ক্যালিফোর্নিয়া উপসাগরে একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক গ্রেট হোয়াইট শার্কের যকৃৎ বের করে খাচ্ছে অর্কার দল। ড্রোনে ধারণ করা এই দৃশ্য। ছবি : সংগৃহীত সমুদ্রের সবচেয়ে ভয়ংকর শিকারিদের একটি গ্রেট হোয়াইট শার্ক বা সাদা হাঙর। সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে শীর্ষ অবস্থানে থাকা এই প্রাণীকে একসময় মনে করা হতো প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলে একের পর এক সাদা হাঙরের মৃতদেহ ভেসে আসতে শুরু করলে বিজ্ঞানীরা বিস্মিত হয়ে যান। প্রতিটি মৃতদেহের পেটের অংশে ছিল একই ধরনের ক্ষত। শরীর চিরে বের করে নেওয়া হয়েছে কলিজা। কে এমন ভয়ংকর কাণ্ড ঘটাচ্ছে, তা নিয়ে তৈরি হয় রহস্য।
২০১৭ সালের ৩ মে। দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের কাছে মাছ ধরার গ্রাম গানসবাইয়ের উপকূলে ভেসে আসে একটি বিশাল সাদা হাঙরের মৃতদেহ। স্ত্রী হাঙরটির ওজন ছিল প্রায় ১ হাজার ১০০ কেজি। পেটের নিচে ছিল বড় একটি ক্ষত। সেখান থেকে বের করে নেওয়া হয়েছিল প্রায় ৯০ কেজি ওজনের কলিজা।
মৃত হাঙরটির ময়নাতদন্তের নেতৃত্বে ছিলেন সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অ্যালিসন টাউনার। দৃশ্যটি দেখে তার প্রতিক্রিয়া ছিল, ‘এ কাজ কে করল!’
পরবর্তী কয়েক মাসে একই উপকূলে আরও পাঁচটি সাদা হাঙরের মৃতদেহ পাওয়া যায়। প্রতিটির শরীরেই ছিল একই ধরনের ক্ষতচিহ্ন। পেট চিরে বের করে নেওয়া হয়েছে কলিজা।
দক্ষিণ আফ্রিকার রোডস বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক বলেন, শত শত সাদা হাঙরের ময়নাতদন্ত করেও এমন দৃশ্য আগে কখনো দেখেননি তিনি। একের পর এক একইভাবে হাঙরের মৃতদেহ ভেসে আসার ঘটনা ছিল অস্বাভাবিক।
তদন্ত করতে গিয়ে টাউনারের সন্দেহ হয় দুটি অরকার (হত্যাকারী তিমি) ওপর। এরা দেখতে অনেকটা ডলফিনের মতো হলেও আকারে বড় এবং শিকারি প্রাণী হিসেবে পরিচিত। তাদের নাম দেওয়া হয়েছিল পোর্ট ও স্টারবোর্ড। ধারণা করা হয়, তারা দুই ভাই।
২০১৫ সালে প্রথম কেপটাউনের আশপাশে দেখা যায় অরকা দুটিকে। তাদের পৃষ্ঠপাখনা বা ডরসাল ফিনের গঠন ছিল আলাদা। একটির পাখনা বাঁ দিকে এবং অন্যটির ডান দিকে হেলে থাকায় তাদের নাম রাখা হয় পোর্ট ও স্টারবোর্ড।
এরপর থেকেই উপকূলজুড়ে অস্বাভাবিক কিছু ঘটনা ঘটতে থাকে। ডুবুরিরা ব্রডনোজ সেভেনগিল হাঙরের মৃতদেহ খুঁজে পান। সেগুলোর শরীরও ছেঁড়া, কলিজা উধাও। ঘটনাস্থলে পোর্ট ও স্টারবোর্ডকে দেখা যাওয়ায় সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়।
কেপটাউনের কাছে ডায়ার আইল্যান্ড একসময় সাদা হাঙর দেখার জন্য পৃথিবীর অন্যতম জনপ্রিয় স্থান ছিল। শীতকালে সিল শিকারের জন্য সেখানে ভিড় করত অসংখ্য সাদা হাঙর। কিন্তু অরকা দুটির উপস্থিতির পর হঠাৎ করেই এলাকা থেকে উধাও হয়ে যায় হাঙরগুলো।
টাউনারের ভাষায়, হাঙরের সংখ্যা ধীরে ধীরে কমেনি, বরং রাতারাতি যেন সব উধাও হয়ে গিয়েছিল।
তবে অরকাদের সঙ্গে হাঙর হত্যার সম্পর্ক নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানীদের অপেক্ষা করতে হয় ২০২২ সাল পর্যন্ত। সে বছরের ১৬ মে কেপটাউন থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পূর্বে মোসেল বে উপকূলে ড্রোনে ধারণ করা হয় এক বিরল দৃশ্য। তিনটি অরকা মিলে প্রায় তিন মিটার লম্বা একটি সাদা হাঙর শিকার করছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, একটি অরকা নাক দিয়ে ধাক্কা দিয়ে হাঙরটিকে পানির ওপরে তুলে আনে। এরপর সেটিকে এক পাশে কাত করে পাখনার কাছাকাছি কামড় বসায়। পানিতে ছড়িয়ে পড়ে রক্ত। পরে অরকাটি হাঙরটিকে মুখে নিয়ে পানির নিচে চলে যায়। অন্য একটি অরকাকে হাঙরটির লেজের দিকে এগিয়ে যেতে দেখা যায়।
এই দৃশ্যের পর বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়, সাদা হাঙরের অন্যতম ভয়ংকর শিকারি আসলে অরকা। শুধু দক্ষিণ আফ্রিকা নয়, অস্ট্রেলিয়া ও ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলেও অরকার হাতে সাদা হাঙর শিকারের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে।
হাঙরের কলিজাই কেন অরকার পছন্দ?
অরকা ও সাদা হাঙর—দুটিই সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলের শীর্ষ পর্যায়ের শিকারি। সিল ও ডলফিনের মতো প্রাণী তাদের সাধারণ শিকার। তবে সাদা হাঙর শিকারের ক্ষেত্রে অরকাদের লক্ষ্য থাকে বিশেষ একটি অঙ্গ—কলিজা।
সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী অ্যালিসন টাউনারের মতে, অরকারা খাবারের ক্ষেত্রে বেশ বাছাইপ্রবণ। হাঙরের কলিজায় প্রচুর শক্তি ও পুষ্টি থাকে। একটি পূর্ণবয়স্ক সাদা হাঙরের শরীরের প্রায় ২৮ শতাংশই কলিজা। এর প্রায় ৯০ শতাংশ উচ্চশক্তিসম্পন্ন চর্বি বা লিপিড দিয়ে গঠিত।
দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় শক্তির জোগান এবং পানিতে ভেসে থাকার ভারসাম্য রক্ষায় হাঙরের কলিজা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ফলে এটি অরকাদের জন্য অত্যন্ত আকর্ষণীয় খাবার।
অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ার সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ইসাবেলা রিভস জানান, অরকাদের মধ্যে নির্দিষ্ট অঙ্গ বেছে খাওয়ার প্রবণতা আরও দেখা গেছে। তারা কখনো তিমির ঠোঁট ও জিহ্বা, আবার কখনো পেঙ্গুইনের বুকের পেশি খেয়ে থাকে।
তবে এই শিকারপদ্ধতি নতুন কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ডেবোরা গাইলসের মতে, পানির নিচে ক্যামেরা ও ড্রোনের ব্যবহার বাড়ায় এখন এসব ঘটনা বেশি নজরে আসছে। আগে থেকেই এমন আচরণ থাকলেও তা হয়তো মানুষের চোখে পড়ত না।
হাঙরকে অচল করে ফেলে অরকা
২০২০ সালে মেক্সিকোর বাজা ক্যালিফোর্নিয়ার কাছে ড্রোনে ধারণ করা একটি ভিডিও নতুন করে অরকাদের শিকারের কৌশল সামনে নিয়ে আসে। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী ও বন্য প্রাণীচিত্র নির্মাতা এরিক হিগুয়েরা প্রথমে বুঝতে পারেননি, অরকারা যে হাঙর শিকার করছে সেটি একটি অপ্রাপ্তবয়স্ক সাদা হাঙর।
ভিডিওটি বড় করে দেখার পর তিনি বুঝতে পারেন, পাঁচটি অরকা দলবদ্ধভাবে হাঙরটিকে শিকার করছে। প্রথমে তারা হাঙরটিকে পানির ওপরে তুলে আনে। এরপর সবাই মিলে সেটিকে উল্টে দেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই হাঙরটি অচল হয়ে পড়ে। পরে তার পেট কেটে কলিজা বের করে খেতে শুরু করে অরকারা।
বিজ্ঞানীদের ভাষায়, হাঙরকে উল্টে দিলে সেটি ‘টনিক ইমোবিলিটি’ নামের এক ধরনের সাময়িক পক্ষাঘাতগ্রস্ত অবস্থায় চলে যায়। অর্থাৎ নিজের শরীরের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে এবং সহজে নড়াচড়া করতে পারে না। এতে অরকাদের জন্য হাঙরের পেট কেটে কলিজা বের করা অনেক সহজ হয়ে যায়।
হিগুয়েরার মতে, অরকাদের এই শিকারপদ্ধতি বংশপরম্পরায় শেখানো হয়। পরিবারের বয়স্ক সদস্য, বিশেষ করে মাতৃতান্ত্রিক নেতৃত্বের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম এই কৌশল রপ্ত করে।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপসাগরে উষ্ণ পানির কারণে অপ্রাপ্তবয়স্ক সাদা হাঙরের উপস্থিতি বেড়েছে। ফলে তারা অরকাদের বিচরণক্ষেত্রের আরও কাছাকাছি চলে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি অরকাদের শিকারপদ্ধতি বদলে না দিলেও নতুন শিকারের সুযোগ তৈরি করছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
২০২৩ সালের অক্টোবরে অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিটার লম্বা একটি সাদা হাঙরের মৃতদেহ পাওয়া যায়। সেটির কলিজা, পরিপাকতন্ত্র ও প্রজনন অঙ্গ ছিল না। পরে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করে সেখানে অরকার ডিএনএ শনাক্ত করেন গবেষকেরা। অস্ট্রেলিয়ার জলসীমায় অরকার হাতে সাদা হাঙর শিকারের এটিই ছিল প্রথম নিশ্চিত প্রমাণ।
অরকার ভয়ে এলাকা ছাড়ছে সাদা হাঙর
অরকার আক্রমণ শুধু সাদা হাঙরের প্রাণহানিই ঘটাচ্ছে না, তাদের স্বাভাবিক বিচরণক্ষেত্রও বদলে দিচ্ছে। দক্ষিণ আফ্রিকার ওয়েস্টার্ন কেপ উপকূলে আগে যেখানে নিয়মিত সাদা হাঙর দেখা যেত, সেখান থেকে তারা হঠাৎ করেই সরে যেতে শুরু করেছে। কেউ গভীর সমুদ্রে চলে যাচ্ছে, কেউ আবার উপকূল ধরে পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে।
টাউনার বিষয়টিকে তুলনা করেছেন আফ্রিকার সেরেঙ্গেটি অঞ্চলের শিকারি প্রাণীদের আচরণের সঙ্গে। তাঁর ব্যাখ্যা, কোনো এলাকায় নতুন ও শক্তিশালী শিকারি প্রবেশ করলে সেখানে আগে থেকে থাকা প্রাণীরা নিজেদের আচরণ বদলে ফেলে। কেউ শিকারের সময় পরিবর্তন করে, কেউ আবার পুরো এলাকা ছেড়ে চলে যায়। সাদা হাঙরের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটছে বলে ধারণা করছেন তিনি।
তবে অরকার আক্রমণের আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার সাদা হাঙরের সংখ্যা কমছিল। ২০১৬ সালের ছয় বছরের গবেষণায় বলা হয়েছিল, চোয়াল ও পাখনার জন্য শিকার, সমুদ্রদূষণ, খাদ্যের সংকট এবং হাঙর ধরার জাল ও টোপযুক্ত বড়শির কারণে প্রজাতিটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। এ ছাড়া তাদের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্যও অত্যন্ত কম।
স্টেলেনবোশ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানী সারা আন্দ্রেওত্তির মতে, পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। মাছ ধরার জালে অনিচ্ছাকৃতভাবে আটকা পড়ে অনেক হাঙর মারা যাচ্ছে। পাশাপাশি উপকূলের সুরক্ষায় ব্যবহৃত হাঙর ধরার জাল এবং দীর্ঘ সুতোয় বড়শি ফেলে মাছ ধরার পদ্ধতিও তাদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ।
অরকার শিকার এই সংকট আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে সমুদ্রের অন্য প্রাণীদের ওপরও।
খাদ্যশৃঙ্খলে ছড়িয়ে পড়ছে প্রভাব
দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনের ফলস বে এলাকায় ২০১৫ সাল পর্যন্ত সাদা হাঙরের একটি স্থিতিশীল বিচরণক্ষেত্র ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সেখানে হাঙর প্রায় পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে যায়। গবেষণায় বলা হয়েছে, হাঙরখেকো অরকার উপস্থিতি এ পরিবর্তনের অন্যতম কারণ হতে পারে।
ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূলেও একই ধরনের ঘটনা দেখা গেছে। সান ফ্রান্সিসকোর পশ্চিমে সাউথইস্ট ফ্যারালন দ্বীপে অরকার উপস্থিতি টের পেয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই এলাকা ছেড়ে চলে যায় সাদা হাঙর। দীর্ঘদিনের গবেষণায় ইলেকট্রনিক ট্যাগের তথ্য বিশ্লেষণ করে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
হাঙর সরে যাওয়ায় সেখানে হাতি সিলের মতো প্রাণীর শিকার হওয়ার ঘটনাও কমে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, সাদা হাঙর অনুপস্থিত থাকার বছরগুলোতে হাতি সিলের ওপর শিকারের ঘটনা চার থেকে সাতটি কম ছিল।
দক্ষিণ আফ্রিকায় সাদা হাঙরের অনুপস্থিতির সুযোগে ব্রোঞ্জ হোয়েলার প্রজাতির হাঙর ওই এলাকায় বেশি দেখা যাচ্ছে। এখন খাঁচায় ডুব দিয়ে হাঙর দেখার পর্যটনেও এই প্রজাতিই প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে সাদা হাঙর কমে যাওয়ায় আফ্রিকান পেঙ্গুইনের মতো মহাবিপন্ন প্রাণীর ওপরও নতুন চাপ তৈরি হয়েছে। হাঙরের বিচরণ ও শিকারপদ্ধতিতে পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রের খাদ্যশৃঙ্খলে একের পর এক প্রভাব পড়ছে।
ফলস বে এলাকায় সাদা হাঙর কমে যাওয়ার পর তাদের শিকার করা প্রাণী, বিশেষ করে কেপ ফার সিল ও সেভেনগিল হাঙরের সংখ্যা বেড়েছে। এর প্রভাবে আবার ছোট হাঙর ও মাছের সংখ্যা কমেছে বলে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
অর্থাৎ দুটি অরকার শিকার কেবল কয়েকটি হাঙরের মৃত্যুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। সমুদ্রের একটি অঞ্চলে শীর্ষ শিকারির উপস্থিতি বদলে যাওয়ায় পুরো খাদ্যশৃঙ্খলে তৈরি হচ্ছে পরিবর্তন।
গবেষক অ্যালিসন টাউনারের ভাষায়, অরকারা কোনো উপকূল থেকে সাদা হাঙরকে সরিয়ে দিলে তার পরিবেশগত প্রভাব অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। আর সেই পরিবর্তন এখন বিজ্ঞানীরা নিজেদের চোখের সামনেই ঘটতে দেখছেন।
সূত্র : বিবিসি আর্থ
সময়ের আলো/জেডি