নাদিন গর্ডিমার : বর্ণবিরোধী আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠস্বর

তাসলিমা নীলু

বিবিধ

দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য, সামাজিক অবিচার ও মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে যার কলম ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার, তিনি নাদিন গর্ডিমার। ঔপন্যাসিক ও

2026-11-04T11:41:54+00:00
2026-11-04T11:41:54+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
বিবিধ
নাদিন গর্ডিমার : বর্ণবিরোধী আন্দোলনের সাহসী কণ্ঠস্বর
তাসলিমা নীলু
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ১১:৪১ এএম 
গ্রাফিক সময়ের আলো
দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য, সামাজিক অবিচার ও মানবিক সংকটের বিরুদ্ধে যার কলম ছিল প্রতিবাদের শক্তিশালী হাতিয়ার, তিনি নাদিন গর্ডিমার। ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার হিসেবে বিশ্বসাহিত্যে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করেছিলেন এই লেখক। সাহিত্যের মাধ্যমে নিপীড়িত মানুষের অধিকার, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের কথা তুলে ধরে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের এক সাহসী কণ্ঠস্বর।

দক্ষিণ আফ্রিকার তৎকালীন ট্রান্সভাল প্রদেশের (বর্তমানে গৌতেং) স্প্রিংসে ১৯২৩ সালের ২০ নভেম্বর এক শ্বেতাঙ্গ মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নাদিন গর্ডিমারের। মাত্র ৯ বছর বয়সে লেখালেখি শুরু করেন। ১৫ বছর বয়সে একটি সাময়িকীতে প্রকাশিত হয় তার প্রথম গল্প। শৈশবের এই সাহিত্যচর্চাই পরবর্তী সময়ে তাকে বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখকে পরিণত করে।

শ্বেতাঙ্গ পরিবারে বেড়ে উঠলেও দক্ষিণ আফ্রিকার সমাজব্যবস্থার বৈষম্য তাকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলেছিল। বিশেষ করে দেশটির বর্ণবৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় নীতি ও জাতিগত বিভাজন তার মনে প্রতিবাদের জন্ম দেয়। তিনি উপলব্ধি করেন, সমাজের একটি বড় অংশের মানুষ কেবল গায়ের রঙের কারণে অধিকার ও মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এই বাস্তবতাই তার সাহিত্যচিন্তার প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে। উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র এক বছর পড়াশোনা করেছিলেন গর্ডিমার। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সীমাবদ্ধতা তার জ্ঞানচর্চায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। নিজের পাঠাভ্যাস ও জীবন-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন সমৃদ্ধ সাহিত্যিক দৃষ্টিভঙ্গি।

১৯৪৯ সালে প্রকাশিত হয় তার প্রথম বই ‘ফেস টু ফেস’। এটি ছিল ছোটগল্পের সংকলন। ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় প্রথম উপন্যাস ‘দ্য লাইয়িং ডেইজ’। তার লেখার ভাষা ছিল সংযত, স্বচ্ছ ও বাস্তবধর্মী। আবেগের অতিরঞ্জন ছাড়াই মানুষের মনস্তত্ত্ব ও সমাজের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরতে পারতেন তিনি।

১৯৭৪ সালে তার উপন্যাস ‘দ্য কনজারভেশনিস্ট’ যৌথভাবে বুকার পুরস্কার লাভ করে। পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত হয় বার্গার্স ডটার, জুলাইস পিপল, এ স্পোর্ট অব নেচার, মাই সানস স্টোরি ও দ্য হাউস গানের মতো উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। এসব রচনায় বর্ণবৈষম্যের পাশাপাশি রাজনৈতিক পরিবর্তন, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সম্পর্কের টানাপোড়েন ও সামাজিক দায়িত্ববোধের বিষয় উঠে এসেছে।

পরিবেশগত সংকট নিয়েও তার ছিল গভীর আগ্রহ। ২০০৫ সালে প্রকাশিত ‘গেট আ লাইফ’ উপন্যাসে পরিবেশবিজ্ঞানী এক ব্যক্তির জীবনসংকটের মধ্য দিয়ে পরিবেশ ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক তুলে ধরেন। তার শেষ উপন্যাস ‘নো টাইম লাইক দ্য প্রেজেন্ট’ প্রকাশিত হয় ২০১২ সালে। এতে বর্ণবৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের অভিজ্ঞতা পেরিয়ে নতুন দক্ষিণ আফ্রিকার বাস্তবতা ও সংকটের চিত্র ফুটে উঠেছে।

১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি। এ ছাড়া ২০০৭ সালে ফ্রান্সের সম্মানজনক রাষ্ট্রীয় পদক ‘লেজিয়ঁ দ’অনর’ লাভ করেন তিনি। নাদিন গর্ডিমার ২০১৪ সালের ১৩ জুলাই জোহানেসবার্গে ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।

নাদিন গর্ডিমারের জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিবাদের জন্য সবসময় রাজপথে দাঁড়াতে হয় না। কখনো কখনো একটি কলমও হয়ে উঠতে পারে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শক্তিশালী অস্ত্র। নিজের সামাজিক অবস্থান ও পরিচয়ের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে তিনি সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই সত্য তাকে শুধু একজন নোবেলজয়ী নয়, মানবিক মূল্যবোধের এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/আতা
  বিষয়:   নাদিন গর্ডিমার  বর্ণ  বর্ণবিরোধী  আন্দোলন  সাহসী  কণ্ঠস্বর  সময়ে আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
বিবিধ- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: