সুন্দরবন : বৃষ্টিভেজা পশুর নদী থেকে জ্যোৎস্নামাখা পিয়ালীর গল্প

প্রভা নাওয়ার

ফিচার

এই প্রথম সুন্দরবনে যাওয়া। ভ্রমণটা ছিল আমার একার। কিন্তু সেই ভ্রমণ রাঙিয়ে দিলো রিসোর্টে পরিচয় হওয়া ৭ জনের দল। যে

2026-11-03T18:23:59+00:00
2026-11-03T18:58:06+00:00
 
  মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,
১৯ কার্তিক ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬
ফিচার
সুন্দরবন : বৃষ্টিভেজা পশুর নদী থেকে জ্যোৎস্নামাখা পিয়ালীর গল্প
প্রভা নাওয়ার
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর, ২০২৬, ৬:২৩ পিএম  আপডেট: ০৩.১১.২০২৬ ৬:৫৮ পিএম
সুন্দরবন ভ্রমণ যেন অপার প্রশান্তি দেয়। গ্রাফিক : সময়ের আলো
এই প্রথম সুন্দরবনে যাওয়া। ভ্রমণটা ছিল আমার একার। কিন্তু সেই ভ্রমণ রাঙিয়ে দিলো রিসোর্টে পরিচয় হওয়া ৭ জনের দল। যে গল্প থেকে যেত ঢাংমারী নদীর সন্ধ্যা, জঙ্গলের গান কিংবা পিয়ালীর আলো-ছায়ার মায়াময় অবাধ বৃত্তে, সেখানে ওই সুন্দর মানুষগুলোর জন্য জমা হলো আরও খানিকটা রূপকথা।

আমার বাস ছিল সকাল সাড়ে সাতটায়। তল্পিতল্পা নিয়ে সায়েদাবাদ পৌঁছে গেলাম যথাসময়ে। বাস শহর ছাড়িয়ে, পদ্মা সেতুর সৌন্দর্য ছাড়িয়ে এগিয়ে যেতে লাগল। বাগেরহাট থেকে শুরু হলো বৃষ্টি। চারপাশে মাইলের পর মাইল মাছের ঘের। অনেক ঘেরের পাড়জুড়ে নারিকেল গাছের সারি। সেই ঘেরের জলে বৃষ্টির নাচন। দেখে মনে হচ্ছিল, এটা বাংলাদেশের কেরালা!

ঢাংমারী নদী থেকে দেখা পিয়ালী রিসোর্ট। ছবি : লেখক

ঢাংমারী নদী থেকে দেখা পিয়ালী রিসোর্ট। ছবি : লেখক


আমি মোংলা পর্যন্ত না গিয়ে লাউডোব ঘাটে নেমে গেলাম। মূল সড়ক থেকে ঘাটে হেঁটে যেতে ২-৩ মিনিট সময় লাগে। তাতেই বৃষ্টিতে ভিজে গেলাম আমি, আমার ব্যাগপত্র সব। বৃষ্টির জন্য নৌযান ছাড়তে খানিক দেরি হলো। যাত্রীছাউনিতে অপেক্ষা করলাম। একটু পর বৃষ্টি না থামলেও নৌযান ছাড়ল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে পশুর নদী পাড় হলাম। সে এক মায়াময় দৃশ্য, যেন বহুদিন পরও এই বৃষ্টিভেজা পশুর নদী পারাপারের স্মৃতি আমাকে মুগ্ধ করবে। স্থানীয় এক লোক আমাকে ব্যাগ বহন করে সহযোগিতা করলেন, তার সঙ্গে গল্প হলো, যেন সুন্দরবন অঞ্চলের সহজ মানুষ। ওপারে নেমে তাকে কৃতজ্ঞতাসমেত বিদায় জানালাম। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল রিসোর্ট থেকে পাঠানো একটি অটো। অটোতে চড়ে যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম। এক দেড় ঘণ্টা কখনো সরু পথ, কখনো ইট বিছানো ভাঙাচোরা পথ পেরিয়ে রিসোর্টের কাছাকাছি নামলাম। পথের সৌন্দর্য আমাকে মুগ্ধ করেছে খুব। পশুর নদী, বৃষ্টি, সবুজ ধানখেত, পাড়ে রাখা নৌকা, জলে নোঙর করা জাহাজ, কচুরিপানার ফুল- মুগ্ধ করার উপাদানের কোনো কার্পণ্য ছিল না প্রকৃতিতে। অটো থেকে নেমে আধা কিলোমিটার কর্দমাক্ত পথ পায়ে হেঁটে রিসোর্টে পৌঁছালাম। বৃষ্টি না হলে রিসোর্টের সামনেই নামতে পারতাম। যদিও একটু কষ্ট হয়েছে যেতে, তবে এটা ভাবছিলাম- সুন্দরবনের মানুষেরা কত কষ্ট করে দিনযাপন করে এখানে। তাছাড়া, এমন মুহূর্তরা যখন স্মৃতি হয়ে যায়, তা চারণ করার ভেতর অন্যরকম ভালোলাগা আছে।

পিয়ালী কালচারাল ইকো রিসোর্ট। ছবি : লেখক

পিয়ালী কালচারাল ইকো রিসোর্ট। ছবি : লেখক


রিসোর্টে পৌঁছে কিছুটা সময় নিয়ে ঢাংমারী নদীর জলে পা ও জুতো পরিষ্কার করলাম। ততক্ষণে গোলপাতার মুকুট দিয়ে আমাকে বরণ করা হয়েছে, দেওয়া হয়েছে মজার তেঁতুলের শরবত। ওহ হ্যাঁ, ঢাংমারী নদীর তীরে গড়ে ওঠা ঢাংমারী গ্রামের এক রিসোর্টে উঠেছি আমি। নাম ‘পিয়ালী কালচারাল ইকো রিসোর্ট’। গ্রামটি মূলত সুন্দরবনের একটি দ্বীপ। পিয়ালীতে দু ধরনের কটেজে থাকার সুযোগ রয়েছে- ওয়াটার হাউস ও ফরেস্ট হাউস। আমাকে দেওয়া হলো ওয়াটার হাউসের প্রথম কটেজটা। কটেজের ভেতরে ঢুকেই মুগ্ধ হয়ে গেলাম। চারজনের থাকার জন্য সুন্দর একটা রুম। তার সঙ্গে বড় ওয়াশরুম। ওমন প্রত্যন্ত অঞ্চলে আধুনিক ব্যবস্থা যতটা রাখা সম্ভব, সবই রাখা হয়েছে রিসোর্টটিতে। এত বড় রুমে আমি একা, যেন নিজের একটা গোটা রাজত্ব পেয়ে গেছি। ব্যাগ থেকে সবকিছু বের করে শুকাতে দিলাম, যেহেতু বৃষ্টি আমাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়েছিল। আরাম করে তেঁতুলের শরবতটা খেয়ে ফ্রেশ হয়ে নিলাম। ওদিকে দুপুরের খাবারের ডাক পড়ল।

মনোরম পরিবেশে দুপুরের খাবার। ছবি : লেখক

মনোরম পরিবেশে দুপুরের খাবার। ছবি : লেখক


পোশাক বদলে চলে গেলাম খাবার খেতে। খাওয়ার জায়গাটা একদম নদীর পাশে। দুপুরের খাবারে নানান পদ ছিল- কুমড়ো চচ্চরি, ছোট মাছ ভাজা, বেগুন ভর্তা, টেংরা মাছের তরকারি, ডাল ও ভাত। কোনটা রেখে কোনটা খাব। একটু একটু করে সবই খেলাম, যেন আফসোস না থাকে। সব খাবারই ভালো ছিল, বিশেষ করে নদীর তাজা মাছ ভাজাটা বেশ লেগেছে। আমি যখন খাচ্ছি, তখনই মোংলা থেকে রিসোর্টের একটা বোট এসে ভিড়ল ঘাটে। ঘাটটাও খাবারের স্থানের পাশেই। সাতজনের দলটি হৈ-হুল্লোড় করে এসে রিসোর্টের নির্জনতায় আবেশ ছড়াল। অবশ্য তখন দলে ছ’জন ছিল। আরেকজন সন্ধ্যার পর এসে যুক্ত হয়েছে। সে এসেছে আমার চেয়ে বেশি অ্যাডভেঞ্চার করে। সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকারে ধানখেতের আলপথ ধরে কাদামাটি মেখে এসে পৌঁছেছে অচেনা এই দ্বীপে।

ঢাংমারী নদীর বুকে সন্ধ্যা নামছে। ছবি : লেখক

ঢাংমারী নদীর বুকে সন্ধ্যা নামছে। ছবি : লেখক


দুপুরের খাবার শেষে শরীর ভাতঘুম কামনা করে। তাই আমিও চলে গেলাম রুমে। দীর্ঘ যাত্রার ধকলে প্রলেপ না দিলে কী হয়? বিশ্রাম নেওয়ার পর বিকেলে নতুন একটা ফুরফুরে পোশাক পরে বের হলাম। বিকেল ও সন্ধ্যে যাপন করা ছাড়া বিশেষ কোনো পরিকল্পনা নেই। ঢাংমারী নদীর তীরে পা দুলিয়ে বসলাম। কতক্ষণ যে বসে রইলাম, তার কোনো হিসেব নেই। সুন্দরবনে যে কী মায়া নিয়ে সন্ধ্যা নামে, না দেখলে পুরোপুরি অনুভব করা হয়ত অসম্ভব। আমার দীর্ঘদিনের অপেক্ষা সত্যি করে ঢাংমারী নদীর বুকে প্রত্যক্ষ সন্ধ্যা নামল। জঙ্গলের গান, পাখিদের ডানা ঝাঁপটানোর শব্দ, আমার কিছু খুচরো ব্যক্তিগত বিষাদ আর ওই রূপকথার সাতজনের দলের আনন্দের শব্দ নিয়ে এমন এক সন্ধ্যা নামল পিয়ালীতে, যা দীর্ঘজীবন মনে থেকে যাবে। 

বারবিকিউ। ছবি : লেখক

বারবিকিউ। ছবি : লেখক


আবার ফিরে গেলাম নিজের কটেজে। মেরুণ রঙের শাড়ি জড়ালাম গায়ে। কুমকুম দিয়ে বনজ বউ সাজলাম। নাকে পরলাম মারাঠি নথ। গলা ও কানে পিতলের গয়না। মাথায় গোলপাতার মুকুট। সব মিলিয়ে যেন জঙ্গলের কন্যা। ঢাংমারী নদীর তীরে কাঠের গুঁড়ির ওপর বেশ কিছু প্রদীপ ও মোমবাতি জ্বালানো হলো, মাঝখানে ছোট্ট একটা কেক, পেছনে গোলপাতার দুটো ডাল দিয়ে ‘সাধ্যের ভেতর সবটুকু সুখরে’ মতো সুন্দর একটা মঞ্চ সাজানো হলো। এ আয়োজনের কারণ আমার জন্মদিন। মেরুণরঙা আমি সেই আলোর কোলে বসলাম। ততক্ষণে দলটি সাতজনের হয়ে গেছে। তাদেরকে রিসোর্টের পক্ষ থেকে জন্মদিনের ছোট্ট আয়োজনে থাকার জন্য নিমন্ত্রণ জানানো হলো। বলা বাহুল্য, তারা ছিল বলেই সবকিছু আরও সুন্দর, আরও আনন্দমুখর হয়ে উঠল। কেক কাটা শেষে আবার একা হলাম। বসলাম নদীর কাছে।

রাতের খাবার। ছবি : লেখক

রাতের খাবার। ছবি : লেখক


সন্ধ্যা গাঢ় হতেই আকাশ ভরে গেল তারায় তারায়। শহরে এমন তারা দেখার সুযোগ হয় না। তাই কাঠের বেঞ্চিতে শুয়ে পড়লাম মনভরে তারা দেখব বলে। সুন্দর মুহূর্ত একা একা কতটা উপভোগ করা যায়, জানি না। তবে, অনুভব করা যায় গভীরভাবে। আমি তা-ই করলাম। সন্ধ্যার আবেশ ছাড়ছিল না কিছুতেই, তাই সেখান থেকে উঠতে ইচ্ছে করছিল না। ততক্ষণে বারবিকিউর আয়োজন শুরু হয়েছে। বারবিকিউ প্লেসের পাশেই হ্যামকে শুয়ে দোল খেলাম কিছুক্ষণ। ওহ, সন্ধ্যায় হ্যামকে শুয়েই নুডুলস খেয়েছিলাম, বলতে ভুলতে গেছি। তারপর ওই টিমের সঙ্গে যুক্ত হলাম আড্ডায়। দোতলায় কটেজের খোলা বারান্দায়, যেখান থেকে নদী ও রাতের উজাড় আকাশ দেখা যায়, সেখানে বসে গান ও গল্পের আসর জমল অনেকক্ষণ। ওই মুহূর্তটুকু যেন আমাকে খানিক জুড়ল, যেমন করে জাপানিরা কিন্টসুগি শিল্পে ভাঙা জিনিসে সোনা বা রূপার প্রলেপ লাগিয়ে জোড়া দেয়। রাতের খাবার ওই টিমের সঙ্গেই খেলাম। পরোটা, চিকেন, সবজি, সস, লেবু ও কোক। এছাড়া, প্রতি বেলার খাওয়া শেষে চা তো ছিলই।

উজাড় জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে পিয়ালী। ছবি : লেখক

উজাড় জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে পিয়ালী। ছবি : লেখক


খাওয়ার পর রুমে গিয়ে ফের পোশাক বদলে নিলাম। তখন প্রদোষকাল অতিক্রান্ত, কিন্তু ঘুম আসার জো নেই। আমি এমনিতেই কম ঘুমাই। তারওপর রাতে সুন্দরবনের ওই পরিবেশে বসে দুধ চা খাওয়ার লোভ থেকে বিরত রাখতে পারিনি নিজেকে। তাই ঘুম একেবারেই পালিয়েছে। কিছুক্ষণ বিছানায় এপাশ ওপাশ করে আবার বেরিয়ে আসলাম রুম থেকে। আকাশ আলো করে চাঁদ হাসছে। বিশেষ করে চাঁদ দেখতেই বের হয়েছিলাম। মনপ্রাণ জুড়িয়ে গেল চাঁদের রূপ দেখে। হালকা ঠান্ডা হাওয়া ও জ্যোৎস্নার মিতালীতে পিয়ালীর কাঠের পাটাতনে বসে থাকতে বেশ ভালো লাগছিল। ওই দলের কেউও ঘুমায়নি তখন। আমাকে দেখে আমার রুমের সামনে এলো সবাই। আবার খানিকক্ষণ আনন্দের খুচরো মুহূর্ত জমা হলো। তারপর শুভরাত জানিয়ে বিদায় নিলাম সবাই। 

গোলপাতার ফল। ছবি : লেখক

গোলপাতার ফল। ছবি : লেখক


ঘুম না এলেও রাত নির্বিঘ্নেই কাটল। সুন্দরবনের লোনা পানিতে মশা বাঁচতে পারে না সাধারণত। তাই সেখানে মশার উৎপাত খুব কম। সূর্যোদয় দেখব বলে বারকয়েক কটেজের দরজা খুলে বাইরে তাকালাম, কিন্তু সূর্যের দেখা নেই। সে আসলে ঠিক সময়েই নিজেকে জানান দিয়েছে, আমারই বরং উত্তেজনার বাহুল্যতায় তর সইছিল না। একসময় সূর্যের দেখা না পেলেও আলোর আভাস পেলাম। টিপটপ রেডি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ভোরের নরম আলোতে পুরো পিয়ালী জুড়ে হেঁটে বেড়ালাম। ঢাংমারী নদীর কাছে গিয়ে বসে থাকলাম। আস্তে আস্তে সূর্য উঁকি দিলো। রুমে ফিরে আজ আবারও শাড়ি পরলাম। শাড়ির রং সোনালি ও সমুদ্র। ততক্ষণে রিসোর্টের বেশ কয়েকজন উঠে গেছে। সকালের নাশতার আগে আমরা গোলপাতার ফল খেলাম। খেতে গাব ও তালের পীড়ের মিশ্র স্বাদ। বসে বসে গল্প শুনলাম স্থানীয়দের। কার দাদা চলে গেছে বাঘের পেটে, কে ফিরে এসেছে বাঘের করালগ্রাস থেকে এসব রোমাঞ্চকর গল্প। আলাদাভাবে সাতজনের দলের একজনের সঙ্গে নদীর তীরে বসে আমি উত্তরবঙ্গ ও চট্টগ্রাম, রাজনীতিসহ নানান গল্প করছিলাম অনেকক্ষণ। 

সকালের খাবার। ছবি : লেখক

সকালের খাবার। ছবি : লেখক


সকালের নাশতা প্রস্তুত হয়ে গেল। যারা ঘুম থেকে ওঠা বাকি ছিল, তারা উঠে পড়ল। সবাই একসঙ্গে খেতে বসলাম। খিচুড়ি, ডিম তরকারি, আলু ভর্তা, বেগুন ভাজা ও কেওড়ার আচার। খাওয়া শেষে সুন্দরবনের মধু খাওয়াল রিসোর্টের জাফর ভাই; যিনি আমাদের আদর যত্নের কমতি রাখেননি পুরোটা সময়। মধু অনেকটা নিয়েও এসেছি সঙ্গে করে। এসব মধু ওখানকার স্থানীয়রা সুন্দরবনের গহিন থেকে সংগ্রহ করে নিয়ে আসে, একদম খাঁটি। রিসোর্টে একটা বাঘের পায়ের ছাপও সংরক্ষণ করা আছে। এ যাত্রায় বনের ভেতর বাঘের দেখা না পেলেও রিসোর্টে ওই পায়ের ছাপ দেখে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটল। 

ক্যানেল ক্রুজিংয়ে গিয়ে ঢাংমারী গ্রামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রিসোর্ট দেখলাম। ছবি : লেখক

ক্যানেল ক্রুজিংয়ে গিয়ে ঢাংমারী গ্রামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন রিসোর্ট দেখলাম। ছবি : লেখক


শাড়ি বদলে আবার পোশাক পরে নিলাম। এবার একা একা যাব ক্যানেল ক্রুজিংয়ে। টিমের অন্যরা যাবে না, কারণ তারা শুট নিয়ে ব্যস্ত। একজন বৃদ্ধ লোক দায়িত্বে ছিলেন ক্যানেল ক্রুজিংয়ের। তার সঙ্গে দেশভাগ, মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, সুন্দরবনসহ তার পারিবারিক গল্পও শুনলাম। মুহূর্তটুকু বেশ কাটল। সকালের আলোতে নদীর বুকে ভেসে সুন্দরবন দেখা, ঢাংমারী গ্রামে গড়ে ওঠা বিভিন্ন নান্দনিক রিসোর্ট দেখা, স্থানীয়দের মলিন বাড়িঘর দেখা, জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে আসা বৃদ্ধের গল্প শোনা- সব মিলিয়ে অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা।

বনবিবির মন্দির। ছবি : লেখক

বনবিবির মন্দির। ছবি : লেখক


ক্রুজিং থেকে এসে গেলাম বনবিবির মন্দির দেখতে। স্থানীয় এক মেয়ে আমাকে আর ওই টিমের একজনকে নিয়ে গেল দেখাতে। ওখানকার বাসিন্দারা মাঘ মাসে বছরে একবার এই বনবিবির পূজা করে। তারা বিশ্বাস করে, বনবিবি তাদের সমস্ত প্রতিকূলতা থেকে রক্ষা করবে। পূজার সময় কবিগানের আসরও বসে। ওই সময় সুন্দরবন গেলে ব্যতিক্রম অভিজ্ঞতা হবে যে কারও।

যদিও চেক আউট টাইম ১১টায়, কিন্তু আমাদের বের হতে হতে ২টা পার হলো প্রায়। তেঁতুলের শরবতটা এত ভালো লেগেছে সবার, চলে আসার আগে সবাই আরেকবার চেয়েই খেল শরবতটা। বোটে করে আমরা রওনা হলাম মোংলার উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে করমজল দেখব। এখানে বলে রাখি, কয়েকজনের টিম হলে বোটে সরাসরি রিসোর্টে যাওয়া-আসা করা যায়। সেক্ষেত্রে রিসোর্টে পৌঁছাতে বাড়তি ধকল পোহাতে হয় না। কিন্তু একা বা দু তিনজন হলে পুরো বোটের খরচ বহন করাটা একটু কঠিন হয়ে যায়। তখন লাউডোব হয়ে আমি যেভাবে এসেছি, সেভাবে আসতে হবে। তবে শুনলাম, লাউডোব থেকে ঢাংমারীর রাস্তাটা নাকি সংস্কার করা হবে, সেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাহলে আর সমস্যা হবে না।


আমরা করমজল নেমে ভেতরে প্রবেশ করার সময় পাইনি আর। এটা একটা অপূর্ণতা থেকে গেল। পরেরবার দেখে নেব। আমরা খুব চেষ্টা করেছিলাম ৪টার বাস ধরতে, কিন্তু অল্পের জন্য পারিনি। ধরতে পারব না জানলে করমজলটা দেখেই নিতাম। যাই হোক, মোংলা নেমে দলের চারজন গেল খুলনাতে শুটের জন্য। তিনজন ঢাকা ফিরল আলাদা বাসে। আমি একা ঢাকা ফিরলাম সাড়ে পাঁচটার বাসে। ফেরার সময় দেখলাম পশুর নদীতে আগুনলাগা সন্ধ্যা নেমেছে। মাইলের পর মাইল এত সুন্দর সন্ধ্যা। জীবনে এমন সুন্দর সন্ধ্যা হাজারবার আসে না। ইচ্ছে করছিল, মোংলায় বসে গোটা সন্ধ্যা কাটাই। কিন্তু আমার বাস পেছনে না ফিরে আমাকে ক্রমেই মোংলা থেকে, পশুর নদী থেকে অনেক দূরে নিয়ে এল। আমি বাসের জানালা থেকেই মুগ্ধ দৃষ্টিতে দুর্লভ সন্ধ্যা দেখলাম। ঢাকা পৌঁছালাম রাত ১২টায়।

এবারের ভ্রমণে সুন্দরবন আমাকে সুন্দর কিছু মানুষ উপহার দিয়েছে। হয়ত এটাই এবার জন্মদিনের সবচেয়ে সুন্দর প্রাপ্তি। আমরা যারা মানুষ সঞ্চয় করতে ভালোবাসি, তারা জানি জীবনে মানুষ পাওয়ার থেকে সুন্দর প্রাপ্তি আর কিছু হতে পারে না। মানুষগুলো এত আনন্দমুখর, দু দন্ডও যেন সিরিয়াস হয়ে থাকতে পারে না। তাদের পৃথিবীটা আনন্দধাম হয়েই থাকুক। এছাড়া, পিয়ালী রিসোর্ট যেভাবে দুদিনের প্রতিটা মুহূর্ত সুন্দর করে তুলতে ভূমিকা রেখেছে, পিয়ালীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি মানুষের কাছে কৃতজ্ঞ। যে মানুষটি রেঁধেছে, যে বোটে পার করেছে, যে ক্যানেলে ঘুরিয়েছে, যে অটোতে নিয়ে এসেছে, যে খাবার পরিবেশনসহ অনেক কাজে সহযোগিতা করেছে, যে সার্বিক তত্ত্বাবধানে ছিল, যে খেয়াল রেখেছে দূরে থেকেও- মোটকথা সবার প্রতি কৃতজ্ঞ। সুন্দরবনের ভ্রমণে সুন্দর স্মৃতি জমাতে এই প্রতিটি মানুষ নকশীকাঁথা বুনেছে। তাদের মঙ্গল হোক। আবারও সুন্দরবন ভ্রমণের অপেক্ষায়.....

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   সুন্দরবন  পিয়ালী রিসোর্ট  ভ্রমণ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: