহার করে এগুলোকে বৃত্তাকার রূপ দেয়। মাছ ছাড়াও এই ভাসমান তৃণভূমির ওপরে ও নিচে বাস করে নানা প্রজাতির পাখি ও প্রজাপতি। সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এই সুবিশাল হ্রদে দিনভর পাখিদের কলতান শোনা যায়। এখানেই দেখা মেলে সাংগাই প্রজাতির হরিণ। হ্রদে যখন পদ্ম ফোটে, তখন লোকটাক হয়ে ওঠে গোলাপি স্বর্গ। এ ছাড়া, সারা বছরই সবুজ ফুমডিগুলো জেগে থাকে লোকটাকে।
এই ভাসমান দ্বীপগুলোর বুকেই ছোট ছোট কুঁড়েঘর তুলে বসবাস করেন স্থানীয়রা। দারুণ ব্যপার হলো, এই ফুমডিগুলোর উপর পর্যটকদের জন্য হোমস্টের সুবিধাও রয়েছে। যদিও এখানে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা। সব মিলিয়ে লোকটাক পৃথিবীর সুন্দরতম এক হ্রদ।
সময়ের আলো/মহু