পর্যটকদের চোখের সামনেই লুকিয়ে ছিল হাজার বছর আগের ২৮০ খোদাইচিত্র

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

স্পেনের কাতালোনিয়ার একটি গুহায় মিলেছে প্রস্তর যুগের ২৮০টি খোদাইচিত্র। ঘোড়া, হরিণ, গবাদিপশু, ছাগলজাতীয় প্রাণী—এমনকি একটি ভালুকের ছবিও রয়েছে এসব খোদাইয়ে।

2026-11-06T22:19:31+00:00
2026-11-06T22:19:31+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
পর্যটকদের চোখের সামনেই লুকিয়ে ছিল হাজার বছর আগের ২৮০ খোদাইচিত্র
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ১০:১৯ পিএম 
ছবি : সংগৃহীত
স্পেনের কাতালোনিয়ার একটি গুহায় মিলেছে প্রস্তর যুগের ২৮০টি খোদাইচিত্র। ঘোড়া, হরিণ, গবাদিপশু, ছাগলজাতীয় প্রাণী—এমনকি একটি ভালুকের ছবিও রয়েছে এসব খোদাইয়ে। গবেষকদের মতে, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে আইবেরীয় উপদ্বীপের প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রের অন্যতম বড় সংগ্রহ এটি। আবিষ্কারটি শুধু প্রাচীন শিল্পকলার ইতিহাসে নতুন তথ্য যোগ করেনি, বরং কাতালোনিয়ায় প্রস্তর যুগের শিল্পকর্মের উপস্থিতি সম্পর্কে এত দিনকার ধারণাও বদলে দিয়েছে।

কাতালোনিয়ার এসপ্লুগা দে ফ্রাঙ্কোলি এলাকায় অবস্থিত ‘কোভা দে লা ফন্ত মেজর’ নামের গুহাটিতে এসব খোদাইচিত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকেরা বলছেন, বেশ কিছু প্রাণীর ছবির শৈলী উচ্চ প্রস্তর যুগের ম্যাগডালেনীয় যুগের আগের সময়ের শিল্পরীতির সঙ্গে মেলে। সে ক্ষেত্রে এই গুহা ওই অঞ্চলের প্রাচীনতম প্রতীকী শিল্পচর্চা বোঝার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠতে পারে।

গবেষক জোসেপ মারিয়া ভেরগেস বশ ও মিরিয়াম সালাস-আলতেসের বিস্তারিত গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে অ্যান্টিকুইটি সাময়িকীতে।

গুহার ভেতরে ২৮০টি খোদাইচিত্র

কোভা দে লা ফন্ত মেজর বিস্তৃত চুনাপাথরের গুহাব্যবস্থার অংশ। গুহাটির বর্তমান প্রবেশপথ থেকে প্রায় ২৫০ মিটার ভেতরে, ভূগর্ভস্থ একটি নদীর কাছাকাছি এসব খোদাইচিত্রের সন্ধান মিলেছে।

এ পর্যন্ত গবেষকেরা ২৮০টি পৃথক চিত্র বা নকশা শনাক্ত করেছেন। এর মধ্যে ৫৫টি প্রাণীর ছবি। বাকিগুলোর বেশির ভাগই জ্যামিতিক বা বিমূর্ত নকশা। এসবের মধ্যে রয়েছে সমান্তরাল ও পরস্পরের দিকে এগিয়ে যাওয়া রেখা, বৃত্তাকার বা অর্ধবৃত্তাকার আকৃতি এবং চতুর্ভুজের মতো নকশা।

প্রাণীর ছবিগুলোর মধ্যে ঘোড়া, হরিণ, গবাদিপশু ও ছাগলজাতীয় প্রাণীর উপস্থিতি রয়েছে। সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ছবিগুলোর একটি ভালুকের। এতে ভালুকটির কান সামনের দিক থেকে দেখানো হয়েছে, আর মুখ কিছুটা খোলা।

তবে প্রায় ৩০ শতাংশ প্রাণীর ছবি দেখে সেগুলো কোন প্রজাতির, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। গবেষকদের মতে, প্রাণীগুলোর শারীরিক গঠন সরল বা কিছুটা বিকৃতভাবে ফুটিয়ে তোলার কারণে শনাক্ত করা কঠিন হয়েছে।

পাথরের স্বাভাবিক গঠন কাজে লাগিয়েছিলেন শিল্পীরা

গুহার শক্ত চুনাপাথরের স্তরের মাঝখানে থাকা তুলনামূলক নরম মার্ল পাথরে এসব খোদাই করা হয়েছে। বেশির ভাগ ছবিই ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে পাথরের গায়ে দাগ কেটে তৈরি। কিছু ক্ষেত্রে ঘষে পাথরের উপরিভাগ সরানো হয়েছে। আবার কয়েকটি ছবিতে দুই পদ্ধতিরই ব্যবহার দেখা যায়।

উচ্চ রেজল্যুশনের ত্রিমাত্রিক (থ্রিডি) মডেল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, খোদাইয়ের দাগগুলো সাধারণত ৩ থেকে ৭ মিলিমিটার চওড়া এবং খুব বেশি গভীর নয়।

প্রাগৈতিহাসিক শিল্পীরা গুহার দেয়ালের স্বাভাবিক গঠনও ছবির অংশ হিসেবে ব্যবহার করে থাকতে পারেন বলে মনে করছেন গবেষকেরা। যেমন, একটি ঘোড়ার ছবিতে পাথরের দুই স্তরের মধ্যবর্তী সীমানাকে ঘোড়াটির পায়ের নিচে মাটির রেখা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মনে হয়।

অন্য একটি ছবিতে হরিণের মাথা ও ঘাড় নিচের দিকে নেমে এসেছে পাথরের একটি স্বাভাবিক অনুভূমিক ফাটলের দিকে। গবেষকদের ধারণা, ওই ফাটলকে মাটি কিংবা পানির পৃষ্ঠ হিসেবে কল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে। যদিও এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ইচ্ছাকৃতভাবে কাজে লাগানো হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে একই ধরনের প্রবণতা একাধিক ছবিতে দেখা গেছে।

কয়েক দশক ধরেই ছিল সবার চোখের সামনে

২০১৯ সালের ৩০ অক্টোবর গুহাটিতে একটি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রকল্পের কাজ চলার সময় ঘটনাচক্রে খোদাইচিত্রগুলোর সন্ধান পান গবেষকেরা। এত দিন ধরে সেগুলো মানুষের চোখ এড়িয়ে যাওয়ায় বিস্মিত হয়েছেন তাঁরা।

উনিশ শতক থেকেই কোভা দে লা ফন্ত মেজর গুহায় মানুষের প্রবেশ ছিল। ১৯৫৭ সালে গুহাটির আধুনিক প্রবেশপথ আবার খুলে দেওয়া হয়। পরে এর একটি অংশ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। ফলে হাজার হাজার মানুষ এসব প্রাচীন খোদাইচিত্রের পাশ দিয়ে হেঁটে গেলেও সেগুলো নজরে আসেনি।


এমনকি কেউ কেউ গুহার দেয়ালে নিজেদের নাম ও তারিখ খোদাই করেছেন। অথচ তাঁদের আঁচড়ের নিচেই চাপা পড়ে ছিল হাজার হাজার বছরের পুরোনো চিত্রকর্ম।

গুহাটির দেয়ালের বড় একটি অংশ অনিয়মিত ও এবড়োখেবড়ো পাথরের তৈরি। এ ধরনের পৃষ্ঠে খোদাই করা কঠিন বলে মনে করা হতো। এ কারণেও জায়গাটিকে প্রস্তর যুগের শিল্পকর্মের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি। কিন্তু নতুন আবিষ্কারে দেখা গেছে, কাতালোনিয়ায় এখন পর্যন্ত জানা প্রাগৈতিহাসিক দেয়ালচিত্রের সবচেয়ে বড় সমাবেশ রয়েছে এই গুহাতেই।

কিছু খোদাইচিত্র কয়েক হাজার বছরের পুরোনো

প্রতিটি খোদাইচিত্র ঠিক কত বছরের পুরোনো, তা নির্ধারণ করা এখনো কঠিন। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা গেছে, প্রায় ৪০ হাজার থেকে ২৬ হাজার বছর আগে গুহাটির গভীর অংশে মানুষের বসতি ছিল। অন্যদিকে, প্রাণীর কিছু ছবির শৈলীর সঙ্গে উচ্চ প্রস্তর যুগের ম্যাগডালেনীয় যুগের আগের শিল্পরীতির মিল রয়েছে।

প্রাণীর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ও মাথা আঁকার বিশেষ কিছু কৌশল এসব ছবিতে দেখা যায়। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের অন্য কয়েকটি প্রত্নস্থলেও একই ধরনের শিল্পরীতির সন্ধান পাওয়া গেছে। সেগুলোকে উচ্চ প্রস্তর যুগের আরও প্রাচীন পর্যায়ের বলে মনে করা হয়।

তবে গবেষকেরা সতর্ক করে বলেছেন, সব খোদাইচিত্র একই সময়ে তৈরি হয়েছে, এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই। কিছু ছবি ম্যাগডালেনীয় যুগে, এমনকি তার পরের কোনো সময়েও তৈরি হয়ে থাকতে পারে।

একটি প্রাণীর খোদাইচিত্রের ওপর ক্যালসাইটের স্তর জমে আছে। ইউরেনিয়াম-সিরিজ পদ্ধতিতে এই স্তরের বয়স নির্ণয় করা সম্ভব হতে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ছবিটির বয়স সম্পর্কে আরও সরাসরি প্রমাণ পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।

প্রাগৈতিহাসিক শিল্পের মানচিত্রে বদল

এই আবিষ্কারের আগে কাতালোনিয়ায় উচ্চ প্রস্তর যুগের দেয়ালচিত্র হিসেবে মাত্র দুটি নিদর্শনের কথা জানা ছিল। তবে সেগুলোর সত্যতা ও সংরক্ষণ নিয়েও জটিলতা রয়েছে।

এর একটি ছিল কোভা দেল তেন্দো গুহায় পাওয়া গবাদিপশুর একটি আঁকা ছবি। আবিষ্কারের কিছুদিন পরই সেটি চুরি হয়ে যায়। এখন শুধু ছবিটির আলোকচিত্র ও একটি প্রতিলিপি টিকে আছে। অন্যটি কোভা দে লা তাভেরনা গুহায় পাওয়া হরিণের একটি অসম্পূর্ণ ছবি। সেটি মানুষের তৈরি কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

আইবেরীয় উপদ্বীপের অন্য অঞ্চলে যেখানে প্রাগৈতিহাসিক গুহাচিত্রের প্রচুর নিদর্শন রয়েছে, সেখানে কাতালোনিয়ায় এমন শিল্পকর্মের স্বল্পতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ফন্ত মেজরের আবিষ্কার সেই চিত্র বদলে দিয়েছে।


গবেষকদের হিসাবে, ৫৫টি প্রাণীর ছবি নিয়ে এই গুহা ভূমধ্যসাগরীয় আইবেরীয় উপকূলজুড়ে পরিচিত প্রস্তর যুগের গুহাশিল্পের মধ্যে তৃতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ। প্রাণীর ছবি বা জুমরফিক চিত্রের সংখ্যার ভিত্তিতে এ হিসাব করা হয়েছে। দক্ষিণ স্পেনের আরদালেস ও লা পিলেতা—শুধু এই দুটি গুহায় এর চেয়ে বেশি প্রাণীর ছবি পাওয়া গেছে।

এ ছাড়া পূর্ব আইবেরীয় উপদ্বীপে প্রস্তর যুগের গুহাশিল্পের এত বড় সংগ্রহের সন্ধান এবারই প্রথম মিলল।

আরও গুহায় লুকিয়ে থাকতে পারে প্রাচীন শিল্পকর্ম

এই আবিষ্কারের গুরুত্ব শুধু ফন্ত মেজর গুহার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। গবেষকদের ধারণা, কোনো অঞ্চলে প্রাচীন গুহাশিল্পের নিদর্শন কম পাওয়ার অর্থ এই নয় যে সেখানে মানুষের শিল্পচর্চা ছিল না। বরং প্রত্নতাত্ত্বিকেরা কীভাবে এবং কোথায় অনুসন্ধান করেছেন, তার ওপরও আবিষ্কারের সংখ্যা নির্ভর করতে পারে।

ফন্ত মেজরের ঘটনা দেখিয়েছে, বহু মানুষের যাতায়াত রয়েছে এমন গুহাতেও প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকর্ম অক্ষত থাকতে পারে। এমনকি যেসব পাথুরে দেয়ালকে খোদাইয়ের জন্য অনুপযোগী মনে করা হতো, সেখানেও পাওয়া যেতে পারে প্রাচীন শিল্পের নিদর্শন।

তবে গুহাটির কিছু অংশে আধুনিক মানুষের আঁচড় ও প্রাকৃতিক ক্ষয়ের কারণে খোদাইচিত্র নষ্ট হয়েছে। গবেষকদের ধারণা, বর্তমানে শনাক্ত করা ২৮০টি চিত্রের বাইরেও সেখানে আরও অনেক নিদর্শন ছিল।


এই আবিষ্কারের পর উত্তর-পূর্ব আইবেরীয় উপদ্বীপের অন্য গুহাগুলো নিয়েও নতুন করে অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। কোভা সিমানিয়া গুহায় সাম্প্রতিক গবেষণায় প্রস্তর যুগের চিত্রকর্মের আরও প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এত দিন কাতালোনিয়াকে প্রাগৈতিহাসিক শিল্পকলার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর মাঝখানে প্রায় শূন্য একটি অঞ্চল হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু ফন্ত মেজরের আবিষ্কার বলছে, অঞ্চলটিতে প্রস্তর যুগের মানুষের প্রতীকী শিল্পচর্চার ইতিহাস ধারণার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ হতে পারে। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   পর্যটক  হাজার বছর  ২৮০ খোদাইচিত্র 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: