শীতের শুরুতে নবজাতকের যত্নে সতর্কতা । ছবি : সংগৃহীতশীতের শুরুতে আবহাওয়ার পরিবর্তনের সঙ্গে বাড়তে থাকে সর্দি-কাশি, ঠান্ডা ও শ্বাসতন্ত্রের বিভিন্ন সংক্রমণ। এ সময় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে নবজাতক শিশুরা। তাই নবজাতকের যত্নে বাড়তি কিছু সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, ঘরের পরিবেশ, ত্বকের পরিচর্যা, সংক্রমণ প্রতিরোধ, শিশুর শরীর ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, দুধ খেতে না চাওয়া, অতিরিক্ত নিস্তেজ থাকা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়াসহ আরও যেসব বিষয়ে সতর্ক হবেন-
ঠান্ডা থেকে সুরক্ষা ও পরিচর্যায় প্রয়োজন সচেতনতা
জন্মের পর প্রথম কয়েক মাস শিশুর শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পুরোপুরি তৈরি হয় না। ফলে সামান্য ঠান্ডাতেও তাদের শরীরের তাপমাত্রা কমে যেতে পারে। আবার অতিরিক্ত গরম কাপড় পরানো বা মোটা কম্বলে ঢেকে রাখলেও তৈরি হতে পারে অস্বস্তি ও অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি। তাই শীতের শুরু থেকেই নবজাতকের যত্নে প্রয়োজন বাড়তি সতর্কতা।
শরীরের তাপমাত্রা ঠিক রাখা
নবজাতকের শরীর উষ্ণ রাখা জরুরি। তবে এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা দেখাতে গিয়ে শিশুকে অনেক বেশি কাপড় পরানো ঠিক নয়। শিশুর বয়স ও আবহাওয়া অনুযায়ী আরামদায়ক, নরম এবং সুতির কাপড় পরানো ভালো। সাধারণত বড়দের তুলনায় শিশুকে এক স্তর বেশি কাপড় পরানো যেতে পারে। মাথা ও পা ঠান্ডা হয়ে গেলে টুপি ও মোজা ব্যবহার করা যায়। তবে ঘরের ভেতরে অতিরিক্ত গরম লাগলে টুপি খুলে দিতে হবে।
শিশুর শরীরের তাপমাত্রা বোঝার জন্য হাত-পায়ের পরিবর্তে বুক বা ঘাড়ের পেছনের অংশ স্পর্শ করা ভালো। এসব জায়গা যদি অতিরিক্ত ঠান্ডা বা ঘেমে থাকে, সে অনুযায়ী পোশাক পরাতে হবে।
ঘরের পরিবেশ কেমন হবে
শীতের সময় নবজাতককে ঠান্ডা বাতাসের সরাসরি সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে হবে। তবে ঘরের দরজা-জানালা সবসময় বন্ধ রাখাও ঠিক নয়। ঘরে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকতে হবে। হিটার ব্যবহার করলে তা শিশুর কাছাকাছি রাখা যাবে না। ঘরের বাতাস অতিরিক্ত শুষ্ক হয়ে গেলে শিশুর নাক ও ত্বকে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে।
গোসল ও ত্বকের পরিচর্যা
শীতের শুরুতে প্রতিদিন নবজাতককে গোসল করানো জরুরি নয়। প্রয়োজনে কুসুম গরম পানি দিয়ে অল্প সময়ের মধ্যে গোসল করানো যায়। গোসলের পরপরই নরম তোয়ালে দিয়ে শরীর ভালোভাবে মুছে শুকনো কাপড় পরিয়ে দিতে হবে। শিশুর ত্বক শুষ্ক হয়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী উপযুক্ত ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে। সরিষার তেল, সুগন্ধিযুক্ত প্রসাধনী বা অপরিচিত উপাদান ত্বকে ব্যবহার না করাই ভালো।
বুকের দুধ ও সংক্রমণ প্রতিরোধ
শীতের সময় নবজাতকের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা বাড়াতে মায়ের বুকের দুধ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জন্মের পর প্রথম ছয় মাস শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। ছয় মাসের কম বয়সি শিশুকে আলাদা করে পানি দেওয়ার প্রয়োজন নেই। শিশুকে নিয়মিত দুধ খাওয়াতে হবে।
এ ছাড়া শিশুকে কোলে নেওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে। সর্দি-কাশি বা জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তিদের শিশুর কাছাকাছি আসা থেকে বিরত থাকতে হবে। অপ্রয়োজনে বেশি মানুষের কোলে শিশুকে দেওয়া ঠিক নয়।
যেসব লক্ষণে সতর্ক হবেন
নবজাতকের শরীর অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, দুধ খেতে না চাওয়া, অতিরিক্ত নিস্তেজ থাকা, দ্রুত শ্বাস নেওয়া বা শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া এসব লক্ষণ দেখলে সতর্ক হতে হবে। তিন মাসের কম বয়সি শিশুর তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। এসব ক্ষেত্রে ঘরোয়া চিকিৎসায় সময় নষ্ট করা উচিত নয়।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. প্রমিতা গুহ বলেন, নবজাতকের শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা পূর্ণাঙ্গভাবে তৈরি না হওয়ায় শীতকালে তাদের বিশেষ যত্ন প্রয়োজন। তবে শিশুকে অতিরিক্ত কাপড় বা কম্বলে ঢেকে রাখাও ঠিক নয়। এতে শরীর অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। শিশুকে আরামদায়ক পরিবেশে রাখতে হবে এবং নিয়মিত বুকের দুধ খাওয়াতে হবে। পাশাপাশি শিশুর শ্বাস-প্রশ্বাস, শরীরের তাপমাত্রা ও স্বাভাবিক আচরণের দিকে খেয়াল রাখা জরুরি। কোনো অস্বাভাবিকতা দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
শীতের শুরুতে নবজাতকের যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিচ্ছন্নতা, সঠিক তাপমাত্রা এবং সময়মতো খাবার নিশ্চিত করা। পরিবারের সদস্যদের সামান্য সচেতনতাই শিশুকে শীতকালীন নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে সুরক্ষিত রাখতে পারে।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/এসকে