২০২৩ সালের জুনে জার্মানির লাইপজিগে ‘ডে এক্স’ বিক্ষোভ চলাকালে ব্ল্যাক ব্লকের বামপন্থী বিক্ষোভকারীরা পুলিশের ঘেরাওয়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। ছবি : সংগৃহীতফ্রান্স, ইতালি, স্পেন থেকে আলবেনিয়া—ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ-সমাবেশে কালো পোশাক পরা একদল তরুণের উপস্থিতি প্রায় নিয়মিত ঘটনা। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগসহ নানা সহিংস কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন তারা। পরিচিতি পেয়েছেন ‘ব্ল্যাক ব্লক’ নামে।
কালো পোশাকধারী এসব ব্যক্তি সরকারি-বেসরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর, গাড়ি ও ভবনে আগুন দেওয়া এবং বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর করে পণ্যসামগ্রী লুটের অভিযোগে অভিযুক্ত। খাবার থেকে শুরু করে অলংকার—বিভিন্ন জিনিস চুরির অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
ব্ল্যাক ব্লকের কয়েক শ সদস্যের সহিংস কর্মকাণ্ড অনেক সময় ছাত্রসংগঠন ও পেশাজীবী ইউনিয়নের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকেও অস্থির করে তোলে। কেউ কেউ মনে করেন, তাদের কর্মকাণ্ড সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিষয়গুলো সামনে আনে। তবে সমালোচকদের মতে, সহিংসতার কারণে বিক্ষোভকারীদের মূল দাবি আড়ালে পড়ে যায়।
কানাডার মন্ট্রিলের ইউনিভার্সিটি অব কুইবেকের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফ্রান্সিস দুপুই-দেরি আল জাজিরাকে বলেন, ১৯৮০-এর দশকে জার্মানিতে ‘অটোনোমিয়া’ বা স্বায়ত্তশাসনপন্থী সামাজিক আন্দোলন থেকে ব্ল্যাক ব্লকের সূচনা। রাষ্ট্র, পুঁজিবাদ, রাজনৈতিক দল, এমনকি কমিউনিস্ট ও শ্রমিক ইউনিয়নের বিরোধিতা করতেন এই আন্দোলনের কর্মীরা। তারা অনেকটা নৈরাজ্যবাদী ছিলেন এবং প্রচলিত ব্যবস্থার বাইরে জীবনযাপনে বিশ্বাস করতেন।
ব্ল্যাক ব্লকের সদস্যদের পোশাক ও পরিচিতির ধরনও তাদের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। দুপুই-দেরির ভাষ্য, সে সময়ের পাঙ্ক সংস্কৃতির প্রভাবে তারা কালো পোশাক, চামড়ার জ্যাকেট, হুডি, মোটরসাইকেলের হেলমেট, সানগ্লাস ও মুখে বাঁধার কাপড় ব্যবহার করতেন। মূল উদ্দেশ্য ছিল পুলিশের কাছে নিজেদের পরিচয় গোপন রাখা। এ আন্দোলনে কোনো নির্দিষ্ট নেতা, সাংগঠনিক কাঠামো, মুখপাত্র কিংবা আনুষ্ঠানিক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি নেই।
তবে ব্ল্যাক ব্লককে নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে সতর্ক করেছেন দুপুই-দেরি। তার মতে, বাম বা ডান—কোনো একক রাজনৈতিক পরিচয়ে তাদের সীমাবদ্ধ করা যায় না। অতীতে পোল্যান্ড ও জার্মানিতে ডানপন্থী জাতীয়তাবাদী এবং নব্য নাৎসি গোষ্ঠীকেও একই ধরনের কালো পোশাক ও সহিংস কৌশল ব্যবহার করতে দেখা গেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমন ঘটনা ঘটেনি।
ফ্রান্সে কয়েক সপ্তাহ ধরে শিক্ষার্থী ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর বড় ধরনের বিক্ষোভ চলছে। এসব কর্মসূচিতে সহিংসতা ও সম্পত্তি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এ বিষয়ে আল জাজিরা ফ্রান্সের বামপন্থী এক ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্যের কার্যালয়ে যোগাযোগ করেছিল। তবে বিষয়টিকে সংবেদনশীল উল্লেখ করে তারা মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ওই সদস্যের এক প্রতিনিধি বলেন, বিচ্ছিন্ন সহিংসতার ঘটনাকে সরকার তাদের আন্দোলন ও দলকে অপরাধী হিসেবে তুলে ধরতে ব্যবহার করছে। তাই এ বিষয়ে কথা বলতে চান না তারা।
ইতালির রোম, মিলান ও তুরিনেও পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ, ময়লার পাত্র ও গাড়িতে আগুন এবং ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। তবে ইতালির ফাইভ স্টার মুভমেন্টের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য মারিও ফুরোরের মতে, এসব ঘটনার সঙ্গে ব্ল্যাক ব্লকের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে—এমন কোনো আন্দোলনের বিষয়ে তিনি অবগত নন। তার ভাষ্য, মিলানে লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের অনেকেই খুব কম বয়সী, এমনকি অপ্রাপ্তবয়স্ক। এগুলো সংগঠিত নেটওয়ার্কের কর্মকাণ্ডের চেয়ে অনুকরণপ্রবণতা ও নেতিবাচক প্রভাবের ফল বলেই তার ধারণা। তবে প্রকৃত ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষকেই নির্ধারণ করতে হবে।
ব্ল্যাক ব্লক কোনো একক বা সুসংগঠিত আন্দোলন নয়। তাদের পরিচিত কোনো নেতৃত্ব কিংবা সাংগঠনিক কাঠামোও নেই। তবে তারা বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আসে। সদস্যরা একই ধরনের পোশাকের মাধ্যমে দ্রুত একে অপরকে চিনতে পারেন। পাশাপাশি মুখে মুখে যোগাযোগ এবং বিভিন্ন বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
আন্দোলনটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এক দেশ থেকে অন্য দেশে যাতায়াত। অতীতেও ইউরোপের বিভিন্ন দেশের বিক্ষোভে অংশ নিতে সীমান্ত পেরিয়ে ব্ল্যাক ব্লকের সদস্যদের যাওয়ার নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক বিক্ষোভ নিয়ে ইউরোপের সরকারগুলো বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করলেও দুপুই-দেরির ধারণা, ইউরোপে তাদের সংখ্যা ৫ হাজার থেকে ৭ হাজারের মধ্যে। প্রতিটি বিক্ষোভে কয়েক শ সদস্যের উপস্থিতি দেখা যায়। তবে তাদের কোনো সদস্যতালিকা না থাকায় প্রকৃত সংখ্যা নির্ধারণ করা কঠিন। দুপুই-দেরির ভাষায়, ‘কেউ তাদের থামাতে পারে না।’
‘ভাঙচুর ও হামলা চালাতেই আসে ব্ল্যাক ব্লক’
গত জানুয়ারিতে ফরাসি পার্লামেন্টে দেওয়া বক্তব্যে দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ বলেন, উল্লেখযোগ্য আকারের প্রতিটি সামাজিক বিক্ষোভেই ব্ল্যাক ব্লকের সদস্যদের দেখা যায়। তারা ভাঙচুর ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলা চালাতে আসে।
২০২৩ সালে ইতালি সরকার পুলিশের উন্নত প্রশিক্ষণের জন্য প্রকাশিত একটি নথিতেও ব্ল্যাক ব্লকের লক্ষ্য ও কৌশল তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, বিক্ষোভে অনুপ্রবেশ এবং পরে তা আরও উসকে দিয়ে ভাঙচুর ও সহিংসতা ছড়ানোর উদ্দেশ্যে ১৯৮০-এর দশকে ছোট ছোট, শিথিলভাবে সংগঠিত গোষ্ঠীর মাধ্যমে ‘ব্ল্যাক ব্লক’ কৌশল প্রতিষ্ঠা পায়।
নথিতে বলা হয়, সহিংসতা শুরুর আগেই তারা সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ও আশপাশের এলাকা পর্যবেক্ষণ করে। পরে এলাকাগুলোকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে আলাদা দলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। কোনো কোনো দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মনোযোগ অন্যদিকে সরিয়ে রাখে, যাতে বাকি দলগুলো নির্বিঘ্নে ভাঙচুর ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড চালাতে পারে।
ইতালির ওই নথিতে ব্ল্যাক ব্লকের সদস্যদের উচ্চমাত্রার চলাচলক্ষমতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে তারা গ্রেফতারের ঝুঁকি কমিয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি ঘটানোর সুযোগ পায়।
সাম্প্রতিক ইউরোপীয় বিক্ষোভের আগে ব্ল্যাক ব্লকের সবচেয়ে আলোচিত কর্মকাণ্ডের একটি ছিল ১৯৯৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক ঘিরে বিক্ষোভ। ২০১৬ সালের জুনে ফ্রান্সে শ্রম আইনবিরোধী দেশব্যাপী আন্দোলনেও তাদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। দুই ক্ষেত্রেই পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে কয়েক শ মানুষ আহত ও গ্রেফতার হন।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি