শিশুদের মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা চর্চার একটি মাধ্যম দাবা। ছবি : সংগৃহীত প্রযুক্তির সহজলভ্যতায় শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষমতা কমছে- এমন উদ্বেগ প্রায়ই শোনা যায়। তবে, দাবার বোর্ডে বসলে চিত্রটা ভিন্ন হতে পারে। একটি ম্যাচে প্রতিটি চাল দেওয়ার আগে ভাবতে হয়, প্রতিপক্ষের কৌশল বুঝতে হয় এবং পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় ধরে চিন্তা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুশীলন শিশুদের একাগ্রতা বাড়াতে সহায়তা করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দাবা শুধু বিনোদনের খেলা নয়, শিশুদের মনোযোগ ও সমস্যা সমাধানের দক্ষতা চর্চারও একটি মাধ্যম।
চেস ডটকমের সাংবাদিক ও ভাষ্যকার মাইক ক্লেইন প্রায় ১৫ বছর ধরে শ্রেণিকক্ষে শিশুদের দাবা শিখিয়েছেন। তার মতে, শিশুদের মনোযোগের সময় বাড়ানো এবং একাগ্রতা তৈরিতে খেলাটি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
দাবার প্রতিটি চালই নতুন একটি সমস্যার মুখোমুখি করে খেলোয়াড়কে। ফলে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে থামতে হয়, সম্ভাব্য চালগুলো নিয়ে ভাবতে হয় এবং প্রতিপক্ষ কী করতে পারে, তা অনুমান করতে হয়। এতে মাথায় আসা প্রথম চিন্তাটি প্রয়োগ না করে ভেবেচিন্তে পদক্ষেপ নেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।
এ খেলায় কয়েক মিনিট থেকে শুরু করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মনোযোগ ধরে রাখতে হয়। একই সঙ্গে প্রতিটি সিদ্ধান্তের ফলও দ্রুত বোঝা যায়। ভুল চালের কারণে কী ধরনের ক্ষতি হলো কিংবা সঠিক সিদ্ধান্তে কীভাবে সুবিধা পাওয়া গেল- তা খেলোয়াড় নিজেই দেখতে পারে। ফলে, ভুল থেকে শেখা এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত আরও সঠিক করার সুযোগ তৈরি হয়।
স্নায়ুবিজ্ঞানী ও শিক্ষক জুডি উইলিস এ ধরনের শেখার প্রক্রিয়াকে ‘সক্রিয় শিক্ষা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, ভিডিও গেম খেলা, বাদ্যযন্ত্র বাজানো কিংবা খেলাধুলার মতো দাবাতেও ভুলের ফল দ্রুত সামনে আসে। এতে শিশুরা নিজেদের ভুল বুঝতে পারে এবং তা সংশোধনের মাধ্যমে ধীরে ধীরে দক্ষতা বাড়ায়।
শ্রেণিকক্ষের প্রচলিত শিক্ষার তুলনায় খেলাধুলায় অনেক সময় শেখার এই প্রক্রিয়া বেশি স্বতঃস্ফূর্তভাবে ঘটে। কারণ, এখানে শিশুকে শুধু তথ্য মনে রাখতে হয় না; বরং পরিস্থিতি বুঝে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
মনোযোগ ধরে রাখার ক্ষেত্রে আগ্রহ ও অনুপ্রেরণার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। মস্তিষ্ক নতুন কিছু শেখা এবং অসম্পূর্ণ সমস্যার সমাধান খুঁজে পেতে আগ্রহী। কিন্তু কোনো কাজের সঙ্গে শিশু নিজেকে যুক্ত করতে না পারলে কিংবা সেটি আনন্দদায়ক মনে না হলে মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
দাবা শিশুদের সামনে প্রতিনিয়ত নতুন চ্যালেঞ্জ হাজির করে। একটি ভালো চালের পর পরবর্তী চাল আরও ভালো করার আগ্রহ তৈরি হয়। খেলায় উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সাফল্যের আনন্দও বাড়ে। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, এই অভিজ্ঞতা শিশুদের খেলাটির প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং নিয়মিত অনুশীলনে উৎসাহ দেয়।
এ ক্ষেত্রে ডোপামিন নামের মস্তিষ্কের একটি রাসায়নিকেরও ভূমিকা রয়েছে। আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা ও পুরস্কারের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। ভালো চাল দেওয়া কিংবা কোনো সমস্যা সমাধান করতে পারার আনন্দ শিশুকে আরও শেখার প্রেরণা জোগাতে পারে।
সূত্র : ব্লুমবার্গ
সময়ের আলো/মহু