প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ বিভিন্ন রোগের উপশমে ভেষজ উদ্ভিদ ব্যবহার করে আসছে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও এসব উদ্ভিদের নানা উপকারিতা রয়েছে। তেমনই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভেষজ উদ্ভিদ হলো নিম।
নিম একটি চিরহরিৎ, বহু বর্ষজীবী বৃক্ষ। ঔষধি গুণের জন্য নিম ‘সকল রোগের মহৌষধ’ নামেও পরিচিত। নিমের ডাল, পাতা, ছাল, ফুল, ফল ও তেল বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়।
প্রাচীনকাল থেকেই নিমের ঔষধি ব্যবহার প্রচলিত। খ্রিষ্টপূর্ব আনুমানিক ৪০০ সালের বৈদিক যুগে নিমকে জীবাণুনাশক হিসেবে ব্যবহার করার উল্লেখ পাওয়া যায়। ক্ষয়রোগ, কৃমি ও বিভিন্ন চর্মরোগে নিমের ব্যবহার ছিল প্রচলিত। পরিবেশে পোকামাকড়ের উপদ্রব কমাতেও নিম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ত্বকের যত্নেও নিমের ব্যবহার রয়েছে। ব্রণ, ত্বকের বিভিন্ন সমস্যা, চুলকানি কিংবা দাগছোপের ক্ষেত্রে নিমপাতা ব্যবহৃত হয়ে থাকে। নিমপাতা শুকিয়ে গুঁড়া করে ফেসপ্যাক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। কেটে গেলে কিংবা পোকার কামড়ের পর আক্রান্ত স্থানে নিমপাতা বাটা লাগানোর প্রচলন রয়েছে। নিমপাতা সিদ্ধ করা পানি দিয়ে গোসল করলে ত্বকের জ্বালাপোড়া ও চুলকানি কমে।
চুলের যত্নেও নিম বেশ উপকারী। খুশকি ও মাথার ত্বকের বিভিন্ন সমস্যায় নিমপাতা সিদ্ধ পানি দিয়ে চুল ধোয়ার প্রচলন রয়েছে। নিমযুক্ত শ্যাম্পুও ব্যবহার করা হয়।
দাঁত ও মাড়ির যত্নে নিমের ডাল দিয়ে দাঁতন করার প্রথা বহু পুরনো। নিমের ডাল দাঁত ও মাড়ির পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে এবং মুখের বিভিন্ন জীবাণুর বিরুদ্ধে সহায়তা করতে পারে।
নিমের পাতা হজমের বিভিন্ন সমস্যায়ও লোকজ ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। গ্যাস, বদহজম ও অজীর্ণতার ক্ষেত্রে নিমের ছাল বা পাতার ব্যবহার প্রচলিত। কিছু নির্দিষ্ট পরিমাণ নিমের ছাল পানিতে ভিজিয়ে সেই পানি পান করলে উপকার পাওয়া যায়।
রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও নিমপাতার ব্যবহার প্রচলিত। অনেকেই সকালে খালি পেটে নিমপাতা চিবিয়ে খান বা নিমপাতার রস পান করেন।
রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও নিমপাতা ব্যবহৃত হয়। নিমপাতার গুঁড়া বা রস পান করার মাধ্যমে উপকার পাওয়ার কথা আয়ুর্বেদিক ও লোকজ চিকিৎসায় বলা হয়। তবে, কোনো রোগ থাকলে নিমপাতার রস খাওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
নিম তেলও বহুল ব্যবহৃত একটি উপাদান। এতে থাকা কিছু যৌগ পোকামাকড় নিয়ন্ত্রণে কার্যকর। নিম তেল কীটপতঙ্গ প্রতিরোধে এবং বিভিন্ন প্রসাধনী ও ভেষজ সামগ্রী তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। প্রজনন নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও নিম তেলের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
ভারতীয় উপমহাদেশে হাম, জলবসন্তসহ বিভিন্ন চর্মরোগের ক্ষেত্রে নিমপাতা ব্যবহার করা হয়। নিমপাতা সিদ্ধ পানি দিয়ে গোসল করার প্রচলনও রয়েছে। তবে, এসব রোগের ক্ষেত্রে আধুনিক চিকিৎসা গ্রহণ করা জরুরি।
নিমের ফুল, ছাল ও অন্যান্য অংশ নিয়েও বিভিন্ন ভেষজ ব্যবহার রয়েছে। যেমন, দৃষ্টিশক্তি বাড়ানো বা রাতকানা রোগের ক্ষেত্রে নিমের ফুল ব্যবহারের কথা লোকজ চিকিৎসায় পাওয়া যায়। তবে, এসব দাবির সবগুলোর শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
এছাড়া, নিম কাঠ বেশ শক্ত ও টেকসই। এতে সহজে ঘুণ ধরে না এবং উইপোকাসহ বিভিন্ন পোকামাকড় সাধারণত নিম কাঠ এড়িয়ে চলে। এ কারণে আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন কাজে নিম কাঠ ব্যবহার করা হয়।
সময়ের আলো/মহু