ডা. তারেক মোহাম্মদ
গ্রাফিক : সময়ের আলো শীতের শুষ্ক আবহাওয়া ও তাপমাত্রার ওঠানামার কারণে শ্বাসতন্ত্রের নানা সংক্রমণ বেড়ে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে নাক বন্ধ, বারবার হাঁচি কিংবা কানে অস্বস্তিকর চাপ অনুভব করা অনেকেরই পরিচিত সমস্যা। কখনো সর্দি-কাশির সঙ্গে নাক দিয়ে পানি পড়ে, আবার কখনো হঠাৎ মনে হয় কানে যেন তালা লেগেছে। এতে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস, কথা শোনা এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের মধ্যে এ ধরনের সমস্যা বেশি দেখা যায়। শীতের শুষ্ক আবহাওয়া, ধুলাবালি, অ্যালার্জি এবং ভাইরাসজনিত সংক্রমণ এসব সমস্যার অন্যতম কারণ। দৈনন্দিন কাজে ব্যাঘাত ঘটানো এই সমস্যাগুলো কেন হয় এবং এর প্রতিকার কী!
নাক ও কান বন্ধ বা হাঁচি-কাশির প্রধান কারণগুলো
ভাইরাস ও অ্যালার্জি : শীতের বাতাসে ধুলোবালি বেশি থাকায় অ্যালার্জেন বা রাইনোভাইরাসের সংক্রমণে নাকের ভেতরের মিউকাস মেমব্রেন ফুলে যায়। এতে নাক থেকে পানি পড়া, নাক বন্ধ হওয়া এবং হাঁচি-কাশি শুরু হয়।
ইউস্টেশিয়ান টিউবের অকার্যকারিতা : গলার পেছনের অংশের সঙ্গে মধ্যকর্ণের সংযোগকারী সরু নালিটিকে ইউস্টেশিয়ান টিউব বলে। সর্দি বা নাক বন্ধের কারণে নাকের পেছনের অংশ ফুলে গেলে এই টিউবটিও ব্লক হয়ে যায়। ফলে মধ্যকর্ণে বাতাস চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়ে কানে তালা লাগা বা কান বন্ধ হওয়ার অনুভূতি তৈরি হয়।
এডিনয়েড বা টনসিল বড় হওয়া : বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে নাকের পেছনের এডিনয়েড গ্রন্থি বড় হয়ে গেলে সর্দির কারণে তা নাক ও ইউস্টেশিয়ান টিউবের মুখ পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়। ফলে শিশুরা নাক দিয়ে শ্বাস নিতে পারে না, মুখ দিয়ে শ্বাস নেয় এবং কানে কম শোনে।
ঘরোয়া সমাধান
গরম পানির ভাপ : নাক ও কান বন্ধ সমস্যার সবচেয়ে কার্যকর ঘরোয়া সমাধান হলো দিনে ২-৩ বার ফুটন্ত গরম পানির ভাপ নেওয়া। এটি শ্বাসনালির জমে থাকা কফ তরল করে, নাকের ভেতরের ফোলাভাব কমায় এবং বন্ধ কান খুলতে সাহায্য করে।
কুসুম গরম পানি পান : গলা ব্যথা, নাক বন্ধ ও কাশির উপশমে নিয়মিত কুসুম গরম পানি পান করুন। চাইলে এর সঙ্গে সামান্য আদা বা মধু মিশিয়ে নিতে পারেন।
কান না খোঁচানো : কান বন্ধ থাকলে অনেকেই কটনবাড বা কাঠি দিয়ে কান খোঁচানোর চেষ্টা করেন। এটি একেবারেই অনুচিত। এতে কানের পর্দায় আঘাত লাগার মারাত্মক ঝুঁকি থাকে।
সুরক্ষা গ্রহণ : বাইরে বের হলে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করুন এবং ধুলোবালি ও সরাসরি ঠান্ডা বাতাস এড়িয়ে চলুন।
জরুরি বা প্রাথমিক ওষুধ
লক্ষণ দেখা দিলে প্রাথমিক উপশমের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে কিছু সাধারণ ওষুধ ব্যবহার করা যেতে পারে :
অ্যান্টিহিস্টামিন : হাঁচি, নাক দিয়ে পানি পড়া ও অ্যালার্জির জন্য ফেক্সোফেনাডিন, রুপাটাডিন বা ডেসলোরাটাডিনজাতীয় ওষুধ সেবন করা যেতে পারে।
ন্যাজাল ড্রপ : নাক ও কান বন্ধের জন্য জাইলোমেটাজোলিন (০.১% বয়স্কদের জন্য এবং ০.০৫% শিশুদের জন্য) ড্রপ অত্যন্ত কার্যকর। এটি নাকের দুই ছিদ্রে ২-৩ ফোঁটা করে দিনে ২-৩ বার দেওয়া যেতে পারে। (সতর্কতা— এই ড্রপ কোনোভাবেই টানা ৫-৭ দিনের বেশি ব্যবহার করা যাবে না)।
জ্বর ও ব্যথানাশক : কান ব্যথা, মাথা ব্যথা, গলা ব্যথা বা জ্বর থাকলে বয়স ও ওজন অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করা নিরাপদ।
কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হবেন?
সাধারণত সর্দি-কাশি, নাক ও কান বন্ধের সমস্যা ৭ থেকে ১০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। তবে যদি কানের তীব্র ব্যথা শুরু হয়, কান দিয়ে পুঁজ বা রক্ত পড়ে, দীর্ঘদিন নাক বন্ধ থাকার কারণে শ্বাসকষ্ট হয় কিংবা ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে কান বন্ধ থাকে, তবে কালক্ষেপণ না করে দ্রুত একজন নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
লেখক : সহকারী অধ্যাপক, নাক-কান-গলা এবং হেড-নেক সার্জারি বিভাগ, পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ধানমন্ডি।
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডআই