বর্ষা শেষের এক বিকেল। বাঁশের তৈরি ছোট্ট ঘরের খোলা বারান্দায় পা দুলিয়ে বসে আছি। চোখের সামনে দিগন্ত বিস্তৃত কাপ্তাই হ্রদ ও নীলচে সবুজ পাহাড়। মাছ ধরার ছোট ছোট নৌকা যাচ্ছে হ্রদের বুকে পানকৌড়ি হয়ে। তাতে জলের নাচন এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে আমার আদিবাসী ঘরে। এমন সময় নিলা এলো গরম গরম নুডুলস ও চা নিয়ে।
নিলা চাকমা। ছবি : সময়ের আলো
রাঙামাটির মেয়ে নিলা চাকমা। ওর বাড়িতে দুদিনের আতিথেয়তা গ্রহণ করতে যান্ত্রিক শহর থেকে ছুটে গিয়েছিলাম হ্রদ-পাহাড়ের দেশে। দুদিনে নিলা ও তার পরিবারের মানুষের ভালোবাসায় যেন আকণ্ঠ ডুবে ছিলাম। সেই বিকেলে নিলা যখন ওর হাতের তৈরি নুডুলস ও চা নিয়ে আমার কাছটিতে এসে বসলো, বিকেলটা যেন আরও প্রেমময় হয়ে উঠলো। কোনো একটা ফুল গাছের মস্ত বড় সবুজ পাতায় হলদে রঙের খাবারটা কবিতা হয়ে ধরা দিয়েছিল। আকাশ ভরা সাদা মেঘের ঐশ্বর্য দেখতে দেখতে নুডুলস খেলাম দুজন। ঠোঁট ছোঁয়ালাম চায়ের কাপে।
নিলা গল্প জুড়ে দিলো- ‘জানো দিদি, ওইযে দূরের নীলচে বড় বড় পাহাড় দেখতে পাচ্ছো, ওগুলো বিলাইছড়ির পাহাড়। যাবে ওখানে ঘুরতে?’ নিলার গল্পরা ডালপালা মেলে বাড়তে থাকল, সেই সঙ্গে বিকেলও তল্পিতল্পা গুটিয়ে সন্ধ্যাকে দিয়ে গেল সমস্ত অধিকার। নিলা চাকমা ভাষায় গান ধরলো। সেই গান হ্রদের ঢেউয়ের শব্দে স্বর্গ নামিয়ে আনলো। ও আবার পাহাড়ি জাম্বুরা নিয়ে এসে বসলো। আমরা খেতে খেতে সন্ধ্যা দেখছি। দূরে সেনাবাহিনীর ক্যাম্প থেকে আসা আলো হ্রদের বুকে পড়ে জলরংয়ের ক্যানভাস হয়ে উঠেছে। চাঁদও মেঘের আড়াল ছেড়ে নিজেকে মেলে ধরেছে ততক্ষণে। ক্যাম্প ও চাঁদের আলোতে আমরা খানিক বাদে বাদে নৌকার চলাচল দেখছিলাম। অযুত কোটি তারাও জানান দিচ্ছিল তাদের উপস্থিতি। এই সৌন্দর্য পুরোপুরি কেবল চোখের লেন্সেই ধরা সম্ভব, কোনো কৃত্রিম ক্যামেরায় নয়।
দুপুরের খাবার। ছবি : সময়ের আলো
পরদিন হ্রদের জলে ইচ্ছেমতো গোসল করলাম। গোসলের আগেই নিলা দুপুরের খাবার রান্না করে ফেলেছে। পাহাড়ি মুরগি, হ্রদ থেকে নিজেদের ধরা মাছ ভাজা, মসুরের ডাল, বাঁধাকপি সেদ্ধ। কলাপাতায় করে খেতে দেওয়া হলো আমাকে। সেই দুপুরে হ্রদের পাশে বসে জল ছুঁয়ে আসা হাওয়ার সঙ্গে খেতে খেতে মনে হয়েছিল, এমন অমৃত খাওয়ার সৌভাগ্য সচরাচর হয় না।
দ্বীপের ভেতর নিলার বাড়ি। ছবি : সময়ের আলো
হ্রদে বিকেল নামার মুহূর্তটা স্বর্গীয়। তখন যেন জীবন আমাদের অন্য পৃথিবীতে নিয়ে গিয়ে সোনার কাঠি ছুঁইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেয়। সেই শান্তিময় মুহূর্তে আমরা নৌকা নিয়ে বের হলাম। নিলার নিজেদেরই নৌকা। রাঙামাটির সব দ্বীপের বাসিন্দাদেরই ব্যক্তিগত নৌকা থাকে, যেমন আমাদের বুকের ভেতর থাকে ব্যক্তিগত নদী। বৈঠা বাওয়া ও পাহাড়ের সবুজ বৃক্ষের শব্দ ছাড়া তখন যেন পুরো পৃথিবী নিশ্চুপ। আমরা সেই নৈঃশব্দ্যে খানিকটা অযাচিত হস্তক্ষেপ করলাম। আমাদের হাসি ও কথামালা বিকেলের সঙ্গে বন্ধু পাতালো। ভাসতে ভাসতে খানিকটা দূরে যাওয়ার পর দ্বীপের ভেতর জেগে থাকা নিলার বাড়িটা দেখছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, কে বলেছে আদিবাসী শামুকের কোনো ঘর নেই? পাহাড় থেকে সমতল সবখানেই তাদের ঘর। শুধু চারটে দেয়াল থাকলেই কী ঘর হয়? যেখানে এত প্রেম, এত আতিথেয়তা আছে, সেখানেই তৈরি হয় ঘর, সেখানেই জীবন ও যাপনের বহমান নদী।
কাপ্তাই হ্রদে সূর্যাস্ত। ছবি : সময়ের আলো
নিলার সঙ্গ ছেড়ে এলাম, সারিসারি পাহাড়ের আড়ালে সূর্য যখন মৃতফুল হয়ে যাচ্ছিল কোনো দাবিদাওয়া না রেখেই। দুটো দিনে আমাদের যত গল্প, গান, প্রেম ও স্মৃতি জমা হলো, সেই সমুদ্রের একটুখানিই প্রকাশ করলাম, বাকিটা আমার একান্ত থাকুক।
আদিবাসীদের সঙ্গে পথচলা তো কেবল পাহাড়েই নয়। শহরেও আছে আমার আদিবাসীজন। তাদের সঙ্গে নিত্য আমার ‘প্রাণের খেলা’ চলে। আমরা শহর ঘুরে বেড়াই, দেশের গল্প করি, এক ভাষায় হাসি, আমাদের দুঃখের রংও এক। জীবন ও যাপনের যেটুকু পার্থক্য, তা ওদের স্বাতন্ত্র। সেই স্বাতন্ত্র আমাকে মুগ্ধ করে প্রতিনিয়ত।
এইযে আমার মতো অসংখ্য মানুষের মন পাহাড় পাহাড় করে, তা কি কেবল সবুজ বৃক্ষে জড়ানো পাহাড়ের কারণেই? যারা পাহাড়কে বুকে-পিঠে করে আগলে রাখে, তাদের প্রতি টান নেহায়েৎ কম নয়। তাইতো পাহাড় ঘুরে আসা মানুষের আজন্ম গল্পের খোরাক হয়ে যায়, বিভিন্ন পাড়ায় বসতি গড়া আদিবাসীদের সঙ্গে কাটানো স্মৃতি কিংবা পাহাড়ের বাঁকে খানিকটা সময় একসঙ্গে পথচলা কোনো আদিবাসীর আন্তরিকতা। শুধু পাহাড় তো নয়, সমতলের আদিবাসীরাও একইভাবে মায়া ছড়ায়। তারা ঝিনাইকুড়ির মতো উদার জমিন বিছিয়ে রাখে বিরানভূমি থেকে লোকালয়ে …