আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের বিখ্যাত থেরাপি ঘোড়া ‘ব্ল্যাক পার্ল’। মালিক ভিক্টোরিয়া নডিফ-নেটানেল এবং ব্ল্যাক পার্ল মিলে দীর্ঘ বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন
দুস্থ মানুষের মাঝে মানসিক প্রশান্তি ও আনন্দ বিলিয়ে দেয় ব্ল্যাক পার্ল। ছবি : সংগৃহীত
আমেরিকার ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্যের বিখ্যাত থেরাপি ঘোড়া ‘ব্ল্যাক পার্ল’। মালিক ভিক্টোরিয়া নডিফ-নেটানেল এবং ব্ল্যাক পার্ল মিলে দীর্ঘ বছর ধরে ক্যালিফোর্নিয়ার বিভিন্ন হাসপাতাল, ট্রমা সেন্টার এবং দুস্থ মানুষের মাঝে মানসিক প্রশান্তি ও আনন্দ বিলিয়ে আসছেন। একসময় যে ঘোড়া ছিল কেবলই আদরের পোষা প্রাণী, কে জানত একদিন সে হয়ে উঠবে অসংখ্য মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর সঙ্গী!
ঘোড়া খুব পছন্দ করতেন ব্ল্যাক পার্লের মালিক। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ঘোড়সওয়ারির প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন প্রতিযোগিতায়ও। অবসর নেওয়ার পর দক্ষিণ ক্যালিফোর্নিয়ার বাড়িতে সঙ্গী হিসেবে একটি ছোট জাতের ঘোড়া রাখার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। সেই ভাবনা থেকেই ২০০৮ সালে ক্যালিফোর্নিয়ার সলভ্যাংয়ের ‘কুইকসিলভার র্যাঞ্চ’ থেকে ৬ মাস বয়সী ব্ল্যাক পার্লকে কিনে আনেন।
শুরু থেকেই ঘোড়াটি ছিল বেশ চঞ্চল ও আদুরে। কখনো ঝড়ের গতিতে চারপাশে ছুটে বেড়াত, আবার কিছুক্ষণ পরই ফিরে এসে মালিকের গায়ে গা ঘেঁষে আদর নিত। তার এমন মিষ্টি স্বভাব অল্প দিনেই মালিকের মন জয় করে নেয়। তবে তখনো কেউ জানতেন না, এই ছোট্ট ঘোড়াই একসময় তার জীবনের লক্ষ্য বদলে দেবে।
শুরুতে শুধুমাত্র আনন্দের জন্যই ব্ল্যাক পার্লকে নানা কৌশল শেখানো শুরু করেন মালিক। আশ্চর্যজনকভাবে ঘোড়াটি খুব দ্রুত সেসব শিখে ফেলতে থাকে। একসময় তার মনে হয়, ব্ল্যাক পার্লের এই বিশেষ গুণ ও মানুষের সঙ্গে মিশতে পারার স্বভাব কাজে লাগিয়ে অন্যদেরও আনন্দ দেওয়া সম্ভব।
সেই ভাবনা থেকেই গড়ে ওঠে দাতব্য সংস্থা ‘মিনি থেরাপি হর্সেস’। ব্ল্যাক পার্লের প্রাণবন্ত ও মিশুক স্বভাবই এ উদ্যোগের প্রধান অনুপ্রেরণা। এখন সংস্থাটির কার্যক্রমে ব্ল্যাক পার্লের পাশাপাশি রয়েছে আরও ৮টি ছোট থেরাপি ঘোড়া।
এই ঘোড়াগুলোকে নিয়ে তারা লস অ্যাঞ্জেলেসের একটি ভেটেরান হাসপাতালে যান। বিশেষ করে হাসপাতালের লকডাউন সাইকিয়াট্রিক ইউনিটে চিকিৎসাধীন প্রবীণ সেনাদের সঙ্গে সময় কাটায় ঘোড়াগুলো। এসব রোগীর অনেকেই যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে সৃষ্ট মানসিক আঘাত, মস্তিষ্কে গুরুতর আঘাত কিংবা মাদকাসক্তির সমস্যায় ভুগছেন। তাদের অনেকে আবার গৃহহীনও।
দীর্ঘদিনের মানসিক চাপ, একাকিত্ব ও বিচ্ছিন্নতার মধ্যে থাকা এসব মানুষের কাছে ছোট্ট ঘোড়াগুলোর সান্নিধ্য হয়ে ওঠে আনন্দের উপলক্ষ। তারা ঘোড়াগুলোকে স্পর্শ করেন, আদর করেন, জড়িয়ে ধরেন। প্রাণীগুলোর সঙ্গে এমন কিছু সময় কাটানো তাদের মানসিক স্বস্তি পেতে এবং একাকিত্বের অনুভূতি কমাতে সাহায্য করে।
ব্ল্যাক পার্ল। ছবি : সংগৃহীত
শুধু প্রবীণ সেনারাই নন, বিভিন্ন হাসপাতালের শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের কাছেও পৌঁছে যায় ব্ল্যাক পার্ল ও তার সঙ্গীরা। দীর্ঘদিন বাড়ির বাইরে চিকিৎসাধীন থাকা রোগীদের জন্য এই ছোট ঘোড়াগুলোর উপস্থিতি হয়ে ওঠে বিশেষ আনন্দের মুহূর্ত।
দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিশুদেরও ঘোড়াগুলোর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। তাদের হাত ধরে ঘোড়ার শরীর স্পর্শ করতে সাহায্য করেন সংস্থার সদস্যরা। শিশুরা ঘোড়ার গায়ের লোম ব্রাশ করে। প্রাণীটির শরীরের স্পর্শ তাদের মনে আনন্দ তৈরি করে।
হুইলচেয়ারে থাকা রোগীদের পাশেও হেঁটে চলে ব্ল্যাক পার্ল। রোগীরা তার লাগাম ধরে রাখতে পারেন। কারও কারও বাড়িতে পোষা প্রাণী রয়েছে, কিন্তু দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকায় তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়। সেই শূন্যতা কিছুটা হলেও পূরণ করে ব্ল্যাক পার্লের সান্নিধ্য। তাকে জড়িয়ে ধরে তারা যেন ফিরে পান পরিচিত কোনো সঙ্গীর উষ্ণতা।
৮টি ছোট থেরাপি ঘোড়ার মধ্যে ব্ল্যাক পার্লের স্বভাব সবচেয়ে বেশি নজরকাড়া। মানুষের ইতিবাচক সাড়া ও আনন্দ তাকে আরও উৎসাহিত করে। নিজের শেখা নানা কসরত দেখিয়ে মানুষকে আনন্দ দিতে সে বেশ পছন্দ করে।
তার প্রতিভার তালিকায় রয়েছে বেশ কিছু মজার কৌশল। কীবোর্ড বাজানোয় সে বিশেষভাবে পারদর্শী। ছোট্ট মুখ দিয়ে কীবোর্ডের চাবির ওপর ঘষে ঘষে সুর তোলে। শুধু তা-ই নয়, পেছনের দুই পায়ে ভর দিয়ে দাঁড়াতে ও হাঁটতে পারে। খুর দিয়ে হাই ফাইভ দেয়, হাসির ভঙ্গি করে, মাথা নেড়ে ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বোঝায়। আবার সামনের পা উঁচু করে গর্বিত ভঙ্গিতে হাঁটতেও পারে।
এসব কসরত দেখে মানুষ যেমন আনন্দ পান, তেমনি ব্ল্যাক পার্লও মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসায় উচ্ছ্বসিত হয়। তার উপস্থিতি রোগীদের কাছে চিকিৎসার পরিবেশের বাইরে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তৈরি করে।
ব্ল্যাক পার্লকে ঘিরে এই উদ্যোগ শুধু অন্যদের জীবনেই আনন্দ আনেনি, বদলে দিয়েছে তার মালিকের জীবনও। ঘোড়াটির সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে তার। অন্যদের পাশে দাঁড়ানোর যে স্বপ্ন তিনি দেখেছিলেন, ব্ল্যাক পার্ল সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথ দেখিয়েছে।