পৃথিবীতে দুই শতাধিক স্বাধীন ও নির্ভরশীল দেশ রয়েছে। প্রতিটি দেশের নামের পেছনেই আছে কোনো না কোনো ইতিহাস। কোথাও নাম এসেছে জাতিগোষ্ঠী থেকে, কোথাও ব্যক্তির নামে, আবার কোনো কোনো দেশের নামের সঙ্গে সরাসরি জড়িয়ে আছে নদী। কখনো নদীর নাম হুবহু রাষ্ট্রের নাম হয়েছে, আবার কখনো ভাষা, জাতিগোষ্ঠী বা ঐতিহাসিক অঞ্চলের মাধ্যমে নদীর সঙ্গে তৈরি হয়েছে সেই যোগসূত্র।
চলুন, তেমনই কিছু দেশের নাম জেনে নেয়া যাক-
জর্ডান
জর্ডান দেশের নাম সরাসরি জর্ডান নদী থেকে এসেছে। ব্রিটিশ শাসনামলে নদীর পূর্বাঞ্চল ‘ট্রান্সজর্ডান’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৪৬ সালে স্বাধীনতার পরও এই নাম ব্যবহৃত হয়। ১৯৪৯ সালে রাষ্ট্রটির নাম পরিবর্তন করে জর্ডান রাখা হয়।
ভারত
ভারতের ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়া’র উৎস সিন্ধু নদী। প্রাচীন পারসিক ভাষায় সিন্ধু শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে ‘হিন্দু’ রূপ নেয়। গ্রিকরা সেই নাম থেকে ‘ইন্ডোস’ ও ‘ইন্ডিয়া’ ব্যবহার শুরু করে। পরে ইউরোপীয় ভাষার মাধ্যমে ‘ইন্ডিয়া’ নামটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
নাইজার
নাইজার দেশের নাম এসেছে নাইজার নদী থেকে। ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনে অঞ্চলটি ‘নাইজার ভূখণ্ড’ এবং পরে ‘নাইজার উপনিবেশ’ নামে পরিচিত ছিল। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর নদীর নামটিই রাষ্ট্রের নাম হিসেবে থেকে যায়।
নাইজেরিয়া
নাইজেরিয়ার নামও নাইজার নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত। ব্রিটিশ সাংবাদিক ও লেখিকা ফ্লোরা শ নাইজার নামের সঙ্গে প্রত্যয় যোগ করে ‘নাইজেরিয়া’ নামটি প্রস্তাব করেন। ১৯১৪ সালে উত্তর ও দক্ষিণ নাইজেরিয়া একীভূত হলে নামটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
সেনেগাল
সেনেগাল দেশের নাম এসেছে সেনেগাল নদী থেকে। নদীটির নাম ধীরে ধীরে নদীসংলগ্ন বৃহত্তর অঞ্চলের পরিচয়ে পরিণত হয়। ১৯৬০ সালে স্বাধীনতার পর সেই নামই দেশের নাম হিসেবে বহাল থাকে।
গাম্বিয়া
গাম্বিয়ার নাম এসেছে দেশটির মধ্য দিয়ে প্রবাহিত গাম্বিয়া নদী থেকে। ইউরোপীয় নাবিকদের পুরোনো নথিতেও নদীটির নাম পাওয়া যায়। ১৯৬৫ সালে স্বাধীন হওয়ার সময় দেশটির সরকারি নাম হয় ‘দ্য গাম্বিয়া’।
জাম্বিয়া
জাম্বিয়ার নামের উৎস জাম্বেজি নদী। ব্রিটিশ শাসনামলে অঞ্চলটি ‘নর্দার্ন রোডেশিয়া’ নামে পরিচিত ছিল। স্বাধীনতার সময় ঔপনিবেশিক নাম বাদ দিয়ে নদী থেকে সম্পর্কিত ‘জাম্বিয়া’ নামটি গ্রহণ করা হয়।
ক্যামেরুন
ক্যামেরুনের নামের উৎস উওরি নদী। পর্তুগিজ নাবিকেরা নদীটিকে ‘রিও দোস কামারোয়েস’ (Rio dos Camarões) বা ‘চিংড়ির নদী’ নামে অভিহিত করেছিল। ‘চিংড়ির নদী’ অর্থে একটি নাম দিয়েছিল। সেই নামের পরিবর্তিত রূপ থেকেই পরবর্তীতে ক্যামেরুন নামের প্রচলন হয়।
মলদোভা
মলদোভা দেশের নাম এসেছে মলদোভা নদীর নাম থেকে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। মধ্যযুগে এই নদীর উপত্যকাকে ঘিরে মলদাভিয়া অঞ্চল গড়ে ওঠে। পরবর্তীতে সেই আঞ্চলিক নামই রাষ্ট্রের পরিচয়ে পরিণত হয়।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা
দেশটির বসনিয়া অংশের নামের সঙ্গে বসনা নদীর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। বসনা নদীর নাম থেকেই বসনিয়া নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। পরে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা মিলিয়ে বর্তমান রাষ্ট্রের নাম হয়।
উরুগুয়ে
উরুগুয়ে দেশের নাম এসেছে উরুগুয়ে নদী থেকে। নদীটির নাম স্থানীয় গুয়ারানি ভাষার সঙ্গে সম্পর্কিত হলেও শব্দটির সঠিক অর্থ নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ১৮২৮ সালে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় নদীর নাম থেকেই দেশের নাম নেওয়া হয়।
সুরিনাম
সুরিনাম দেশের নাম এসেছে সুরিনাম নদী থেকে। ইউরোপীয়দের আগমনের আগে ওই অঞ্চলে সুরিনেন নামে একটি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল বলে ধারণা করা হয়। তাদের নামের সঙ্গে নদী ও অঞ্চলের নামের সম্পর্ক রয়েছে।
কঙ্গো
কঙ্গো নদী ও কঙ্গো নামের পেছনে রয়েছে একই ঐতিহাসিক উৎস। কঙ্গো জনগোষ্ঠী ও প্রাচীন কঙ্গো রাজ্যের নাম থেকেই নদীটির নামের প্রচলন। পরে নদী অববাহিকার দুই দেশের নামেও ‘কঙ্গো’ যুক্ত হয়। একটি হলো কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র, অন্যটি কঙ্গো প্রজাতন্ত্র।
প্যারাগুয়ে
প্যারাগুয়ে দেশের নামের সঙ্গে প্যারাগুয়ে নদীর সম্পর্ক রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়। গুয়ারানি ভাষায় নামটির বিভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে। কেউ এটিকে ‘পায়াগুয়াদের নদী’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, আবার কেউ পানি ও নদীর সঙ্গে সম্পর্কিত অন্য অর্থের কথা বলেন। তাই নামটির সঠিক উৎস নিয়ে এখনো মতভেদ রয়েছে।
সময়ের আলো/এমকে