শুধু ‘সরি’ বললেই কি ভাঙা মন জোড়া লাগে

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

কারও মনে কষ্ট দিয়েছেন? হয়তো ভুল বুঝেছেন, কথা দিয়ে কথা রাখেননি কিংবা রাগের মাথায় এমন কিছু বলেছেন, যা কাছের মানুষটিকে

2026-11-03T20:44:26+00:00
2026-11-03T22:13:42+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
শুধু ‘সরি’ বললেই কি ভাঙা মন জোড়া লাগে
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ৮:৪৪ পিএম  আপডেট: ০৩.১১.২০২৬ ১০:১৩ পিএম
আসলে মুখে দুঃখ প্রকাশ করলেই সব কষ্ট মুছে যায় না। সংগৃহীত ছবি
কারও মনে কষ্ট দিয়েছেন? হয়তো ভুল বুঝেছেন, কথা দিয়ে কথা রাখেননি কিংবা রাগের মাথায় এমন কিছু বলেছেন, যা কাছের মানুষটিকে আঘাত করেছে। পরে বুঝতে পেরে বললেন, ‘সরি’। কিন্তু তাতেই কি সব অভিমান দূর হয়ে যায়? আগের মতো হয়ে যায় সম্পর্ক?

আসলে মুখে দুঃখ প্রকাশ করলেই সব কষ্ট মুছে যায় না। কখনো কখনো একটি ‘সরি’ বলার চেয়েও জরুরি হয়ে ওঠে কেন কষ্ট দিয়েছেন, তা বোঝা এবং ভুল শুধরে নেওয়া। সম্পর্কের ক্ষত সারাতে শুধু কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দিতে হয়। 

যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী মলি হাওয়েস তার ‘এ গুড অ্যাপোলজি: ফোর স্টেপস টু মেক থিংস রাইট’ বইয়ে আন্তরিকভাবে ক্ষমা চাওয়ার চারটি ধাপের কথা বলেছেন। তার মতে, এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে ভুলের কারণে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমানো এবং পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা যায়।

কেন ‘সরি’ বলাটা এত কঠিন?

নিজের ভুল স্বীকার করা সহজ নয়। অনেকেই মনে করেন, নিজের আচরণে অন্য কেউ কষ্ট পেলে হয়তো তিনি বিষয়টি ভুল বুঝেছেন। আবার কেউ নিজের ভালো মানুষ হওয়ার ধারণার সঙ্গে ভুল করার বিষয়টি মেলাতে পারেন না। ফলে ক্ষমা চাওয়ার বদলে আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু করেন।

কিন্তু সম্পর্ক ঠিক করতে চাইলে আগে বুঝতে হবে, নিজের আচরণে অন্য মানুষটির কেমন লেগেছে। মনোবিজ্ঞানী মলি হাওয়েসের পরামর্শ, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার জন্য রয়েছে চারটি ধাপ।

১. আগে শুনুন, তারপর বলুন ‘সরি’

কাউকে কষ্ট দেওয়ার পরপরই নিজের ব্যাখ্যা দিতে যাবেন না। বরং প্রথমে তার কথা মন দিয়ে শুনুন। আপনার কোন আচরণে তিনি কষ্ট পেয়েছেন, সেটি তাকে বলতে দিন।

এ সময় নিজের উদ্দেশ্য ভালো ছিল, আপনি আসলে তা বোঝাতে চাননি কিংবা তিনি ভুল বুঝেছেন— এসব যুক্তি দেখানোর দরকার নেই। কারণ, আপনার উদ্দেশ্য যা-ই থাকুক, আপনার আচরণে অন্য মানুষটি কষ্ট পেয়েছেন কি না, সেটিই আগে বোঝা জরুরি।

তাই মাঝখানে কথা না বলে তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতা শোনার চেষ্টা করুন। এতে সমস্যার আসল জায়গাটি বুঝতে সুবিধা হবে।

২. ভুলের দায় নিজের কাঁধে নিন

‘তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে সরি’— এ ধরনের কথা শুনতে ক্ষমা চাওয়ার মতো মনে হলেও এতে দায়টা অনেকটা অন্য ব্যক্তির অনুভূতির ওপর চলে যায়।

এর বদলে বলতে পারেন, ‘আমার আচরণে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, আমি দুঃখিত।’ এতে নিজের কাজের প্রভাব স্বীকার করা হয়।

মলি হাওয়েসের মতে, ক্ষমা চাওয়ার সময় আত্মপক্ষ সমর্থন না করে নিজের আচরণের দায় নেওয়া জরুরি। মনে রাখতে হবে, সব ভুল ইচ্ছা করে হয় না। কিন্তু অনিচ্ছাকৃতভাবে কাউকে কষ্ট দিলেও তার প্রভাবকে গুরুত্ব দিতে হবে।

৩. শুধু সরি নয়, ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করুন

কথায় ক্ষমা চাইলেন, কিন্তু ভুলের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, সেটি ঠিক করার কোনো চেষ্টা করলেন না—তাহলে ক্ষমা চাওয়াটা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।

ধরুন, কাছের কারও গুরুত্বপূর্ণ একটি অনুষ্ঠান আপনার কারণে নষ্ট হয়েছে। শুধু দুঃখ প্রকাশ না করে আবার সুন্দর কোনো আয়োজনের চেষ্টা করতে পারেন। কাউকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে না পারলে নতুন করে সেই কাজটি ঠিকভাবে করার উদ্যোগ নিতে পারেন।

সব ক্ষতি টাকা বা উপহার দিয়ে পুষিয়ে দেওয়া যায় না। অনেক সময় ছোট্ট একটি আন্তরিক উদ্যোগও সম্পর্কের বরফ গলাতে সাহায্য করে।

৪. একই ভুল আর নয়, কাজে দেখান পরিবর্তন

‘আর কখনো এমন হবে না’— এ কথা অনেকেই বলেন। কিন্তু কয়েক দিন পর একই ভুল আবার করলে সেই প্রতিশ্রুতির আর মূল্য থাকে না।

তাই শুধু কথা নয়, আচরণেও পরিবর্তন আনতে হবে। সময়মতো দায়িত্ব পালন করতে না পারলে সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনুন। বারবার কথা দিয়ে কথা রাখতে না পারলে অযথা প্রতিশ্রুতি দেওয়া বন্ধ করুন।

মলি হাওয়েসের মতে, যে অভ্যাস বা পরিস্থিতির কারণে ভুলটি হয়েছে, সেটি বদলানোর বাস্তব উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলেই অন্য ব্যক্তি বুঝতে পারবেন, আপনি সত্যিই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছেন।


ভাঙা সম্পর্ক কি আগের চেয়ে সুন্দর হতে পারে?

জাপানের ঐতিহ্যবাহী শিল্পকৌশল ‘কিনৎসুকুরোই’-তে ভাঙা মাটির পাত্রের ফাটল সোনালি উপাদান দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। এতে ভাঙনের দাগ লুকানো হয় না; বরং সেটিই পাত্রের সৌন্দর্যের অংশ হয়ে ওঠে।

সম্পর্কের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অনেকটা এমন। কোনো ভুল বা আঘাতের স্মৃতি হয়তো পুরোপুরি মুছে যাবে না। তবে দুজন মানুষ যদি খোলামেলা কথা বলেন, ভুলের দায় স্বীকার করেন এবং সম্পর্ক ঠিক করতে চেষ্টা করেন, তাহলে নতুন করে বোঝাপড়া তৈরি হতে পারে।

ক্ষমা চাইলেই সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করতে হবে?

একেবারেই না। কেউ ক্ষমা চাইলেই তাকে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা করে দিতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কষ্ট পাওয়া ব্যক্তিরও নিজের অনুভূতি বোঝার এবং সময় নেওয়ার অধিকার রয়েছে।

কষ্ট গভীর হলে তা কাটিয়ে উঠতে সময় লাগতে পারে। তাই ক্ষমা চাওয়ার পর অন্য ব্যক্তিকে চাপ দেওয়া ঠিক নয়। তিনি কখন কথা বলতে চান, সেটিও সম্মান করতে হবে।

আবার কেউ যদি স্পষ্টভাবে যোগাযোগ না করতে বলেন, তাহলে তার সেই সিদ্ধান্তও মেনে নিতে হবে।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, ‘সরি’ একটি শব্দ মাত্র। কিন্তু আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা হলো নিজের ভুল বোঝা, দায় নেওয়া, ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার চেষ্টা এবং আচরণে পরিবর্তন আনা। সম্পর্ক জোড়া লাগাতে তাই শুধু মুখের কথা নয়, কাজেও আন্তরিকতা দেখাতে হয়।


সময়ের আলো/ইউএমএইচ

  বিষয়:   সরি  ভাঙা মন 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: