সংকটে কাশ্মীরের জাফরান চাষ, বেগুনি ফুলের মাঠগুলোতে এখন শুধুই শঙ্কা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

আন্তর্জাতিক

জাফরানবিশ্বেরস্বীকৃতি পাওয়াসবচেয়ে দামি মসলা। গাঢ় লাল রঙ ও অনন্য সুগন্ধের কারণে এটি পরিচিত ‘লাল সোনা’ নামে। ভারতের কাশ্মীর অঞ্চলে শতাব্দীপ্রাচীন

2026-11-06T19:53:05+00:00
2026-11-06T19:56:12+00:00
 
  শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬,
২২ কার্তিক ১৪৩৩
শুক্রবার, ৬ নভেম্বর ২০২৬
আন্তর্জাতিক
সংকটে কাশ্মীরের জাফরান চাষ, বেগুনি ফুলের মাঠগুলোতে এখন শুধুই শঙ্কা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: শুক্রবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৬, ৭:৫৩ পিএম  আপডেট: ০৬.১১.২০২৬ ৭:৫৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জাফরান বিশ্বের স্বীকৃতি পাওয়া সবচেয়ে দামি মসলা। গাঢ় লাল রঙ ও অনন্য সুগন্ধের কারণে এটি পরিচিত ‘লাল সোনা’ নামে। ভারতের কাশ্মীর অঞ্চলে শতাব্দীপ্রাচীন এই মসলার চাষ এখন জলবায়ু পরিবর্তন, অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও খাদ্যে ভেজালের কারণে হুমকির মুখে। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, একসময় কাশ্মীরের ঐতিহ্য ও অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠা এই মসলা ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে।

কাশ্মীরের শ্রীনগরের একটি পুরোনো বাজারে জাফরান কিনতে গিয়ে কিছুটা ইতস্তত করতে দেখা গেল এক দোকানিকে। দোকানের তাকজুড়ে আখরোট, মসলা ও শুকনো ফল সাজানো। বাজারে পর্যটকদের আনাগোনা থাকলেও কাশ্মীরি জাফরানের কথা বলতেই দোকানির আচরণ বদলে গেল। তিনি দোকানের ভেতরে তাকিয়ে কাউন্টারের নিচ থেকে কাপড়ে মোড়ানো ছোট একটি স্টিলের পাত্র বের করলেন।

পাত্রের ভেতরে ছিল গাঢ় লাল রঙের কয়েকটি জাফরানের আঁশ।

দোকানি নিচু স্বরে বললেন, এগুলো ‘পাম্পোরের জাফরান’। অর্থাৎ ভারতের প্রধান জাফরান উৎপাদন অঞ্চল পাম্পোরের উঁচু জমিতে উৎপাদিত। এরপর তিনি জানালেন, এ বছর খুব অল্প পরিমাণে জাফরান পাওয়া গেছে।

পাশেই কাচের আরেকটি পাত্রে রাখা ছিল তুলনামূলক উজ্জ্বল লাল রঙের জাফরান। দোকানি সেটি দেখিয়ে বললেন, এগুলো ইরানের জাফরান। এখন অনেক দোকানেই ইরানের জাফরান কাশ্মীরি বলে বিক্রি হচ্ছে। অধিকাংশ ক্রেতার পক্ষে দুই ধরনের জাফরানের পার্থক্য বোঝা সম্ভব নয়।

জাফরান কেবল একটি মসলা নয়, কাশ্মীরের সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বিয়ের বিভিন্ন খাবারে এর ব্যবহার রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী পানীয় ‘নুন চা’, প্রচলিত ওষুধ এবং সুগন্ধি তৈরিতেও জাফরান ব্যবহৃত হয়। দীর্ঘদিন ধরে এটি উপত্যকার অন্যতম মূল্যবান রফতানি পণ্য। 

কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাফরানের উৎপাদন কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম এবং স্থানীয় বাজারে আমদানি করা জাফরানের আধিক্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে যাওয়া হয় পাম্পোরে। কয়েক শতাব্দী ধরে কাশ্মীরে জাফরান চাষের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত এই শহর।

সেখানে গিয়ে দেখা যায়, শুধু একটি মূল্যবান মসলার উৎপাদনই কমছে না; এর সঙ্গে জীবিকা ও ঐতিহ্য হারানোর ঝুঁকিতেও পড়েছেন বহু কাশ্মীরি পরিবার।

‘লাল সোনা’ জাফরানের ঐতিহ্য 

শ্রীনগর ছাড়িয়ে সামনের দিকে এগোলে ধীরে ধীরে চোখে পড়ে উঁচু ও শুষ্ক মাটির বিস্তীর্ণ মালভূমি। স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘কারেওয়া’ নামে। প্রতি বছর শরৎকালে এই মালভূমিতেই ফোটে জাফরানের বেগুনি ফুল।

জাফরান সংগ্রহের মৌসুম সাধারণত অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত। এ সময় পুরো এলাকা বেগুনি ফুলে ছেয়ে যাওয়ার কথা। ভোরের আলো ফোটার আগেই পরিবারের সদস্যরা বাঁশের ঝুড়ি নিয়ে মাঠে আসেন। অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ফুল সংগ্রহ করেন তারা। গ্রামের রাস্তার পাশে অপেক্ষায় থাকেন ব্যবসায়ীরা, যাতে সকালেই কৃষকদের কাছ থেকে তাজা জাফরান কিনতে পারেন।

তবে ২০২৫ সালের অক্টোবরে সেখানে গিয়ে অনেক জমিই শুষ্ক দেখা যায়। দুসু গ্রামের কৃষক মোহাম্মদ আসিফের পরিবারের জমিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে কিছু বেগুনি ফুল ফুটেছিল। অনেক জায়গায় কোনো ফুলই দেখা যায়নি।

আসিফ জানান, ওই বছর তাদের জমিতে জাফরান উৎপাদন হয়েছে মাত্র প্রায় ২৫০ গ্রাম। অথচ আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৪ সালে উৎপাদন হয়েছিল প্রায় দেড় কেজি।

তিনি বলেন, জাফরান চাষে সময়ের হিসাব খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে সময়ে গাছের আর্দ্রতা প্রয়োজন, তখন বৃষ্টি না হলে ফুলের উৎপাদন দ্রুত কমে যায়।

জাফরান আসে ‘ক্রোকাস স্যাটিভাস’ নামের একটি উদ্ভিদ থেকে। বেগুনি রঙের এই ফুলের ভেতরে থাকে তিনটি গাঢ় লাল গর্ভমুণ্ড বা আঁশ। গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখতে সূর্য ওঠার আগেই হাতে ফুল সংগ্রহ করতে হয়। এরপর অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ফুল থেকে আঁশ আলাদা করে কয়েক ঘণ্টা ধরে শুকানো হয়।

মাত্র এক আউন্স বা ২৮ গ্রাম জাফরান উৎপাদন করতে প্রায় চার হাজার ফুল প্রয়োজন হয়। এ ছাড়া বছরে মাত্র দুই থেকে চার সপ্তাহ এই গাছে ফুল ফোটে। এসব কারণেই জাফরান বিশ্বের সবচেয়ে দামি মসলাগুলোর একটি। অনেকেই একে ‘লাল সোনা’ বলে থাকেন।

প্রাকৃতিক পরিবেশে এখন আর জাফরান গাছের অস্তিত্ব দেখা যায় না। তবে বর্তমান ইরান, গ্রিস ও মধ্য এশিয়ার কয়েকটি অঞ্চলে হাজার হাজার বছর আগে এর চাষ শুরু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। পারস্যের প্রভাব ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের মাধ্যমে কয়েক শতাব্দী আগে জাফরান কাশ্মীরে পৌঁছায়।

কাশ্মীরি জাফরানের বিশেষত্ব হলো এর গাঢ় লাল রং, মোটা আঁশ এবং তীব্র সুগন্ধ। জাফরানের রাসায়নিক উপাদান নিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে, এতে ‘ক্রোসিন’ নামের ক্যারোটিনয়েড যৌগের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। এই উপাদানই জাফরানের গাঢ় রঙের জন্য দায়ী। সাধারণত ইরানি জাফরানের চেয়ে কাশ্মীরি জাফরানের দাম বেশি। প্রতি গ্রাম জাফরানের দাম ৪ ডলার বা তারও বেশি হতে পারে।

পাম্পোরের বহু পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জাফরান চাষের সঙ্গে যুক্ত। ফসল তোলার মৌসুমকে কেন্দ্র করেই তারা পরিবারের খরচ ও বিয়ের মতো বড় আয়োজনের পরিকল্পনা করতেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিবারের সদস্য ও প্রতিবেশীরা একসঙ্গে বসে ফুল থেকে লাল আঁশ আলাদা করতেন। পাশে চলত লবণাক্ত চায়ের কেটলি। প্রবীণ বাসিন্দাদের স্মৃতিতে রয়েছে এমন শরৎকাল, যখন পুরো মালভূমি বেগুনি ফুলে ঢেকে যেত।

এক দশকে উৎপাদন কমেছে ব্যাপক হারে

গত এক দশকে কাশ্মীরি জাফরানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ভারতের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাশ্মীর ও পার্শ্ববর্তী জম্মু অঞ্চলে ২০১০-১১ অর্থবছরে জাফরানের উৎপাদন ছিল ৮ টন। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ২ দশমিক ৬ টনে।

গবেষকদের মতে, আবহাওয়ার পরিবর্তনসহ কয়েকটি কারণে এই উৎপাদন কমছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসের বৃষ্টিপাত জাফরানের ফুল ফোটা এবং মাটির নিচে থাকা কন্দের বিকাশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করলে উৎপাদন দ্রুত কমে যায়।

কাশ্মীরভিত্তিক স্বতন্ত্র জলবায়ু গবেষক ও অধিকারকর্মী রাবিয়া খান বলেন, জাফরান চাষের জন্য ঋতুভিত্তিক আবহাওয়ার একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য প্রয়োজন। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই ভারসাম্য ক্রমেই নষ্ট হচ্ছে।

তার ভাষ্য, শরৎকালে বৃষ্টিহীন সময় এখন দীর্ঘ হচ্ছে এবং এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তিও বাড়ছে। গত কয়েক বছরে তুষারপাতের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ এবং মাটির আর্দ্রতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পশ্চিম হিমালয়ে তুষারপাত কমে যাওয়া এবং গড় তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় পুরো অঞ্চলের পানির প্রবাহব্যবস্থায় প্রভাব পড়ছে।

বদলে যাচ্ছে আবহাওয়া, সংকুচিত হচ্ছে চাষের জমি

পাম্পোরের কৃষকদের কাছে এসব পরিবর্তন কেবল গবেষণার তথ্য নয়, বরং প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। কয়েকজন কৃষক জানান, আগের মতো শীত এখন দীর্ঘস্থায়ী বা তীব্র হয় না। যেসব ছোট নদী ও ঝরনায় আগে বরফ গলার পানি গ্রামের দিকে প্রবাহিত হতো, সেগুলোও বছরের শুরুতেই দুর্বল হয়ে পড়ে।

জাফরানচাষি আবদুল রশিদ ওয়ানি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন তাদের সেচের জন্য পাম্পের ওপর অনেক বেশি নির্ভর করতে হচ্ছে।

উৎপাদন কমে যাওয়ার উদ্বেগ থেকে ২০১০ সালে ভারত সরকার ‘ন্যাশনাল স্যাফরন মিশন’ চালু করে। এর লক্ষ্য ছিল সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, জাফরানের কন্দের পুনরুজ্জীবন এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানো। এ কর্মসূচির আওতায় পাম্পোরের জাফরান উৎপাদন এলাকায় গভীর নলকূপ, স্প্রিংকলার সেচব্যবস্থা এবং কৃষকদের বৈজ্ঞানিক সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

কিছু কৃষক জানান, কয়েকটি গ্রামে সেচের সুবিধা বেড়েছে। তবে অন্যদের অভিযোগ, পাইপলাইন নষ্ট, পানির সরবরাহ অনিয়মিত এবং ফুল ফোটার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচব্যবস্থা মেরামতে বিলম্ব হয়। এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে ভারতের কৃষি ও কৃষককল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা সাড়া দেয়নি।

এদিকে জাফরান চাষের জমিও ক্রমেই কমে যাচ্ছে। সড়ক সম্প্রসারণ, আবাসিক এলাকা গড়ে তোলা এবং বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের কারণে একসময় জাফরান চাষের জন্য ব্যবহৃত জমির বড় অংশ দখল হয়ে যাচ্ছে। কৃষকেরা এমন অনেক এলাকার কথা বলছেন, যেখানে অল্প কয়েক বছর আগেও জাফরানের ফুল ফুটত।

কোনিবাল গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা হাবিব খান বলেন, একসময় প্রতিটি পরিবারই জাফরানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু এখন অনেক তরুণ এই পেশায় নিজেদের ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন না।

কৃষকদের আরেকটি সমস্যার নাম সজারু। দুসু গ্রামের কৃষক আসিফ তার জমির কয়েকটি জায়গা দেখিয়ে বলেন, এসব প্রাণী মাটি খুঁড়ে জাফরানের কন্দ নষ্ট করে ফেলছে। রাতে তারা জমিতে এসে মাটির নিচের কন্দ তুলে ফেলে। অনেক সময় ফুল না ফুটলে কৃষকেরা ক্ষতির বিষয়টি বুঝতে পারেন না, অথচ প্রকৃত ক্ষতি হয়ে যায় মাটির নিচে।

আসিফের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সজারুর আক্রমণ বেড়েছে। বিশেষ করে বসতি ও ঝোপঝাড়ের কাছাকাছি জমিগুলোতে এ সমস্যা বেশি। ফসল রক্ষায় কোনো কোনো কৃষক অস্থায়ী বেড়া তৈরি করছেন। আবার অনেকে রাত জেগে জমি পাহারা দিচ্ছেন।

নয়াদিল্লিভিত্তিক সাময়িকী ‘ডাউন টু আর্থ’-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাছাকাছি ময়লার ভাগাড়ে আকৃষ্ট হয়ে আসা ইঁদুরও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জাফরানের কন্দের ব্যাপক ক্ষতি করছে।

কাশ্মীরি জাফরানের নামে বিক্রি হচ্ছে ইরানি জাফরান

বিশ্বের মোট জাফরানের প্রায় ৯০ শতাংশ উৎপাদন করে ইরান। তবে দেশটির কৃষকেরাও দীর্ঘস্থায়ী খরা ও পানিসংকটসহ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা চাপে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাবেও বিশ্ববাজারে কাশ্মীরি ও ইরানি—দুই ধরনের জাফরানের সরবরাহ ও দামে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।

তবে ইরানি জাফরান কাশ্মীরের কৃষকদের জন্য আরেকটি সমস্যার কারণ হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে দিল্লির মসলা বাজারের এক ব্যবসায়ী জানান, আমদানি করা ইরানি জাফরান অনেক সময় বিপুল পরিমাণে ভারতের বাজারে প্রবেশ করে। পরে সেগুলো নতুন মোড়কে ভরে কাশ্মীরি জাফরান হিসেবে বিক্রি করা হয়।

কার্টন ও ওজন মাপার যন্ত্রে ভর্তি একটি ছোট গুদামে ওই ব্যবসায়ী ইরানি জাফরানের কয়েকটি প্যাকেট খুলে দেখান। পাশাপাশি রাখা হয় স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কাশ্মীরি জাফরান। দুই ধরনের জাফরানের আঁশের মধ্যে পার্থক্যও তুলে ধরেন তিনি।

ব্যবসায়ী বলেন, ক্রেতারা কাশ্মীরি জাফরান চান, কারণ এই নামের আলাদা বাজারমূল্য রয়েছে। কিন্তু প্যাকেটজাত করার পর অধিকাংশ ক্রেতার পক্ষে আসল ও নকলের পার্থক্য বোঝা সম্ভব হয় না।

শুধু বিদেশি জাফরান কাশ্মীরি নামে বিক্রিই নয়, ভেজালের আরও নানা কৌশল রয়েছে। জাফরানের বদলে বা এর সঙ্গে স্যাফফ্লাওয়ার কিংবা হলুদ মেশানো হয়। কখনো কখনো ক্ষতিকর রংও ব্যবহার করা হয়।

জম্মু ও কাশ্মীর অঞ্চলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা জে অ্যান্ড কে ফুড অ্যান্ড ড্রাগস ডিপার্টমেন্টের খাদ্যবিজ্ঞানী শাজিয়া মালিক মসলার বিশুদ্ধতা যাচাই নিয়ে কাজ করেন। তিনি বলেন, এ ধরনের ভেজাল ভোক্তা ও কৃষক—উভয়েরই ক্ষতি করছে।

তার ভাষ্য, আমদানি করা জাফরান কাশ্মীরি জাফরানের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হলে কিংবা ভুল পরিচয়ে বিক্রি করা হলে ভোক্তাদের আস্থা কমে যায়। একই সঙ্গে স্থানীয় কৃষকেরাও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন।

পাম্পোরের কয়েকজন কৃষকের আশঙ্কা, ভেজাল জাফরানের কারণে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাচ্ছে। কারণ, প্রকৃত কাশ্মীরি জাফরানের উৎপাদন কমলেও বাজারে ‘কাশ্মীরি জাফরান’ নামে পণ্য বিক্রি অব্যাহত রয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাফরানের মান যাচাইয়ের সনদ এবং ইলেকট্রনিক পদ্ধতিতে উৎপাদন ও সরবরাহের উৎস শনাক্ত করার ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিবিসিকে এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ব্যবস্থার কারণে তদারকি বেড়েছে। তবে কৃষকদের দাবি, নিয়মিতভাবে আইন প্রয়োগ ও নজরদারি এখনো নিশ্চিত হয়নি।

জাফরান শুধু ফসল নয়, একটি জীবনধারা

শ্রীনগরের কাছে সরকারি উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের বিজ্ঞানী নেয়াজ আহমদ দার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাফরান চাষ নিয়ে গবেষণা করছেন। বিশেষায়িত কক্ষে আর্দ্রতা, তাপমাত্রা ও আলোর পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে জাফরানের ফুল ফোটার প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।

২০২৫ সালের নভেম্বরে তার সঙ্গে দেখা হলে তিনি বলেন, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষাবাদ করলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমানো সম্ভব। তাদের লক্ষ্য সুস্থ কন্দ সংরক্ষণ এবং নিয়মিত ফুল ফোটা নিশ্চিত করা।

ঘরের ভেতরে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে জাফরান চাষ নিয়ে প্রাথমিক গবেষণায় আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। এতে ফুল ফোটার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা এবং জাফরানের রং সৃষ্টিকারী ক্রোসিন উপাদান সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে।

জাফরানের উৎপাদন টেকসই করতে বিজ্ঞানীরা ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবস্থাপনা, উন্নত কন্দ সংরক্ষণ এবং মাটির আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিচ্ছেন। তবে অনেকের মতে, অবশিষ্ট জাফরান চাষের জমি রক্ষা করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

পাম্পোরের কৃষকদের অনেকেই বলছেন, সাময়িকভাবে ফসল নষ্ট হওয়ার চেয়ে তাদের বড় উদ্বেগ হলো, নির্মাণকাজের বিস্তারে জাফরানের জমি ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। একবার কোনো জমিতে ভবন বা স্থাপনা তৈরি হলে সেখানে আবার চাষাবাদে ফিরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব।

গত বছরের নভেম্বরে দুসু গ্রামে আবার গেলে কৃষক আসিফ তার পরিবারকে নিয়ে ভোরের আগে জাফরান সংগ্রহের কাজে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানান। ধীরে ধীরে দিনের আলো ফুটতেই বোঝা যায়, এবার তাদের ফসলের পরিমাণ কতটা কমেছে। পরিবারের ঝুড়িগুলো আগের বছরগুলোর তুলনায় অনেক কম ভরা।

পরে বাড়িতে আসিফের স্ত্রী জেবা অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে ফুল থেকে জাফরানের লাল আঁশ আলাদা করছিলেন। পাশে রাখা কাপ থেকে লবণাক্ত চায়ের ধোঁয়া উঠছিল। আসিফ শুকানোর জন্য একটি ট্রেতে জাফরানের আঁশগুলো ছড়িয়ে দিচ্ছিলেন। পুরো ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল তাজা জাফরানের মাটির মতো স্নিগ্ধ সুগন্ধ।

আসিফ বলেন, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জাফরান চাষ এখানকার পরিবারগুলোর পরিচয়ের অংশ হয়ে আছে। মানুষ শুধু আয়ের কথা ভেবেই উদ্বিগ্ন নয়, এই জমির সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা জীবনধারাও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে তারা। 

*মীর সিনীন নামের স্বাধীন কাশ্মীরি-ভিত্তিক সাংবাদিকের প্রতিবেদন থেকে বাংলা করা। মূল প্রতিবেদন পড়া যাবে বিবিসিতে।* 

সময়ের আলো/জেডি 

  বিষয়:   কাশ্মীর  জাফরান চাষ  দামি মসলা 


Advertisement
Loading...
Loading...
আন্তর্জাতিক- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: