মেরি কুরি। গ্রাফিক : সময়ের আলো নারী বলে তার বৈজ্ঞানিক গবেষণার ওপর আস্থা রাখতে পারেনি কেউ। গবেষণার জন্য আর্থিক সাহায্যও পাননি। এমনকি রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্স নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রথমবার তার অর্জনকে উপেক্ষা করেছিল। পরবর্তী সময়ে তিনিই বিজ্ঞানের দুটি ভিন্ন শাখায় অবদানের জন্য আলাদা নোবেল জয় করেন। বলছি নারী বৈজ্ঞানিক মেরি কুরির কথা, যিনি ছিলেন প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম নারী অধ্যাপকও।
১৮৬৭ সালের ৭ নভেম্বর পোল্যান্ডে জন্ম হয় এই মহীয়সী নারীর। পুরো নাম মেরি স্কলোডসকা কুরি, ডাক নাম মানিয়া। বিজ্ঞান ও সাহিত্য চর্চার হাতেখড়ি হয় পরিবার থেকেই। পোল্যান্ডের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগ দেওয়ার অপরাধে তার পৈতৃক নিবাস ও নানাবাড়ির সব সম্পত্তি ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
মেরি কুরিকে তাই জীবন সংগ্রামটা অল্প বয়স থেকেই শুরু করতে হয়েছিল। প্রথমে পোল্যান্ডের ভ্রাম্যমাণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া শেষ করে ১৮৯১ সালে ফ্রান্সে চলে যান তিনি। এরপর প্যারিসের সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন ও গণিতে পড়ালেখা শুরু করেন। বিভিন্ন পদার্থের চৌম্বকধর্ম নিয়ে তিনি প্রথম গবেষণা শুরু করেন। তার গবেষণার একমাত্র সহযোগী ছিলেন স্বামী পিয়েরে কুরি। পিয়েরে কুরি নিজেও ছিলেন বিজ্ঞানী। তারা দুজন একসঙ্গে গবেষণার কাজ করতেন।
১৮৯৮ সালে মেরি পিচব্লেন্ড খনিজ থেকে প্রথম মৌল আবিষ্কার করেন। জন্মভূমির নাম অনুসারে তার নাম রাখেন ‘পোলনিয়াম’। একই বছর তিনি দ্বিতীয় মৌল ‘রেডিয়াম’ আবিষ্কার করেন। এ দুটি মৌলই ইউরেনিয়াম থেকে ১০ লাখ গুণ বেশি শক্তিশালী। তিনিই প্রথম আবিষ্কার করেন যে, থোরিয়াম তেজস্ক্রিয় রশ্মি নির্গত করে।
১৯০৩ সালে তিনি প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। ওই বছরের ডিসেম্বর মাসে বিকিরণের ওপর গবেষণার জন্য পিয়েরে কুরি এবং হেনরি বেকেরেলকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। অথচ এই গবেষণা কুরি দম্পতি দুজনে মিলেই করেছিলেন। পিয়েরে তখন নোবেল প্রদান কমিটির কাছে অভিযোগ করেন এবং মেরি কুরির ব্যাপারে অবহিত করেন। এরপর সমন্বিতভাবে তাদেরকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়।
১৯১০ সালে মেরি কুরি বিশুদ্ধ রেডিয়াম পৃথক করতে সক্ষম হন। ১৯১১ সালে তিনি আবারও নোবেল পুরস্কার পান রসায়ন বিভাগে। ১৯১৫ সালে কুরি ছিদ্রযুক্ত সুঁচ তৈরি করেন, যাতে রেডিয়াম নিঃসৃত পদার্থ ছিল। সেই পদার্থ আক্রান্ত মানব টিস্যুকে জীবাণুমুক্ত করতে সক্ষম হয়। বিশ্বজুড়ে মেরির খ্যাতি তখন বাড়তে থাকে।
শুধুমাত্র নারী বলে গবেষণার কাজে বিশেষ কোনো আর্থিক সহযোগিতা পাননি। বিষয়টি নিয়ে তার মনে বেশ হতাশা ছিল। সম্ভবত সে কারণেই ১৮৯৩ সালে পাওয়া একটি ছোট বৃত্তির টাকা তিনি ১৮৯৭ সালে ফিরিয়ে দেন।
অবশেষে ১৯২০ সালে ফরাসি সরকার লজ্জিত হয়ে মেরির জন্য বিশেষ বৃত্তির ব্যবস্থা করেন। পাশাপাশি তাকে ‘লিজিয়ন অব অনার’ রাষ্ট্রীয় উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু নিজে মেধা ও যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর সরকারি এই সম্মাননা মেরি প্রত্যাখ্যান করেন।
১৯৩০ সালে তিনি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক ওজন কমিটিতে নিযুক্ত হন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন এই মহীয়সী নারী।
তেজস্ক্রিয়তাকে কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে কাজে লাগানো যায়, গবেষণার শুরু থেকে সেই চেষ্টাই তিনি করে গেছেন নিরলসভাবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন হাসপাতালগুলোতে এক্সরের সরঞ্জামের ঘাটতি ছিল, তিনি তখন তহবিল সংগ্রহ করে ২২০টি রেডিওলোজি স্টেশন গড়ে তোলেন, যার মধ্যে ২০টি ছিল ভ্রাম্যমাণ এবং ২০০টি স্থায়ী। তার গড়া ফিল্ড রেডিওলজিক্যাল সেন্টার থেকে যুদ্ধের সময় ১০ লাখ আহত ব্যক্তির এক্সরে করা হয়েছিল। তিনি নিজেও বিভিন্ন স্টেশনে গিয়ে এক্সরে করতে সহযোগিতা করতেন।
গবেষণার কাজে দীর্ঘদিন তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে থাকায় তিনি রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত হয়ে ১৯৩৪ সালের ৪ জুলাই ফ্রান্সে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে সেকাউক্সের সমাধিস্থলে পিয়েরে কুরির সঙ্গে সমাহিত করা হয়।
সময়ের আলো/মহু