লাল শাপলার রাজ্যে মুগ্ধতার জোয়ার

জাকির হোসেন, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি)

ফিচার

শিল্পীর রংতুলিতে আঁকা ক্যানভাসের মতো প্রকৃতির কোলে যখন লাল শাপলা ফোটে, তখন চারপাশ এক জাদুকরি মুগ্ধতায় ভরে ওঠে। ভোরের প্রথম

2026-11-04T09:13:32+00:00
2026-11-04T09:42:00+00:00
 
  বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬,
২০ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ৪ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
হাজাছড়া বিল
লাল শাপলার রাজ্যে মুগ্ধতার জোয়ার
প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু
জাকির হোসেন, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি)
প্রকাশ: বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬, ৯:১৩ এএম  আপডেট: ০৪.১১.২০২৬ ৯:৪২ এএম
খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় গড়ে উঠেছে এক অপরূপ লাল শাপলার রাজ্য। ছবি : সময়ের আলো
শিল্পীর রংতুলিতে আঁকা ক্যানভাসের মতো প্রকৃতির কোলে যখন লাল শাপলা ফোটে, তখন চারপাশ এক জাদুকরি মুগ্ধতায় ভরে ওঠে। ভোরের প্রথম প্রহরে সূর্যের সোনালি আলো যখন শাপলার পাতার ওপর জমে থাকা শিশিরবিন্দুর ওপর পড়ে, তখন কণাগুলো মুক্তার মতো জ্বলে ওঠে এবং ফুলের সৌন্দর্য দ্বিগুণ করে দেয়।

উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুযায়ী, লাল শাপলার বৈজ্ঞানিক নাম 'নিম্ফিয়া রুব্রাল'। শাপলা পরিবারের এই জলজ উদ্ভিদটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে থাকে।


খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলায় এমনি এক অপরূপ লাল শাপলার রাজ্য গড়ে উঠেছে। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে মেরুং বাজার এবং সেখান থেকে আধা কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত এই 'হাজাছড়া শাপলা বিল'। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘ছোট হাজাছড়া ড্যাপা’ নামে পরিচিত। লাল শাপলার এই নজরকাড়া সৌন্দর্য এখন প্রকৃতিপ্রেমীদের আকর্ষণের মূল কেন্দ্রবিন্দু। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো শিল্পীর নিপুণ হাতে তৈরি লাল-সবুজের এক নকশি কাঁথা বিছিয়ে রাখা হয়েছে। এই অপরূপ সৌন্দর্যে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দাসহ দূর-দূরান্ত থেকে আসা নানা বয়সের মানুষ।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, প্রায় ১০ একর আয়তনের এই বিলের ৫ একর জায়গাজুড়ে রয়েছে লাল শাপলার বিস্তার। প্রতি বছর সেপ্টেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত এই বিলে ফুল ফোটে। যদিও গত প্রায় ২০ বছর ধরে এখানে শাপলা ফুল ফুটছে, তবে গত দুই বছর ধরে বিলটি দর্শনার্থীদের কাছে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। চলতি মৌসুমে এখানে ঘুরতে আসা মানুষের সংখ্যা আগের তুলনায় দ্বিগুণ হয়েছে।

জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিন দর্শনার্থীরা হাজাছড়া শাপলা বিলে ছুটে আসছেন। কেউ মনের আনন্দে ছবি তুলছেন, কেউ আবার বানাচ্ছেন রিলস। কেউ বা আবার বিলের হিমশীতল পানিতে হাত-পা ডুবিয়ে পানি ছিটিয়ে উল্লাসে মেতে উঠছেন। প্রকৃতির এমন স্নিগ্ধ ও অপার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে দর্শনার্থীরা হারিয়ে যাচ্ছেন লাল শাপলার রাজ্যে।


বিলটিতে সাঁতার কাটতে থাকা রাজহাঁস, চারপাশের সবুজ প্রকৃতি এবং দুরন্ত বালকদের গোসল করতে করতে শাপলা তুলে গ্রামীণ মেঠোপথ ধরে বাড়ি ফেরার দৃশ্য যেকোনো মানুষের মন কেড়ে নেয়। প্রকৃতির এই অনাবিল রূপ যেন গ্রামীণ জীবনের এক চিরচেনা ও নিখাদ ছবি ফুটিয়ে তোলে।

শাপলা বিলে ঘুরতে আসা কলেজছাত্রী হালিমা আক্তার সোনিয়া নিজের ভালো লাগার কথা জানিয়ে বলেন, বোন ও বান্ধবীদের নিয়ে এই শাপলা বিলে ঘুরতে আসার অনুভূতি সত্যিই অসাধারণ। নৌকায় চড়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, চারপাশে ফুটে থাকা শাপলা ফুল আর শান্ত জলরাশি মনকে ভরিয়ে দিয়েছে। ঘোরার পাশাপাশি এই সুন্দর মুহূর্তগুলোকে ধরে রাখতে অনেক ছবি ও ভিডিও ধারণ করেছি। পুরো সময়টা আমাদের হাসি, আনন্দ আর গল্পে কেটেছে। শাপলা বিলের এই স্মৃতি চিরকাল মনে রাখার মতো।

তবে শুধু সৌন্দর্য উপভোগ করাই নয়, স্থানীয়দের জীবিকার সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই হাজাছড়া শাপলা বিল। এখানকার শাপলা অনেকেরই প্রিয় একটি সবজি। অনেকেই বিল থেকে শাপলা তুলে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করেন, আবার অনেকে নিজেদের পরিবারের খাদ্যের চাহিদাও মেটান। পাশাপাশি অনেকে বিল থেকে মাছও ধরে থাকেন। বিলে কমবেশি সারা বছরই পানি থাকে, তবে শুকনো মৌসুমে বিলের কিনারার পানি কমে গেলে সেখানে স্থানীয় কৃষকেরা ধান চাষ করেন।


স্থানীয় যুবক চাঁদমান আলী বলেন, আমরা প্রায়ই বিলের পাশে এসে বসে থাকি এবং এখানকার লাল শাপলা ও বিস্তীর্ণ জলরাশি দেখে মুগ্ধ হই। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখন এখানে ঘুরতে আসে। যেমন গতকালই মাইসছড়ি থেকে প্রায় ৪০ জন পর্যটক এসেছিলেন। তারা ছবি তুলেছেন, ভিডিও করেছেন এবং শাপলা বিলের সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন। এসব দেখে আমাদেরও খুব ভালো লাগে।

তিনি আরও বলেন, শাপলার আসল সৌন্দর্য দেখতে হলে সকালবেলাতেই আসতে হবে, কারণ বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ফুলগুলো সাধারণত মুদে যায়।

উপজেলা যুবদলের সদস্যসচিব জাহাঙ্গীর আলম দুলাল (দুলাল মেম্বার) বলেন, এই বিলটি আমাদের নিজস্ব। এখানে স্থানীয়দের পাশাপাশি জেলা ও জেলার বাইরের অনেক মানুষ বেড়াতে আসেন। তাদের ভিড় দেখে আমাদের বেশ ভালো লাগে।

তিনি আরও বলেন, যারা এখানে ঘুরতে আসেন, তাদের সুবিধার জন্য পাড়েই নৌকা বাঁধা থাকে। দর্শনার্থীরা সেই নৌকায় চড়ে অনায়াসে বিল ঘুরে দেখতে পারেন, এর জন্য কারও কোনো বাধা নেই। এমনকি কেউ কেউ শাপলা তুলে সঙ্গে করেও নিয়ে যান।


দর্শনার্থীদের নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান, এই শাপলা বিলে একটি ভাসমান রেস্তোরাঁ করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের। পাশাপাশি দর্শনার্থীরা যেন আরও স্বাচ্ছন্দ্যে পুরো বিল ঘুরে দেখতে পারেন, সেজন্য একটি স্পিডবোট নামানোর কথাও ভাবা হচ্ছে।

দীঘিনালা হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যানতত্ত্ববিদ মো. আবুল খায়ের জানান, লাল শাপলা মূলত শাপলা পরিবারের একটি জলজ উদ্ভিদ। এই ফুল সাধারণত রাতেই ফোটে এবং রোদের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এর পাপড়িগুলো আস্তে আস্তে বন্ধ হতে শুরু করে। সাধারণত বর্ষা ও শরৎকালে এই ফুল বেশি ফুটলেও ক্ষেত্রবিশেষে অন্য সময়েও দেখা মিলতে পারে। একটি ফুলের সৌন্দর্য সাধারণত কয়েক দিন স্থায়ী হয়। জলাশয়ের পরিবেশ, পানির গভীরতা এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ওপরই শাপলার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফুল ফোটা পুরোপুরি নির্ভর করে।

তিনি আরও বলেন, হাজাছড়া শাপলা বিলের মতো প্রাকৃতিক জলাশয়ে লাল শাপলার এই বিপুল বিস্তার এলাকায় নতুন পর্যটন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। যদি এখানে পরিকল্পিতভাবে পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা যায়, তবে তা যেমন দর্শনার্থীদের আরও বেশি আকৃষ্ট করবে, তেমনি স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। তবে পর্যটন বিকাশের ক্ষেত্রে বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং শাপলার স্বাভাবিক বিস্তার যেন কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর রাখা জরুরি।

সময়ের আলো/আতা
  বিষয়:   শিল্পী  রংতুলি  আঁকা  ক্যানভাস  প্রকৃতি  লাল শাপলা  জাদুকরি মুগ্ধতা  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: