গৃহযুদ্ধের কবলে পড়ে যে মেয়েটা আশ্রয় নিয়েছিল পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্রের শরণার্থী শিবিরে, সে একদিন নিজের অদম্য ইচ্ছেশক্তির জোরে হয়েছিল পাইলট। কিন্তু, দুর্ভাগ্যক্রমে জীবন বাঁচাতে তাকে নিজের দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। বলছি, আফগানিস্তানের দ্বিতীয় নারী পাইলট সাফিয়া ফিরোজির কথা। সে এখন কোথায়, কেমন আছে?
গত শতকের নব্বই দশক। আফগানিস্তানে তখন তালিবানি শাসন বা ঔদ্ধত্যের রমরমা। বাচ্চা কী বুড়ো, নিজের বাড়িতেও মেয়েরা নিরাপদ নয়। তখন ফিরোজি ছিলেন শিশু। ওই সময় আফগানিস্তানের যুদ্ধবাজ নেতারা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হলে- ফিরোজির পরিবার কাবুলের বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে চলে যান পাকিস্তানে। সেখানে শরণার্থী হিসেবে অবস্থান করেন তারা। শরণার্থী শিবিরের জীবনের সঙ্গে সবাই মানিয়ে নিতে বা ভাগ্যকে মেনে নিতে পারলেও, পারল না শুধু সেই ছোট্ট মেয়েটি। সে কোনো নিয়ম মানতে চাইত না। নিজের জেদই বজায় রাখত সবসময়। সেই জেদ আর একাগ্রতাই পরবর্তী সময়ে তাকে নিয়ে যায় অনেকদূর।
সাফিয়া ফিরোজি। ছবি : সংগৃহীত
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে আফগানিস্তানে তালেবানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হয়। সেই যুদ্ধে তালেবান শাসনের ইতি ঘটে দেশটিতে। তখন পাকিস্তান থেকে ফিরে আসেন সাফিয়া। এসে স্কুলে ভর্তি হন। একসময় গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। তখন টেলিভিশন চ্যানেলে নারীদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে আহ্বান জানানো একটি বিজ্ঞাপন দেখতে পান। আর তাতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেন ফিরোজি। তিনি কমিউনিকেশন অফিসার হওয়ার জন্য পড়াশোনা করতে থাকেন। তারপর যোগ দেন মিলিটারি একাডেমিতে। কিন্তু যে মেয়ের শৈশব কেটেছে শরণার্থী হিসেবে, ভাগ্য তার জন্য যে মুক্ত আকাশে ওড়ার ইতিহাস লিখে রেখেছিল, তা কে জানত। একপর্যায়ে ওই একাডেমিতে ঘোষণা দেওয়া হয়, পাইলট হওয়ার জন্য নারীদের খুঁজছে বিমানবাহিনী। এ ঘোষণায় ফিরোজি ও অন্য ১২ জন মেয়ে আবেদন করেন। তবে, পরীক্ষায় টিকে যান শুধু একজন। তিনি হলেন সাফিয়া ফিরোজি।
পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ হেরাতে তিনি যখন প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন, সেখানে তার পরিচয় হয় পাইলট ক্যাপ্টেন মোহাম্মদ হাওয়াদ নাহাফির সঙ্গে। পরে তারা দুজনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। স্ত্রীর পাইলট হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় সমর্থন দিয়েছেন নাহাফি। পাইলট হওয়ার পর তার নামের আগে যুক্ত হয় ক্যাপ্টেন। তিনি হয়ে ওঠেন ক্যাপ্টেন সাফিয়া ফিরোজি। তারপর সংসার আর নিজের কর্মক্ষেত্র সামলাতে থাকেন সুনিপুণ দক্ষতায়।
আফগানিস্তানের মতো রক্ষণশীল দেশে তিনি দেশটির দ্বিতীয় নারী পাইলট হিসেবে জায়গা করে নিয়েছিলেন। ২০১৩ সালে আফগানিস্তানে প্রথম নারী পাইলট হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন নিলুফার রহমানি। তার পরের রেকর্ড ফিরোজির। ফিরোজি যে বিমানটি চালাতেন, তা হলো সি-২০৮। তিনি বলতেন, ‘যখন আমি সেনাবাহিনীর পোশাক পরি, প্রকৃতপক্ষেই তখন নিজেকে একজন নারী ভাবতে গর্ব অনুভব করি।’
কিন্তু সাফিয়ার সংগ্রাম যেন শেষ হওয়ার নয়। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট, এদিন কাবুল আবার তালেবানের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। স্বামী আর ৫ বছরের একমাত্র কন্যা নার্গিসকে নিয়ে ওইদিনই কাবুল ত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি। একজন মার্কিন উপদেষ্টার সহায়তায় তারা মার্কিন সামরিক পরিবহন বিমানে করে প্রথমে কাতারে পৌঁছান। কিছুদিন পর কাতারে আরেক কন্যা সন্তানের জন্ম দেন সাফিয়া। তারপর কাতার ছেড়ে চলে যান নিউজার্সিতে। সেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ৩ মাস অবস্থান করেন। এরপর ওরেগন রাজ্যে পুনর্বাসিত হওয়ার পরিকল্পনা করছিলেন তারা।
নিউজার্সিতে থাকা অবস্থায় এক গণমাধ্যমে সর্বশেষ সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন এই অদম্য নারী পাইলট।
তিনি বলেছিলেন, ‘আমি অন্য নারীদের জন্য পথ তৈরি করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু, তালেবান ক্ষমতায় আসার কারণে সহজে আফগানিস্থানে আর কোনো নারী পাইলট দেখা যাবে বলে মনে হয় না।’
প্রত্যাশা ব্যক্ত করে সাফিয়া বলেছিলেন, ‘অনেক আফগান পাইলটের মতো আমিও আবার উড়োজাহাজ উড়ানোর স্বপ্ন দেখি।’
সাফিয়া পালিয়ে যাওয়ার পর একবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে যে, তাকে তালেবানরা পাথর ছুঁড়ে হত্যা করেছে। কিন্তু সেটি ভুয়া খবর ছিল। তিনি তখন কাতারে। কিছুদিন সেখানে ইন্টারনেট ব্যবহার করার সুযোগ ছিল না তার। যখন তিনি হাসপাতালে আরেকটি কন্যা সন্তানের জন্ম দেন, তখন চিকিৎসকের মাধ্যমে জানতে পারেন, তাকে নিয়ে মৃত্যুর ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছে। সেই খবর শুনে তিনি ও তার স্বামী আত্ময়িস্বজনদের বার্তা পাঠিয়ে জানান, তিনি বেঁচে আছেন।
সেই স্মৃতি মনে করে কান্নাজড়িত কন্ঠে সাফিয়া তার শেষ সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আফগানিস্থানে আমার জীবন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ভেঙে পড়েছিল। যদি আমি সেখানে থেকে যেতাম, তাহলে হয়ত সত্যিই আমাকে হত্যা করা হতো।’
সাফিয়া ফিরোজি এখন কোথায়, কেমন আছে তা আর জানা যায়নি। তবুও নারীদের বন্ধুর যাত্রাপথে সাফিয়া ফিরোজিরা সবসময় আলোর মশাল হয়ে থাকবেন।