ছবি : সংগৃহীত সন্তান বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মধ্যে তৈরি হয় নিজস্ব পছন্দ-অপছন্দ ও স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা। কোন পোশাক পরবে, কোথায় ঘুরতে যাবে কিংবা কোন খেলনাটি কিনবে—এসব বিষয়ে সে নিজের মত প্রকাশ করতে শেখে। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে মা-বাবার পরামর্শও চায়। মজার বিষয় হলো, পরামর্শ চাইলেও অনেক সময় তা গ্রহণ করে না। এতে মা-বাবা কিছুটা বিরক্ত বা বিভ্রান্ত হতে পারেন। মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেবে, তাহলে মতামত জানতে চাওয়ার দরকার কী?
ধরা যাক, কোনো অনুষ্ঠানে যাওয়ার জন্য পোশাক বেছে নিতে মায়ের সাহায্য চাইল ছোট্ট রাফা। মা দুটি পোশাকের মধ্যে একটি দেখিয়ে দিলেন। কিন্তু রাফার পছন্দ হলো না। মা আরেকটি পোশাক দেখালেন, সেটিও তার মনঃপূত হলো না। অথচ কিছুক্ষণ পর দেখা গেল, রাফা নিজেই প্রথম দেখানো পোশাকটি পরে তৈরি হচ্ছে। এমন অভিজ্ঞতা অনেক মা-বাবারই আছে।
শিশুর এই আচরণকে সব সময় জেদ বা মা-বাবার কথা অমান্য করার প্রবণতা হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বরং এর মধ্য দিয়ে সে নিজের পছন্দ বুঝতে এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
অনেক সময় শিশু নিজের চাওয়াটা ঠিকমতো বুঝতে পারে না। অন্য কারও মতামত শোনার পর নিজের পছন্দের বিষয়টি তার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। যেমন, বিকেলে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার পরিকল্পনা করতে গিয়ে সন্তান মা-বাবার কাছে জানতে চাইল, কোথায় যাওয়া যায়। তারা কাছের কোনো পার্কের কথা বললেন। কিন্তু সন্তান জানাল, সেখানে যেতে তার ইচ্ছা করছে না।
এ ক্ষেত্রে সে হয়তো শুরু থেকেই পার্কে যেতে চায়নি, কিন্তু নিজের পছন্দের জায়গাটিও ঠিক করতে পারেনি। মা-বাবার প্রস্তাব শুনে সে বুঝতে পারল, আসলে তার অন্য কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা। অর্থাৎ পরামর্শ চাওয়া মানেই সেই পরামর্শ মেনে নেওয়া নয়। কখনো কখনো অন্যের মতামত নিজের ভাবনাকে পরিষ্কার করতে সাহায্য করে।
সব সময় সিদ্ধান্ত নয়, চায় পাশে থাকা
কোনো বিষয়ে দ্বিধায় পড়লে শিশুরা মা-বাবার কাছে মতামত জানতে চায়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, তারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্বও মা-বাবার হাতে তুলে দিতে চায়। অনেক সময় তারা শুধু জানতে চায়, মা-বাবা বিষয়টি কীভাবে দেখছেন। সেই মতামত শুনে নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে আরও নিশ্চিত হতে চায়।
তাই সন্তান কোনো বিষয়ে পরামর্শ চাইলে সরাসরি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়ার আগে তার চাহিদা বোঝার চেষ্টা করুন। জানতে চাইতে পারেন, ‘তুমি কি চাও আমি তোমার জন্য একটি বেছে দিই, নাকি কোনটি আমার বেশি পছন্দ, শুধু সেটি বলব?’ এতে শিশু বুঝতে পারবে, মতামত নেওয়া আর সিদ্ধান্তের দায়িত্ব অন্যের হাতে তুলে দেওয়া এক বিষয় নয়।
জোরাজুরি বাড়াতে পারে দূরত্ব
সন্তান পরামর্শ চেয়ে পরে তা প্রত্যাখ্যান করলে মা-বাবার বিরক্ত হওয়া অস্বাভাবিক নয়। তখন তাঁরা হয়তো বলে বসেন, ‘তুমিই তো আমাকে বেছে দিতে বলেছ, এখন আমার কথাই শুনতে হবে।’ কিন্তু এমন প্রতিক্রিয়ায় ছোট একটি বিষয়ও মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে বিরোধ তৈরি করতে পারে।
শিশু তখন মনে করতে পারে, কোনো বিষয়ে সাহায্য চাইলে নিজের পছন্দের স্বাধীনতা হারাতে হবে। এতে ভবিষ্যতে সে আরও বেশি বিরোধিতা করতে পারে। এমনকি নিজের কোনো সমস্যা বা দ্বিধার কথা মা-বাবার সঙ্গে ভাগ করতেও আগ্রহ হারাতে পারে। তাই পরামর্শ না মানাকে ব্যক্তিগতভাবে না নিয়ে সন্তানের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
যেভাবে সামলাবেন পরিস্থিতি
এ ধরনের পরিস্থিতিতে মা-বাবার ধৈর্য ধরে সন্তানের কথা শোনা জরুরি। প্রথমেই বোঝার চেষ্টা করুন, সে আসলে কী ধরনের সাহায্য চাইছে। শুধু আপনার মতামত জানতে চায়, নাকি সত্যিই চায় আপনি তার হয়ে সিদ্ধান্ত নিন—এটি পরিষ্কার করে নিন।
একসঙ্গে অনেক বিকল্প সামনে না রেখে দু-তিনটি পছন্দের সুযোগ দিতে পারেন। এতে শিশুর সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে। আপনার পরামর্শ তার পছন্দ না হলে তর্কে না গিয়ে জানতে চান, কেন সেটি তার ভালো লাগেনি। তার মতামতকে গুরুত্ব দিন, এমনকি আপনার সঙ্গে একমত না হলেও।
তবে সব সিদ্ধান্তে শিশুকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়াও ঠিক নয়। নিরাপত্তা, সময় কিংবা পারিবারিক নিয়মের সঙ্গে কোনো বিষয় জড়িত থাকলে প্রয়োজনীয় সীমা নির্ধারণ করুন। কেন নির্দিষ্ট কিছু বিকল্পের মধ্যেই তাকে বেছে নিতে হবে, তা সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন।
সন্তান যদি প্রায় প্রতিটি বিষয়েই সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে, তাহলে তার কারণ বোঝার চেষ্টা করুন। ভুল করার ভয়, মা-বাবাকে হতাশ করার আশঙ্কা কিংবা নিজের পছন্দ সম্পর্কে অনিশ্চয়তা—বিভিন্ন কারণে এমনটা হতে পারে। তাকে ধমক না দিয়ে কথা বলুন, নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দিন।
মনে রাখতে হবে, সন্তান সব সময় মা-বাবার কাছ থেকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত চায় না। কখনো সে শুধু চায়, নিজের ভাবনা প্রকাশের সময় মা-বাবা মনোযোগ দিয়ে শুনুন, পাশে থাকুন। এই পার্থক্য বুঝতে পারলে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে অযথা বিরোধ কমবে। পাশাপাশি সন্তানও নিজের পছন্দকে চিনতে, সিদ্ধান্ত নিতে এবং সেই সিদ্ধান্তের প্রতি আত্মবিশ্বাসী হতে শিখবে।
সময়ের আলো/জেডি