অভাব, প্রতিকূলতা আর হারানোর বেদনা পেরিয়ে পাহাড়ে গড়ে তুলেছেন নিজের উদ্যোগ। মাত্র ১২ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা সেই ছোট খাবারের দোকানে আজ ১০০ জনের বেশি অতিথির বসার জায়গা রয়েছে। পাশাপাশি কর্মসংস্থান হয়েছে ১৫ জন নারীর। খাগড়াছড়ির নেইম্রা মারমার এই পথচলা তাই শুধু সাফল্যের গল্প নয়, স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ারও গল্প। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি জনপদে নেইম্রা মারমার বেড়ে ওঠা আর দশটি সাধারণ পরিবারের মতোই। নিজের ওপর বিশ্বাস আর কিছু করার অদম্য ইচ্ছা থেকেই সামান্য পুঁজি নিয়েই শুরু করেন ছোট্ট একটি খাবারের দোকান। ভালোবেসে নাম দেন ‘স্বপ্নচূড়া’।
শুরুর দিকে ফুচকা, নুডলসসহ জনপ্রিয় পাহাড়ি স্ন্যাকস ‘মুণ্ডি’ নিয়ে যাত্রা শুরু হয় স্বপ্নচূড়ার। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে ক্রেতার সংখ্যা। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝতে পারেন, শুধু পরিশ্রম করলেই হবে না, ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন পরিকল্পনা, হিসাব ও আধুনিক ব্যবস্থাপনার জ্ঞানও। এ পর্যায়ে তার পাশে দাঁড়ায় বিশ্বব্যাংক ও পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এবং সহযোগী সংস্থা আইডিএফের বাস্তবায়নে রিকভারি অ্যান্ড অ্যাডভান্সমেন্ট অব ইনফরমাল সেক্টর এমপ্লয়মেন্ট (আরএআইএসই) প্রকল্প।
সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে নেইম্রা পান ৫ লাখ টাকা ঋণ সুবিধা। এই অর্থ তার ব্যবসা সম্প্রসারণে নতুন গতি আনে। তবে নেইম্রার কাছে শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, প্রকল্পের আওতায় পাওয়া ১৬ দিনের নিবিড় প্রশিক্ষণও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ব্যবসায়িক পরিকল্পনা, আর্থিক ব্যবস্থাপনা, ঝুঁকি মোকাবিলা এবং গ্রাহকসেবার বিভিন্ন কৌশল শেখেন নেইম্রা। পাশাপাশি অনলাইন মার্কেটিং ও আধুনিক হিসাবরক্ষণ পদ্ধতির ব্যবহারও আয়ত্ত করেন। নেইম্রার বলেন, ‘এই প্রশিক্ষণ আমার আত্মবিশ্বাস বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আমি শিখেছি ব্যবসায়ের সব আয় নিছক মুনাফা নয়; ভবিষ্যতের জন্য বিনিয়োগ ও সঞ্চয়ের গুরুত্বও অপরিসীম।’
ঋণের অর্থ কাজে লাগিয়ে স্বপ্নচূড়ার পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি রেস্টুরেন্টে যুক্ত করেন নতুন সুবিধা। দুপুরে লাঞ্চ এবং বিকালে বিভিন্ন মুখরোচক স্ন্যাকস পরিবেশন করা হয়। আগে যেখানে ১০ থেকে ২০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল, আধুনিকায়নের পর সেখানে একসঙ্গে ১০০ জনের বেশি অতিথি বসতে পারেন। শিশুদের জন্য রয়েছে কিডস জোন। আছে নান্দনিক ফিশ অ্যাকুয়ারিয়ামও। বর্তমানে স্বপ্নচূড়ার প্রতিদিনের গড় আয় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা।
নেইম্রার সাফল্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের কর্মসংস্থান। বর্তমানে তার প্রতিষ্ঠানে ১৫ জন নারী কাজ করছেন। তাদের মধ্যে ১২ জন পূর্ণকালীন এবং তিনজন খণ্ডকালীন দায়িত্ব পালন করছেন। নারীদের অগ্রাধিকার দিয়ে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছেন তিনি। বিশেষ করে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মেধাবী শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যেতে সহায়তা করার চেষ্টা করেন।
কাজের সুযোগের পাশাপাশি তাদের শিক্ষার খরচ বহনেও সহযোগিতা করছে স্বপ্নচূড়া। শুরুর দিনগুলোতে ঝুড়িতে করে খাবার আনা-নেওয়া করতেন নেইম্রা। তখন অনেকেই তার উদ্যোগ নিয়ে উপহাস করেছেন। একসময় যাকে অবহেলা করা হতো, আজ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তিনিই আমন্ত্রিত হন প্রধান অতিথি হিসেবে। ভবিষ্যতে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরে স্বপ্নচূড়ার শাখা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে নেইম্রার। তার রেস্টুরেন্টকে ঘিরে যে এলাকাটি গড়ে উঠেছে, সেটিও এখন ‘স্বপ্নচূড়া আবাসিক এলাকা’ নামে পরিচিত।
ভবিষ্যৎ উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে নেইম্রার বলেন, ‘স্বপ্ন দেখুন, সাহস রাখুন আর কখনো হাল ছাড়বেন না।’ তার নিজের জীবনই যেন সেই কথার বাস্তব উদাহরণ।
সময়ের আলো/মহু