যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। ছবি : সংগৃহীতযুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ৫৪৮ জন বন্দির সাজা কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন গভর্নর গ্যাভিন নিউসম। তাদের মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে প্যারোলের সুযোগ ছাড়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একসঙ্গে এত বেশি বন্দির সাজা মওকুফের ঘটনা এটিই প্রথম।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) দেওয়া এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে কার্যত ক্যালিফোর্নিয়ার মৃত্যুদণ্ডের সারি খালি হয়ে যাচ্ছে। তবে অঙ্গরাজ্যটিতে গত ২০ বছর ধরে কোনো বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি।
এক খোলা চিঠিতে নিউসম বলেন, রাষ্ট্রীয়ভাবে কাউকে হত্যা করা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এটি বিচারব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং সমাজের প্রত্যেক মানুষের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে বলে তিনি মনে করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে মৃত্যুদণ্ডের প্রতি জনসমর্থন কমলেও এখনো দেশটির অধিকাংশ মানুষ এ শাস্তির পক্ষে। গত আগস্টে প্রকাশিত পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক জরিপে দেখা যায়, হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পক্ষে ৬৬ শতাংশ মার্কিন নাগরিক। তবে প্রায় ৭৩ শতাংশ মনে করেন, নিরপরাধ কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
মৃত্যুদণ্ডের মামলায় দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া ও আপিলের কারণে অনেক বন্দির সাজা শেষ পর্যন্ত কার্যকর হয় না। যুক্তরাষ্ট্রের ২৩টি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি নিষিদ্ধ। আরও কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে আইন থাকলেও কার্যত এ শাস্তির প্রয়োগ বন্ধ রয়েছে।
তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গুরুতর ফেডারেল অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। গত এপ্রিলে তাঁর প্রশাসন ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ব্যবস্থাসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ে এ শাস্তির প্রয়োগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেয়।
মৃত্যুদণ্ডের সমর্থকেরা অপরাধ দমনে এর কার্যকারিতার কথা বললেও সমালোচকেরা বলছেন, দীর্ঘদিনের গবেষণায় অপরাধ প্রতিরোধে এ শাস্তির কার্যকারিতার প্রমাণ মেলেনি। এ ছাড়া এর নৈতিকতা, ব্যয় এবং ভুল বিচারের কারণে নিরপরাধ ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঝুঁকি নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ডেথ পেনাল্টি ইনফরমেশন সেন্টারের (ডিপিআইসি) তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৮ সাল থেকে ক্যালিফোর্নিয়া মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পেছনে ৬০০ কোটি ডলার ব্যয় করেছে। এ সময়ে অঙ্গরাজ্যটিতে মাত্র ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া অন্তত ২০৩ জন ব্যক্তি পরে নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পেয়েছেন।
নিউসমের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে অপরাধবিচার সংস্কার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন। ডিপিআইসির নির্বাহী পরিচালক রবিন মাহের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। অন্য গভর্নররাও ব্যাপকভাবে সাজা মওকুফ করেছেন, তবে এত বড় পরিসরে কেউ করেননি।
তবে সাজা কমানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হতে হলে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বন্দির ক্ষেত্রে ক্যালিফোর্নিয়ার সুপ্রিম কোর্টের পর্যালোচনা প্রয়োজন হবে। অঙ্গরাজ্যটির আইন অনুযায়ী, একাধিক গুরুতর অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিদের সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে আদালতের অনুমোদন নিতে হয়।
ক্যালিফোর্নিয়া দীর্ঘদিন ধরে উদারপন্থী অঙ্গরাজ্য হিসেবে পরিচিত হলেও গত শতকের শেষ দিকে কঠোর অপরাধ দমন নীতির পরীক্ষাগার হিসেবেও পরিচিতি পেয়েছিল। ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ওয়াশিংটন ও ক্যালিফোর্নিয়া প্রথম দিকের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ছিল, যারা বারবার অপরাধে জড়ানো ব্যক্তিদের জন্য কঠোর ন্যূনতম সাজা নির্ধারণে ‘থ্রি স্ট্রাইকস’ আইন চালু করে। এখনো যুক্তরাষ্ট্রের অঙ্গরাজ্যগুলোর মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়াতেই সবচেয়ে বেশি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দি ছিলেন।
নিউসমের এ সিদ্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দির সংখ্যা প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যাবে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সাফল্যের কয়েক দিনের মাথায় এ ঘোষণা এল। টেক্সাস ও কানসাসের মতো ঐতিহ্যগতভাবে রিপাবলিকান-সমর্থিত এলাকায়ও দলটি বড় জয় পেয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই ‘ব্লু ওয়েভ’-এর পর ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সম্ভাব্য ডেমোক্রেটিক প্রার্থী হিসেবে নিউসমের নামও আলোচনায় এসেছে।
প্রায় আট বছর গভর্নরের দায়িত্ব পালনের পর মেয়াদসীমায় পৌঁছেছেন নিউসম। তার দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে শেষ হবে। আগামী ৪ জানুয়ারি সাবেক মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জেভিয়ার বেসেরার তার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার কথা রয়েছে।
তবে অপরাধবিচারসংক্রান্ত কিছু বিষয়ে নিউসমের অবস্থান সংস্কারপন্থী সংগঠন ও অঙ্গরাজ্যের আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়েছে। ২০২২ সালে কারাগারে নির্জন বন্দিত্বের ব্যবহার সীমিত করার একটি বিলে ভেটো দেন তিনি। জাতিসংঘ নির্দিষ্ট সময়ের বেশি নির্জন বন্দিত্বকে নির্যাতন হিসেবে বিবেচনা করে। ২০১৯ সালে অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থার (আইসিই) সঙ্গে কারা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা সীমিত করার একটি বিলেও ভেটো দিয়েছিলেন নিউসম। ২০২২ সালে একই ধরনের আরেকটি বিল অঙ্গরাজ্যের সিনেটে পাস হয়নি।
সূত্র : আল জাজিরা
সময়ের আলো/জেডি