হ্যান্ডিক্রাফট : পুরোনো জিনিসে নতুন স্বপ্ন

তাসলিমা নীলু

ফিচার

একসময় ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা কাচের বোতল, টিনের কৌটা, পুরোনো কাপড়, কাঠের বাক্স কিংবা প্লাস্টিকের বোতলকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে

2026-08-25T18:47:53+00:00
2026-08-25T18:47:53+00:00
 
  মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬,
১০ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
ফিচার
হ্যান্ডিক্রাফট : পুরোনো জিনিসে নতুন স্বপ্ন
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০২৬, ৬:৪৭ পিএম 
গ্রাফিক : সময়ের আলো
একসময় ঘরের এক কোণে পড়ে থাকা কাচের বোতল, টিনের কৌটা, পুরোনো কাপড়, কাঠের বাক্স কিংবা প্লাস্টিকের বোতলকে অপ্রয়োজনীয় মনে করে ফেলে দেওয়া হতো। কিন্তু এখন সেই ধারণা বদলে গেছে। সৃজনশীল মানুষের হাতে এসব পুরোনো উপকরণই হয়ে উঠছে দৃষ্টিনন্দন শোপিস, ব্যবহারিক সামগ্রী কিংবা ঘর সাজানোর অনন্য উপাদান। হ্যান্ডিক্রাফট বা হাতে তৈরি শিল্পপণ্যের এই জনপ্রিয়তা শুধু শখের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি এখন পরিবেশ সচেতনতা, নান্দনিকতা এবং আত্মকর্মসংস্থানের এক সফল উদাহরণ।

পুরোনোতেই লুকিয়ে নতুন সম্ভাবনা

হ্যান্ডিক্রাফটের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো অপ্রয়োজনীয় মনে হওয়া কোনো জিনিসেও নতুন সম্ভাবনা খুঁজে নেওয়া। পুরোনো কাচের বোতল, রঙিন ফুলদানি, টিনের কৌটা, কলম রাখার স্ট্যান্ড, কাঠের বাক্স, বই রাখার তাক, ব্যবহৃত জিন্সের কাপড় দিয়ে ব্যাগ কিংবা প্লাস্টিকের বোতল দিয়ে ছোট্ট বাগানের টব তৈরি করা হচ্ছে। এসব পণ্য শুধু নান্দনিকই নয়, দৈনন্দিন জীবনেও বেশ কার্যকর।

ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ইশরাত জাহান বলেন, ‘হাতে তৈরি প্রতিটি উপাদানের পেছনে থাকে একটি গল্প। মাটি, বাঁশ, বেত বা পাটের তৈরি নিখুঁত শিল্পকর্ম ঘরকে কৃত্রিমতা থেকে মুক্ত করে একটি উষ্ণ ও প্রাণবন্ত পরিবেশ তৈরি করে দিতে পারে। বসার ঘরের একটি দেয়ালে নকশিকাঁথা ঝুলিয়ে বা লোকশিল্পের রঙিন চিত্রকর্ম ব্যবহার করে ঘরকে আকর্ষণীয় করে তোলা যায়। মাটির পাত্র, হাতে বোনা কুশন কভার বা পাটের পাপোশ ঘরে বৈচিত্র্যময় “টেক্সচার” এনে দেয়, যা আধুনিক ফার্নিচারের সঙ্গে দারুণ মানিয়ে যায়। পুরো ঘর হস্তশিল্পে ভরিয়ে না ফেলে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। পরিমিত ও সঠিক স্থানে রাখা ছোট একটি বাঁশ বা পিতলের শোপিসও ঘরের আবেদন বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। দেশীয় ঐতিহ্যকে সম্মান জানিয়ে নিজের ঘরকে নান্দনিক রূপ দিতে হস্তশিল্পের কোনো বিকল্প নেই।’

শখ থেকে সফল উদ্যোক্তা

দেশের অনেক তরুণ-তরুণী, গৃহিণী এবং শিক্ষার্থী শখের বশে হ্যান্ডিক্রাফট তৈরি শুরু করেছিলেন। সময়ের সঙ্গে সেই শখই পরিণত হয়েছে সফল ব্যবসায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসের মাধ্যমে ঘরে বসেই তারা নিজেদের তৈরি পণ্য বিক্রি করছেন। অল্প পুঁজিতে শুরু করা এই উদ্যোগ অনেকের জন্য স্বাবলম্বী হওয়ার নতুন পথ খুলে দিয়েছে।


পরিবেশবান্ধব

বিশ্বজুড়ে পরিবেশ দূষণ এখন বড় একটি উদ্বেগের বিষয়। প্রতিদিন অসংখ্য প্লাস্টিক, কাচ ও অন্যান্য বর্জ্য ফেলে দেওয়া হয়, যা সহজে নষ্ট হয় না। হ্যান্ডিক্রাফটের মাধ্যমে এসব উপকরণ পুনর্ব্যবহার করলে বর্জ্যরে পরিমাণ কমে এবং নতুন কাঁচামালের প্রয়োজনও হ্রাস পায়। ফলে পরিবেশের ওপর চাপ কমে এবং টেকসই জীবনধারা গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
সৃজনশীলতার রঙে অনন্য সৃষ্টি হাতে তৈরি প্রতিটি পণ্যের মধ্যেই থাকে শিল্পীর নিজস্ব চিন্তা ও কল্পনার ছাপ। একই উপকরণ ব্যবহার করেও দুজন কারুশিল্পী ভিন্ন ভিন্ন নকশা ও রঙের মাধ্যমে সম্পূর্ণ আলাদা সৃষ্টি উপহার দিতে পারেন। এ কারণেই হ্যান্ডিক্রাফটের প্রতিটি পণ্য একক ও বিশেষ। এতে থাকে ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া, যা যন্ত্রে তৈরি পণ্যে সবসময় পাওয়া যায় না।

ঘরের সাজে নান্দনিকতা

হ্যান্ডিক্রাফটের তৈরি ছোট ছোট শোপিস, দেয়ালসজ্জা, মোমবাতির স্ট্যান্ড, টব, ফুলদানি কিংবা ঝুলন্ত সাজসজ্জার উপকরণ ঘরের পরিবেশকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলে। অল্প খরচে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে এসব পণ্যের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে উৎসব কিংবা বিশেষ দিনের সাজে হাতে তৈরি সামগ্রী আলাদা সৌন্দর্য যোগ করে।

হ্যান্ডিক্রাফটের বৈচিত্র্য

বর্তমানে হ্যান্ডিক্রাফটের জগৎ অনেক বিস্তৃত। পুনর্ব্যবহৃত কাগজ দিয়ে তৈরি শুভেচ্ছা কার্ড, জুট বা পাটের ব্যাগ, ম্যাক্রামে ওয়াল হ্যাঙ্গিং, হাতে আঁকা মাটির পাত্র, রেজিন আর্ট, কাঠের ডেকোরেশন, কাপড়ের পুতুল, হ্যান্ডমেড জুয়েলারি, সুগন্ধি মোমবাতি, উপহারের বক্স এবং পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ দিয়ে তৈরি নানা শোপিস ক্রেতাদের কাছে বেশ জনপ্রিয়। ব্যক্তিগত ব্যবহার ছাড়াও উপহার হিসেবে এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে।

নতুন প্রজন্মের আগ্রহ বাড়ছে

বর্তমান প্রজন্ম সৃজনশীল কাজের প্রতি আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। অনলাইন ভিডিও, কর্মশালা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে তারা সহজেই নতুন নতুন হ্যান্ডিক্রাফট কৌশল শিখছে। অনেকেই অবসর সময়কে কাজে লাগিয়ে নিজের দক্ষতা বাড়াচ্ছেন, আবার কেউ কেউ এটিকে পেশা হিসেবেও বেছে নিচ্ছেন।

দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিকতার মেলবন্ধন

বাংলাদেশের কারুশিল্পের ঐতিহ্য বহু পুরোনো। সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে আধুনিক ডিজাইন ও নতুন উপকরণের সমন্বয় ঘটিয়ে তৈরি হচ্ছে আকর্ষণীয় সব হ্যান্ডিক্রাফট। ফলে দেশীয় সংস্কৃতির সৌন্দর্য যেমন ফুটে উঠছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাজারেও হাতে তৈরি পণ্যের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

উৎসবের উপহারে হ্যান্ডিক্রাফটের জনপ্রিয়তা

জন্মদিন, বিয়েবার্ষিকী, ঈদ, পূজা, নববর্ষ কিংবা ভালোবাসা দিবস যেকোনো বিশেষ উপলক্ষে হাতে তৈরি উপহার এখন অনেকের প্রথম পছন্দ। কারণ একটি হ্যান্ডমেড উপহারে থাকে আন্তরিকতা, সময় এবং ভালোবাসার ছোঁয়া। তাই এমন উপহার সহজেই মানুষের মনে বিশেষ জায়গা করে নেয়।


ভবিষ্যতের সম্ভাবনাময় শিল্প

হ্যান্ডিক্রাফট শুধু একটি শখ নয়, এটি সৃজনশীল অর্থনীতিরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ প্রশিক্ষণ, আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা এবং সরকারি-বেসরকারি সহায়তা পেলে এই খাত আরও সমৃদ্ধ হতে পারে। এতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, দেশের অর্থনীতিও লাভবান হবে। হ্যান্ডিক্রাফট আমাদের শেখায়, কোনো কিছুই অমূল্য নয়। সৃজনশীল চিন্তা, ধৈর্য এবং দক্ষতার মাধ্যমে পুরোনো জিনিসও হয়ে উঠতে পারে নতুন সম্ভাবনার প্রতীক। পরিবেশ রক্ষা, নান্দনিক জীবনযাপন এবং আত্মকর্মসংস্থানের এই অনন্য সমন্বয় আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে। তাই পুরোনোকে অবহেলা না করে নতুন চোখে দেখার অভ্যাস গড়ে তুলি। কারণ সৃজনশীল হাতের স্পর্শেই সাধারণ একটি বস্তু হয়ে উঠতে পারে অসাধারণ শিল্পকর্ম।

সময়ের আলো/এসএকে


  বিষয়:   হ্যান্ডিক্রাফট  পুরোনো জিনিস  নতুন স্বপ্ন  সময়ের আলো 


Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: