সমুদ্রের কাছে বিমানবন্দর। ছবি : সংগৃহীত বিমানে ভ্রমণের সময় অনেকেই লক্ষ করেছেন, অবতরণের আগে জানালা দিয়ে নদী, সাগর কিংবা বিশাল জলাশয়ের দৃশ্য চোখে পড়ে। বিশ্বের বেশ কিছু বড় বিমানবন্দরই গড়ে উঠেছে সমুদ্র উপকূল, নদীর তীর কিংবা কৃত্রিম দ্বীপে। কিন্তু বিমানবন্দর তৈরির জন্য জলাশয়ের কাছাকাছি জায়গা বেছে নেওয়া হয় কেন?
জাপানের ওসাকায় অবস্থিত কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কথাই ধরা যাক। শহরের ভেতরে বড় বিমানবন্দর তৈরির মতো পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় কর্তৃপক্ষ সমুদ্রের ওপর কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়।
বিমানবন্দরটি তৈরির জন্য প্রথমে ওসাকা উপসাগরে একটি কৃত্রিম দ্বীপ গড়ে তোলা হয়। মূল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটির দূরত্ব প্রায় ৪ কিলোমিটার। সেতুর মাধ্যমে দ্বীপটির সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগ স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় সাত বছর নির্মাণকাজের পর ১৯৯৪ সালে চালু হয় কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।
তবে, সমুদ্রের ওপর বিমানবন্দর নির্মাণের চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভূমিকম্প, সুনামি ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির মতো প্রাকৃতিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হয় কর্তৃপক্ষকে। কানসাই বিমানবন্দরেও ভূমি দেবে যাওয়া ও বন্যার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
কানসাইয়ের মতো সমুদ্রের বুকে কৃত্রিম দ্বীপে আরও কয়েকটি বিমানবন্দর তৈরি হয়েছে। কোথাও নতুন দ্বীপ নির্মাণ করা হয়েছে, কোথাও আবার বিদ্যমান দ্বীপের পরিসর বাড়িয়ে বিমানবন্দর গড়ে তোলা হয়েছে।
বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য আসলে বিশাল জায়গার প্রয়োজন হয়। রানওয়ে, টার্মিনাল, উড়োজাহাজ রাখার স্থানসহ নিরাপত্তা ও পরিচালনার নানা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হয়। শহরের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এত বড় জায়গা পাওয়া কঠিন। জলাশয়ের আশপাশে কিংবা উপকূলীয় এলাকায় তুলনামূলক কম জনবসতিপূর্ণ জায়গা পাওয়া গেলে সেখানে বিমানবন্দর নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়।
এ ছাড়া, বিমানবন্দর শহরের বাইরে থাকলে জনবসতির ওপর উড়োজাহাজের শব্দের প্রভাব কিছুটা কমানো সম্ভব। বিমান ওঠানামার সময় প্রচণ্ড শব্দ তৈরি হয়। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকার ওপর দিয়ে নিয়মিত উড়োজাহাজ চলাচল করলে আশপাশের বাসিন্দাদের দৈনন্দিন জীবন ও ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই বিমানবন্দরের অবস্থান নির্ধারণের সময় শব্দদূষণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
এছাড়া, বিমানবন্দরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রানওয়ের চারপাশে পর্যাপ্ত খোলা জায়গা রাখা জরুরি। উড়োজাহাজের ওঠানামার পথে উঁচু ভবন, টাওয়ার কিংবা অন্য কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকলে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে বিমানবন্দরের অবস্থান নির্ধারণের সময় আশপাশের ভূপ্রকৃতি, বাধামুক্ত আকাশপথ এবং নিরাপত্তা এলাকার বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।
জলাশয়ের কাছাকাছি জায়গায় অনেক সময় বড় জনবসতি বা স্থাপনা কম থাকে। ফলে, প্রয়োজনীয় খোলা জায়গা পাওয়া সহজ হতে পারে। তবে শুধু জলাশয় থাকলেই কোনো স্থান বিমানবন্দর নির্মাণের জন্য নিরাপদ হয়ে যায় না। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমি দেবে যাওয়া এবং রানওয়ের অবস্থানসহ নানা ঝুঁকি বিবেচনা করেই স্থান নির্বাচন করতে হয়।
ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরটিও নির্মাণের সময় আশপাশের এলাকায় জলাভূমি ও খোলা জায়গা ছিল। তবে, নগর সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকার অনেক জায়গায় জনবসতি ও স্থাপনা গড়ে উঠেছে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার বিমানবন্দর সমুদ্র উপকূলের কাছেই অবস্থিত। রানওয়ে সম্প্রসারণের কাজ শেষ হলে সমুদ্রের আরও কাছাকাছি দিয়ে উড়োজাহাজ ওঠানামার সুযোগ তৈরি হবে। এতে অবতরণের সময় যাত্রীদের সামনে খুলে যাবে সমুদ্রের মনোরম দৃশ্য।
সময়ের আলো/মহু