ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ছবি : এআই বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকে বলিরেখা, শুষ্কতা ও স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়ার মতো পরিবর্তন দেখা দেয়। তবে বয়সের প্রভাব ত্বকে কতটা পড়বে, তা অনেকটাই নির্ভর করে জীবনযাপন ও খাদ্যাভ্যাসের ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু পুষ্টিকর খাবার ত্বকের আর্দ্রতা বজায় রাখা, কোলাজেন উৎপাদনে সহায়তা করা এবং অকালবার্ধক্যের লক্ষণ কমাতে ভূমিকা রাখতে পারে। তাই ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন কয়েক ধরনের খাবার।
রঙিন ফল ও শাকসবজি
ত্বক সুস্থ রাখতে উদ্ভিদজাত খাবারসমৃদ্ধ খাদ্যতালিকা বেশ উপকারী। বিশেষ করে বিভিন্ন রঙের ফল ও শাকসবজিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ত্বককে দূষণ ও সূর্যের আলোর কারণে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে।
গাজর, মরিচ ও টমেটোতে প্রচুর ক্যারোটিনয়েড থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো লুটেইন, লাইকোপেন ও বিটা-ক্যারোটিন।
ফ্রেডরিখ শিলার ইউনিভার্সিটি জেনার খাদ্য রসায়নের অধ্যাপক ফলকার বোহম বলেন, ‘এগুলো চর্বি কলায় (ফ্যাট টিস্যুতে) জমা হয় এবং অতিবেগুনি রশ্মি থেকে সুরক্ষা দেয়।’
তার মতে, নিয়মিত ক্যারোটিনয়েডসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে সারা বছর ত্বকে কিছুটা ভিত্তিগত অতিবেগুনি রশ্মি প্রতিরোধের ক্ষমতা তৈরি হতে পারে।
টমেটো বা গাজরের সঙ্গে অলিভ অয়েলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি অল্প পরিমাণে মিশিয়ে খেলে শরীর সহজে ক্যারোটিনয়েড শোষণ করতে পারে।
এ ছাড়া, বিটা-ক্যারোটিন শরীরে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়। ত্বকের কোষের বৃদ্ধি এবং সংক্রমণ থেকে সুরক্ষায় এই ভিটামিন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ক্যারোটিনয়েড ত্বকের হায়ালুরোনিক অ্যাসিড তৈরিতেও সহায়তা করতে পারে। এই উপাদান ত্বকের আর্দ্রতা, দৃঢ়তা ও স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে কোলাজেনের পরিমাণ ও গঠন ধরে রাখতেও সহায়তা করতে পারে।
একটি গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ১০ মাস প্রতিদিন ক্যারোটিনয়েড সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা নারীদের ত্বকের কোলাজেন ও ইলাস্টিনের উন্নতি হয়েছে। এতে ধারণা করা হয়, ক্যারোটিনয়েড কোলাজেনের ভাঙন প্রতিরোধেও ভূমিকা রাখতে পারে।
নিয়মিত রঙিন ফল ও শাকসবজি খেলে ত্বকে স্বাস্থ্যকর আভাও তৈরি হতে পারে। তবে, এসব খাবারের উপকার পেতে নিয়মিত গ্রহণ করা জরুরি। অধ্যাপক জ্যঁ ক্রুটম্যানের মতে, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট গ্রহণের ফলে পরিবেশগত ক্ষতি থেকে ত্বকের সুরক্ষায় পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন দেখতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ সময় লাগতে পারে।
আম
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ত্বকের তারুণ্য ধরে রাখতে আমের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও গবেষণা হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিভিয়েন ফামের নেতৃত্বে পরিচালিত একটি গবেষণায় রজোনিবৃত্তির পরের বয়সী নারীদের ওপর আম খাওয়ার প্রভাব পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় অংশ নেওয়া নারীরা ১৬ সপ্তাহ ধরে প্রতি সপ্তাহে চার দিন ৮৫ গ্রাম করে আম খান। এতে তাদের আগে থেকে থাকা বলিরেখার আকার এবং নতুন বলিরেখার সংখ্যা কমতে দেখা যায়।
গবেষকদের ধারণা, আমে থাকা ক্যারোটিনয়েড, অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ফ্ল্যাভোনয়েড ও ম্যাঙ্গিফেরিন এ উপকারের পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে আশ্চর্যজনকভাবে, গবেষণায় প্রতিদিন প্রায় ২৫০ গ্রাম আম খাওয়া নারীদের ক্ষেত্রে বলিরেখা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে।
গবেষণাটির অন্যতম সহলেখক ও ক্যালিফোর্নিয়া ডেভিস বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিদ্যার অধ্যাপক রবার্ট হ্যাকম্যান বলেন, ‘এর সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি। তবে, আমে থাকা প্রাকৃতিক চিনির উচ্চমাত্রা এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।’
আমের পাশাপাশি লেবু, কমলা ও অন্যান্য সাইট্রাস ফলে প্রচুর ভিটামিন সি রয়েছে। এটি শরীরে কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে। ফলে, সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মির কারণে সৃষ্ট ক্ষতি থেকে ত্বককে সুরক্ষা দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ভিটামিন সি ত্বকের আর্দ্রতা বাড়াতে এবং পিগমেন্টেশন বা ত্বকের রঙের অসমতা কমাতে সহায়তা করতে পারে। এ কারণে ত্বকের যত্নের বিভিন্ন পণ্য ও সাপ্লিমেন্টে ভিটামিন সি ব্যবহার করা হয়।
স্বাস্থ্যকর চর্বি
ত্বকের সুস্থতা ও আর্দ্রতা বজায় রাখতে স্বাস্থ্যকর চর্বিও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাদাম, বীজ এবং তৈলাক্ত মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
একটি ছোট পরিসরের র্যান্ডমাইজড নিয়ন্ত্রিত গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ১৬ সপ্তাহ নাশতা হিসেবে বাদাম খাওয়া ব্যক্তিদের ত্বকে অন্য ধরনের নাশতা গ্রহণকারীদের তুলনায় বলিরেখা কম দৃশ্যমান ছিল।
বাদাম ও বীজে থাকা ভিটামিন ই ত্বকের কোষকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। এ ছাড়া, এটি ত্বকের বার্ধক্য প্রতিরোধ এবং ক্ষত নিরাময়েও ভূমিকা রাখে। ভিটামিন ইয়ের ভালো উৎস হলো কাঠবাদাম, হ্যাজেলনাট, পাইন নাট ও বিভিন্ন বীজের তেল।
বাদামে থাকা ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড ত্বকের সুরক্ষাস্তর শক্তিশালী করতে এবং আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে।
অন্যদিকে, ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও ত্বকের জন্য উপকারী। এটি পাওয়া যায় তৈলাক্ত মাছ ও শৈবালে। স্যামন, সার্ডিন ও ম্যাকেরেল মাছ ওমেগা-৩-এর ভালো উৎস।
ছোট পরিসরের কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ খেলে সূর্যের প্রতি ত্বকের সংবেদনশীলতা কমতে পারে। পাশাপাশি এটি ত্বকের কোলাজেন সংরক্ষণ এবং প্রদাহ কমাতেও সহায়তা করে।
ত্বকের সুস্থতার সঙ্গে অন্ত্রের স্বাস্থ্যেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের তাজা ফলমূল, শাকসবজি, বাদাম ও বীজ খেলে অন্ত্রের উপকারী অণুজীবগুলো পুষ্টি পায়। এসব অণুজীব এমন কিছু যৌগ তৈরি করে, যেগুলোর প্রদাহবিরোধী ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এগুলো ত্বকের সুস্থতাতেও ভূমিকা রাখে।
সুস্থ অন্ত্রের মাইক্রোবায়োম রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে ত্বকের বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। এ জন্য খাদ্যতালিকায় বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদজাত খাবার রাখা জরুরি। যেমন ফলমূল, শাকসবজি, ডাল, শস্য, গোটা শস্য, ভেষজ ও মসলা।
এ ধরনের খাবার মানসিক চাপ কমাতে, ঘুমের উন্নতি ঘটাতে এবং সোরিয়াসিসের মতো কিছু চর্মরোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। সোরিয়াসিস হলে ত্বকে শুষ্ক, আঁশযুক্ত ও চুলকানিযুক্ত দাগ দেখা দেয়।
অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের জন্য গাঁজানো খাবারও বেশ উপকারী। যেমন- সাওয়ারক্রাউট, কিমচি, কম্বুচা ও দই।
তবে, ত্বকের সুরক্ষায় শুধু খাবারের ওপর নির্ভর করলেই চলবে না; সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে ত্বককে সুরক্ষিত রাখতে নিয়মিত সানস্ক্রিন ব্যবহারও জরুরি।
সূত্র : বিবিসি
সময়ের আলো/মহু