ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে শব্দটির চেয়ে এর পেছনের আন্তরিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ছবি : সংগৃহীত কাউকে কষ্ট দিয়েছেন, ভুল করে কারও মন খারাপ করেছেন কিংবা ছোটখাটো কোনো ভুল হয়ে গেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক সময় মুখ থেকে বেরিয়ে আসে একটি শব্দ-‘সরি’। কখনো অনুশোচনা প্রকাশে, কখনো সম্পর্কের দূরত্ব কমাতে, আবার কখনো ভদ্রতা রক্ষায় শব্দটি ব্যবহার করি আমরা।
প্রতিদিনের কথাবার্তায় এত বেশি ব্যবহৃত হয় শব্দটি যে, কখন কতবার বলছি, তার হিসাবও রাখা হয় না। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছেন, কোথা থেকে এসেছে ‘সরি’ শব্দটি? কীভাবে এটি দুঃখ, অনুশোচনা ও ক্ষমা চাওয়ার পরিচিত ভাষা হয়ে উঠল? এর পেছনে রয়েছে কয়েক শতাব্দীর পুরোনো ইতিহাস।
‘সরি’ শব্দটির শিকড় খুঁজতে হলে ফিরে যেতে হবে প্রাচীন ইংরেজির যুগে। ভাষাবিদদের মতে, শব্দটির আদি রূপ ছিল ‘সারিজ’। প্রাচীন ইংরেজিতে এর অর্থ ছিল ব্যথিত, দুঃখিত, মানসিকভাবে কষ্ট পাওয়া কিংবা গভীর শোকে থাকা।
অর্থাৎ, শুরুতে কাউকে ক্ষমা চাওয়ার জন্য শব্দটি ব্যবহৃত হতো না। বরং নিজের মনের কষ্ট, বেদনা কিংবা দুঃখের অনুভূতি প্রকাশ করতেই এর ব্যবহার ছিল।
অক্সফোর্ড ডিকশনারির তথ্য অনুযায়ী, ‘সারিজ’ শব্দটির উৎস পশ্চিম জার্মানিক ভাষাগোষ্ঠীর একটি শব্দমূল। এর সঙ্গে ইংরেজি ‘সোর’ শব্দের সম্পর্ক রয়েছে। ‘সোর’ বলতে ব্যথা, যন্ত্রণা কিংবা ক্ষত বোঝায়। সেই সূত্রে ‘সরি’ শব্দের প্রাথমিক অর্থ দাঁড়ায় যন্ত্রণাকাতর বা দুঃখে ভারাক্রান্ত।
শব্দটির বানান ও উচ্চারণের বিবর্তনে ‘সরো’ শব্দেরও প্রভাব রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। যদিও ‘সরি’ ও ‘সরো’ দেখতে কাছাকাছি হলেও তাদের ব্যুৎপত্তিগত উৎস এক নয়।
‘সরি’ শব্দটির অর্থ সময়ের সঙ্গে বদলেছে। প্রথম দিকে এটি নিজের দুঃখ বা মানসিক কষ্ট বোঝাতে ব্যবহৃত হলেও ধীরে ধীরে অনুশোচনা ও অপরাধবোধ প্রকাশের অর্থ যুক্ত হয়।
ভাষার ইতিহাস অনুযায়ী, দ্বাদশ শতকের দিকে শব্দটি নিজের কোনো কাজের জন্য অনুতপ্ত হওয়া কিংবা অপরাধবোধ প্রকাশের অর্থেও ব্যবহৃত হতে শুরু করে। অর্থাৎ, কেউ ভুল করেছেন এবং সেই ভুলের কারণে তার মনে অনুশোচনা তৈরি হয়েছে- এমন পরিস্থিতিতেও শব্দটি জায়গা করে নেয়।
পরবর্তী সময়ে এর অর্থ আরও বিস্তৃত হয়। নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার পাশাপাশি অন্যের দুঃখ-কষ্টে সমবেদনা প্রকাশের মাধ্যম হয়ে ওঠে ‘সরি’।
তবে বর্তমানে আমরা যেভাবে শুধু ‘সরি’ বলে ক্ষমা চাই, সেই স্বতন্ত্র ব্যবহারের প্রচলন আরও পরে। অনলাইন ব্যুৎপত্তি অভিধান ইটিমনলাইন-এর তথ্য অনুযায়ী, ‘আই অ্যাম সরি’ বাক্যাংশের সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে শুধু ‘সরি’ বলে ক্ষমা চাওয়ার ব্যবহার ১৮৩৪ সালের দিকে দেখা যায়।
বর্তমানে ‘সরি’ শব্দের ব্যবহার কেবল ক্ষমা চাওয়ার মধ্যে আটকে নেই। পরিস্থিতি অনুযায়ী এর অর্থ ও প্রয়োগ বদলে যায়। যেমন, কারও প্রিয়জন মারা গেলে আমরা বলি, ‘আই অ্যাম সরি ফর ইউর লস’। এখানে নিজের কোনো ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া হয় না। বরং শোকাহত ব্যক্তির প্রতি সমবেদনা জানানো হয়।
আবার কারও কথা বুঝতে না পারলে ‘সরি’ বলে তার কথাটি পুনরায় জানতে চাওয়া হয়। কথোপকথনে ভুল হলে তা সংশোধন করতেও শব্দটি ব্যবহার করা হয়। এমনকি কোনো কিছুর অবস্থা খুব খারাপ বোঝাতেও এর প্রয়োগ রয়েছে। যেমন, ‘সরি স্টেট’ বলতে শোচনীয় বা দুরবস্থাকে বোঝায়।
এভাবেই কয়েক শতাব্দীর ব্যবধানে শব্দটি অনুশোচনা প্রকাশের গণ্ডি পেরিয়ে সমবেদনা, ভদ্রতা ও দৈনন্দিন কথোপকথনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।
কিন্তু শুধু মুখে ‘সরি’ বললেই কী কারও কাছে ক্ষমা চাওয়া সম্পূর্ণ হয়?
আসলে ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে শব্দটির চেয়ে এর পেছনের আন্তরিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ভুল করার পর শুধু পরিস্থিতি সামাল দিতে ‘সরি’ বললে তা অনেক সময় অর্থহীন হয়ে পড়ে। অন্যদিকে নিজের ভুল স্বীকার করা, তার দায় নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ভুল না করার চেষ্টা আন্তরিক ক্ষমা চাওয়ার অংশ।
এ কারণেই ইংরেজিতে ‘আই অ্যাম সরি’ বলার পাশাপাশি ‘আই অ্যাপোলোজাইজ’ কিংবা ‘প্লিজ ফরগিফ মি’ বলার প্রচলন রয়েছে। পরিস্থিতি ও বক্তব্যের ধরন অনুযায়ী এসব বাক্যাংশের ব্যবহারেও পার্থক্য রয়েছে।
সূত্র : অক্সফোর্ড ডিকশনারি হিস্টোরি, ওয়ার্ল্ড হিস্টোরিক্যাল ডিকশনারি ও ইটিমনলাইন
সময়ের আলো/মহু