জৈন্তাপুর উপজেলার শাপলা বিলের একটি স্থাপনা বাংলাদেশের পর্যটকদের কাছে বেশ পরিচিত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা সংলগ্ন ডিবির হাওর ও কেন্দ্রিবিলের মধ্যবর্তী টিলার
জৈন্তাপুর উপজেলার শাপলা বিলের একটি স্থাপনা বাংলাদেশের পর্যটকদের কাছে বেশ পরিচিত। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তরেখা সংলগ্ন ডিবির হাওর ও কেন্দ্রিবিলের মধ্যবর্তী টিলার ওপর দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপনাটি একজন হতভাগ্য রাজার সমাধি। এই রাজার নাম ছিল বিজয়নারায়ণ সিংহ।
১৭৮৫ সালে তিনি জৈন্তিয়ার রাজা হয়েছিলেন। ১৭৮৮ সালে রাজ্যের এক সংকটময় পরিস্থিতিতে তিনি কেন্দ্রিবিলের পানিতে নৌকাডুবির শিকার হয়ে প্রাণ হারান। এর ২ বছর পর জৈন্তিয়ার রাজা হয়েছিলেন তার ভাগিনেয় দ্বিতীয় রামসিংহ। তিনি সিংহাসনে আরোহণের পরপরই প্রয়াত রাজা বিজয়নারায়ণের সমাধি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। আনুমানিক ১৭৯০-৯১ সালে তিনি বিজয়নারায়ণের সমাধিস্থলে একটি দৃষ্টিনন্দন সৌধ নির্মাণের কাজ সম্পন্ন করেন। সৌধটি এতটাই মজবুত করে নির্মাণ করা হয়েছিল যে, ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পেও তা ভেঙে পড়েনি। বর্তমানেও এটি প্রায় অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কেন্দ্রিবিল, ডিবির হাওর ও অন্য দুটি বিল বর্তমানে ‘শাপলা বিল’ নামে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। যেসব পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন, তারা অত্যন্ত বিস্ময়ের সঙ্গে রাজা বিজয়নারায়ণের সমাধিসৌধটিও পর্যবেক্ষণ করে থাকেন। কিন্তু এর ইতিহাস জানা না থাকায়, তারা এটিকে একটি মন্দির বলেই ধারণা করেন।
বিজয়নারায়ণ সিংহের সমাধি। ছবি : লেখক সৌজন্যে
জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস থেকে জানা যায়, রাজা বিজয়নারায়ণের শাসনামলে জৈন্তিয়া পাহাড়ের নারতিয়াং পুঞ্জির সরদার বা দলইয়ের পুত্র লক্ষ্মী সিংহ রাজপরিবারের বেশ ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিলেন। তার পিতা উপাংদলই ছিলেন জৈন্তিয়া পাহাড়ের একজন প্রভাবশালী সরদার। লক্ষ্মী যখন বয়সে শিশু ছিলেন, তখন তার পিতার সঙ্গে একবার জৈন্তিয়ার রাজধানীতে এসেছিলেন এবং ঘটনাক্রমে কিছুদিন রাজবাড়িতে থেকেছিলেন। রাজবাড়ির লোকজন তাকে খুবই স্নেহ করতেন। পরিণত বয়সেও তিনি তাদের পছন্দের পাত্র ছিলেন। একজন বিচক্ষণ ও বুদ্ধিমান যুবক হওয়ায় রাজা বিজয়নারায়ণ তাকে রাজসভার সদস্য বানিয়েছিলেন। লক্ষ্মী তার সূক্ষ্ম বুদ্ধি দিয়ে রাজসভায় উত্থাপিত বিভিন্ন সমস্যার সমাধান বের করে দিতেন। নিজ দক্ষতার কারণে তিনি ক্রমশ রাজসভার সবচেয়ে বিজ্ঞ ব্যক্তি হয়ে ওঠেন এবং একইসঙ্গে রাজার সবচেয়ে আস্থাভাজন ব্যক্তিতেও পরিণত হন। একসময় দেখা গেল, রাজসভায় রাজা শুধু লক্ষ্মীর কথাই শুনছেন, অন্য কারও কথা শুনছেন না। এতে অন্যদের মনে হিংসা জন্ম নিল। লক্ষ্মীর বিরুদ্ধে তারা চক্রান্তে নামল।
এই চক্রান্তে বিভ্রান্ত হয়ে রাজা লক্ষ্মীকে হত্যার আদেশ দিলেন। কিন্তু লক্ষ্মী চতুলের খাদনলস্করের সহায়তায় রাজধানী থেকে পালিয়ে নিজ পুঞ্জিতে চলে গেলেন। লক্ষ্মীর পলায়নে সহায়তার দায়ে রাজা খাদনলস্করকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এতে পাহাড়িরা রাজার উপর অসন্তুষ্ট হয়। তারা সমতলের সঙ্গে সকল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। পাহাড়ি পণ্যের অভাবে সমতলে নানান সমস্যা দেখা দেয়। ৩ বছর পর্যন্ত এই অচলাবস্থা থাকার পর সমতল ও পাহাড়ের সরদাররা মিলে সিদ্ধান্ত নেন, রাজাকে হত্যা করে লক্ষ্মী সিংহকেই রাজা বানানো হবে। তাদের চক্রান্ত অনুযায়ী, রাজা বিজয়নারায়ণকে জয়ন্তীপুরের নিকটস্থ কেন্দ্রিবিলের পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করা হয় এবং সেখানকার একটি টিলার ওপরে তাকে সমাহিত করা হয়। এরপর লক্ষ্মী সিংহ রাজা হন। তবে, তিনি বেশিদিন জৈন্তিয়ার ক্ষমতায় থাকেননি। অদ্ভুত উপায়ে রাজা হওয়ায়, তাকে সবাই মেনে নেয়নি। ১৭৯০ সালে সিংহাসন ছেড়ে তিনি নারতিয়াং পুঞ্জিতে চলে যান। তখন নতুন রাজা হন প্রয়াত বিজয়নারায়ণের বৈধ উত্তরাধিকারী ও ভাগিনেয় দ্বিতীয় রামসিংহ। তিনি তার মামার স্মৃতিরক্ষার্থে কেন্দ্রিবিলের সমাধিটি নির্মাণ করেন।
পর্যটকরা সমাধিটি মুগ্ধ হয়ে দেখেন। ছবি : লেখক সৌজন্যে
রাজা বিজয়নারায়ণ ও লক্ষ্মীসিংহের ঘটনাগুলো দীর্ঘ সময়ের জন্য জৈন্তিয়ার মানুষের স্মৃতিতে স্থান করে নিয়েছিল। মুখরোচক গল্পের উপাদান হওয়ায় এসব ঘটনার কথা জৈন্তিয়ার প্রতিটি ঘরেই আলোচিত হতো। সময়ের পরিক্রমায় এসব কাহিনী গ্রাম্য গীতিকবিতায় রূপ নিয়েছিল। জৈন্তিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলের গ্রাম্য পুঁথিপাঠের আসরে এসব কবিতা পাঠ করা হতো। কবিতাগুলো সংকলনের কাজ শুরু হয় ১৯২০ এর দশকে। জৈন্তিয়া রাজ্যের ইতিহাস গবেষক মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ সর্বপ্রথম রাজা বিজয়নারায়ণ, লক্ষ্মীসিংহ ও খাদনলস্করের পুত্র সোনাধনকে নিয়ে প্রচলিত কিছু গীতিকবিতা সংকলিত করে একটি কাব্য-কাহিনী প্রস্তুত করেন। এই কাহিনীটি ‘চতুলের সোনাধনের কবিতা’ নামে ১৯২৬ সালে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে বিশিষ্ট গবেষক রাজমোহন নাথ জনৈক কানাই খলিফার কাছ থেকে একটি সুদীর্ঘ কাব্য-কাহিনী সংগ্রহ করেছিলেন। কাহিনীটি ১৯৪৭ সালে ‘সোনাধনের গীত’ নামে প্রকাশিত হয়েছিল।
সমাধির ভেতর থেকে বাইরের দৃশ্য। ছবি : লেখক সৌজন্যে
রাজমোহন নাথ বইটির মুখবন্ধে লিখেছেন, ‘সোনাধনের গীত জৈন্তা রাজপরিবারের প্রেমকাহিনীমূলক একটি কাব্য। এই গীতের আদি রচয়িতা কে, জানা যায় না। জৈন্তার প্রাচীন রাজবাটীর সন্নিকটস্থ জাঙ্গাল হাটি নিবাসী কানাই খলিফার নিকট হইতে আমি ১৯৪২ ইংরাজীতে এই গীতটি সংগ্রহ করিয়াছিলাম। তখন কানাই মিয়ার বয়স ছিল সত্তর বৎসর। কানাই মিয়া যৌবনে গাজীর গানের খলিফা ছিল এবং গ্রাম্য সম্মেলনে সোনাধনের গীতটি গাহিতে তাহার তিন রাত্রি লাগিত। কানাই মিয়া নিরক্ষর; সে তাহার ওস্তাদের নিকট হইতে মুখে মুখে এই গীতটি শিখিয়াছিল। কানাই মিয়ার বিশ্বাস, এই গীতের আদি রচয়িতা শ্রীধর বাণিয়া। শ্রীহট্টের অন্য এক গ্রাম্য গীতিতে শ্রীধর বাণিয়ার ভণিতা পাওয়া যায়। কেহ কেহ মনে করেন, শ্রীধর বাণিয়া বঙ্গদেশের লোক। কানাই মিয়া আমাকে বলিয়াছে- শ্রীধর বাণিয়াকে সে বাল্যকালে জৈন্তায় দেখিয়াছে। জৈন্তার রাজধানীর একটি পাড়ায় তাঁহার বাড়ী ছিল।”
বিজয়নারায়ণ সিংহের সমাধি। ছবি : লেখক সৌজন্যে
মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ রচিত ‘চতুলের সোনাধনের কবিতা’ এবং রাজমোহন নাথ কর্তৃক সংগৃহীত ‘সোনাধনের গীত’ মূলত একই কাহিনী হলেও বিভিন্ন প্রসঙ্গে কবিতা দুটির বক্তব্য পরস্পরবিরোধী। অধিকাংশক্ষেত্রেই কবিতা দুটির বর্ণনায় কোনো মিল নেই। পরস্পরবিরোধী বক্তব্যগুলোর মধ্যে কোনটি সঠিক, তা নিরূপণ করার উপায় নেই। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- চতুলের সোনাধনের কবিতায় বলা হয়েছে, রাজা বিজয় সিংহকে নৌকাদৌড় প্রতিযোগিতার ছলে হত্যা করা হয়েছিল। কিন্তু সোনাধনের গীতে বলা হয়েছে, গভীর রাতে নৌযোগে পাখি শিকারের সময় রাজাকে কৌশলে পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করেছিল জনৈক মনাই ডুম। কোন বক্তব্যটি সঠিক, তা নিরূপণ করা কোন গবেষকের পক্ষেই সম্ভব নয়। শ্রোতাদেরকে আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে অতিরিক্ত নাটকীয়তা আরোপ করতে গিয়ে কবিতাগুলোর প্রকৃত রচয়িতারা হয়ত অনেক ঘটনাকেই অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করেছেন। সোনাধনের গীতের ক্ষেত্রে এমন প্রভাব বেশ লক্ষণীয়। কবিতাটির সংগ্রাহক রাজমোহন নাথ নিজেও এমন ধারণা পোষণ করতেন। তাই তিনি বলেছেন, ‘এইরূপ গায়ক স্বভাবত : কবিত্বগুণ সম্পন্ন; আসরে দাঁড়াইয়া গীত গাহিবার সময় সদা সর্ব্বদাই নুতন নুতন পদ রচনা করিতে সমর্থ।’