যারা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উদ্বেগের কারণ হতে পারে। ছবি : সংগৃহীত অনেকের জীবনেই মানসিক চাপ যেন নিত্যসঙ্গী। এর প্রভাব শুধু মনেই সীমাবদ্ধ থাকে না, পড়তে পারে শরীরের ওপরও। বিশেষ করে যারা সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাদের জন্য দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ উদ্বেগের কারণ হতে পারে। মাসিক চক্রে অনিয়ম, যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া কিংবা শুক্রাণুর গুণগত মানে পরিবর্তনের পেছনেও এর ভূমিকা থাকতে পারে।
দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ নারীদের মাসিক চক্র ও ডিম্বস্ফোটন প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। কারও মাসিক নির্ধারিত সময়ের চেয়ে দেরিতে শুরু হয়, কারও চক্র দীর্ঘায়িত হয়, আবার কারও ক্ষেত্রে মাসিক সাময়িকভাবে বন্ধও থাকতে পারে। এর পেছনে শরীরের হরমোনগত পরিবর্তন কাজ করে।
মানসিক চাপের মধ্যে থাকলে শরীরে কর্টিসলের মতো হরমোনের নিঃসরণ বেড়ে যেতে পারে। এর প্রভাবে মস্তিষ্ক ও ডিম্বাশয়ের মধ্যে হরমোনের সংকেত আদান-প্রদানের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। ফলে, ডিম্বস্ফোটন ও মাসিক চক্র নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনগুলোর ওপর প্রভাব পড়ে।
এ ছাড়া, মানসিক চাপ মাসিকের আগের কিছু উপসর্গও বাড়িয়ে দিতে পারে। ক্লান্তি, ঘুমের সমস্যা ও মেজাজের পরিবর্তন তখন আরও তীব্র হতে পারে। তবে মাসিক অনিয়মিত হওয়ার পেছনে শুধু মানসিক চাপ দায়ী নয়। পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম কিংবা থাইরয়েডের সমস্যার কারণেও এমনটা হতে পারে। তাই দীর্ঘদিন মাসিক অনিয়মিত থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
পুরুষের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ প্রভাব ফেলতে পারে। কাজের চাপ, আর্থিক উদ্বেগ ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব পুরুষের হরমোনের ভারসাম্য এবং যৌনস্বাস্থ্যে পরিবর্তন আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকলে পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা, যৌন আকাঙ্ক্ষা ও লিঙ্গোত্থান ক্ষমতা কমে যেতে পারে। পাশাপাশি শুক্রাণুর ঘনত্ব ও গতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এ বিষয়ে ‘জেবিআরএ অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন’ জার্নালে প্রকাশিত একটি পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় ১১ হাজার ১৪১ জন পুরুষকে নিয়ে করা ৩৪টি গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। এতে দেখা গেছে, মানসিক চাপে থাকা পুরুষদের বীর্যের বিভিন্ন গুণগত সূচক তুলনামূলকভাবে খারাপ ছিল।
পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত গবেষণার ৫২ দশমিক ৯ শতাংশে শুক্রাণুর ঘনত্ব কমে যাওয়ার তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ৬৩ দশমিক ৩ শতাংশ গবেষণায় শুক্রাণুর গতিশীলতা কম থাকার বিষয়টি উঠে আসে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, মানসিক চাপে থাকা প্রত্যেক পুরুষেরই প্রজনন সমস্যা হবে।
সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা অনেক দম্পতির জন্য আনন্দের হলেও দীর্ঘদিন গর্ভধারণ না হলে তা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাড়াতে পারে। শুরুতে কর্মক্ষেত্র, আর্থিক অবস্থা কিংবা ব্যক্তিগত দায়িত্বের কারণে যে মানসিক চাপ তৈরি হয়, সন্তান ধারণে বিলম্ব হলে তার সঙ্গে নতুন দুশ্চিন্তা যুক্ত হয়।
কোন দিন ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে, কখন শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত, চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্ট কিংবা পরিবারের সদস্যদের প্রশ্ন- সবকিছু মিলিয়ে বিষয়টি অনেক সময় চাপের হয়ে ওঠে। এমনকি দম্পতির স্বাভাবিক ও অন্তরঙ্গ সম্পর্কও নির্দিষ্ট সময় মেনে সম্পন্ন করার দায়িত্বের মতো মনে হতে পারে। এতে যৌন আকাঙ্ক্ষা ও সম্পর্কের স্বাভাবিকতাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। এর সঙ্গে অপর্যাপ্ত ঘুম, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস ও শারীরিক পরিশ্রমের অভাব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মানসিক চাপ থাকলেই কেউ বন্ধ্যাত্বের শিকার হবেন, এমন ধারণা সঠিক নয়। বয়স, ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর স্বাস্থ্য, ডিম্বস্ফোটনের স্বাভাবিকতা এবং শরীরের অন্যান্য অন্তর্নিহিত সমস্যা- সবকিছুই সন্তান ধারণের সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ৬ জন প্রাপ্তবয়স্কের মধ্যে একজন জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে বন্ধ্যাত্বের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। এই পরিসংখ্যানই বলে দেয়, প্রজননসংক্রান্ত সমস্যা কেবল মানসিক চাপের বিষয় নয়; এর পেছনে একাধিক শারীরিক ও অন্যান্য কারণ থাকতে পারে।
দৈনন্দিন জীবন থেকে সব ধরনের মানসিক চাপ দূর করা সম্ভব নয়। তবে, কিছু অভ্যাসে পরিবর্তন এনে চাপ সামলানো এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উন্নতি করা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতিদিন সাত থেকে আট ঘণ্টা ঘুমানো, নিয়মিত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং শারীরিক কার্যক্রমের জন্য সময় রাখা জরুরি। নিয়মিত হাঁটা, যোগব্যায়াম, গান শোনা কিংবা নিজের পছন্দের কাজে কিছুটা সময় কাটানো মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সময়ের আলো/মহু