অসুস্থ কাক কেন নিজেই পিঁপড়ার কামড় খেতে যায়?

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

প্রকৃতিতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা প্রথম দেখায় অদ্ভুত মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রাণীদের টিকে থাকার চমৎকার সব

2026-10-31T19:10:54+00:00
2026-10-31T19:10:54+00:00
 
  শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬,
১৫ কার্তিক ১৪৩৩
শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
অসুস্থ কাক কেন নিজেই পিঁপড়ার কামড় খেতে যায়?
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: শনিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৬, ৭:১০ পিএম 
ছবি : এআই জেনারেটেড
প্রকৃতিতে এমন অনেক ঘটনা ঘটে, যা প্রথম দেখায় অদ্ভুত মনে হলেও এর পেছনে লুকিয়ে থাকে প্রাণীদের টিকে থাকার চমৎকার সব কৌশল। কোনো প্রাণী নিজের শরীর পরিষ্কার রাখতে ধুলায় গড়াগড়ি খায়, কেউ আবার বিষাক্ত উদ্ভিদ কিংবা পোকামাকড়ের সাহায্য নেয়। কিন্তু কখনো কি দেখেছেন, একটি কাক নিজেই পিঁপড়ার বাসায় গিয়ে তাদের আক্রমণের শিকার হচ্ছে? শুধু তা-ই নয়, পাখিটি ডানা মেলে ও পালক ফুলিয়ে পিঁপড়াদের নিজের শরীরের ওপর ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ করে দিচ্ছে। বাইরে থেকে দৃশ্যটি দেখে মনে হতে পারে, কাকটি বুঝি বিপদে পড়েছে। অথচ এর পেছনে রয়েছে পাখিদের এক বিশেষ আচরণ, যার নাম ‘অ্যান্টিং’। এটি প্রাণিজগতের অন্যতম কৌতূহলোদ্দীপক আচরণ। 

পিঁপড়ার কামড় খেতে যায় কেন?

অ্যান্টিং মূলত পাখিদের শরীর ও পালকের যত্ন নেওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আচরণ। এ প্রক্রিয়ায় পাখিরা পিঁপড়া কিংবা পিঁপড়ার শরীর থেকে নিঃসৃত রাসায়নিক পদার্থ নিজেদের পালকে ছড়িয়ে দেয়। সাধারণত যেসব পিঁপড়া আত্মরক্ষার জন্য বিশেষ রাসায়নিক নিঃসরণ করে, পাখিরা তাদেরই বেশি ব্যবহার করে।

কাকজাতীয় পাখিসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির মধ্যে এই আচরণ দেখা গেছে। পাখিরা কখনো ঠোঁট দিয়ে পিঁপড়া ধরে পালকের মধ্যে ঘষে, আবার কখনো পিঁপড়ার বাসায় গিয়ে তাদের নিজের শরীরে উঠে আসার সুযোগ দেয়। এতে বিরক্ত ও উত্তেজিত পিঁপড়ারা আত্মরক্ষার জন্য কামড়ায় এবং কোনো কোনো প্রজাতির ক্ষেত্রে শরীর থেকে ফরমিক অ্যাসিড বা ফর্মিক অ্যাসিড ছুড়ে দেয়। পাখির পালকে এই রাসায়নিক ছড়িয়ে পড়াই অ্যান্টিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

ফরমিক অ্যাসিড একটি জৈব অ্যাসিড। এর নাম এসেছে লাতিন শব্দ ‘ফর্মিকা’ থেকে, যার অর্থ পিঁপড়া। কিছু প্রজাতির পিঁপড়া এই অ্যাসিডকে আত্মরক্ষার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে। তবে সব পিঁপড়া একইভাবে অ্যাসিড নিঃসরণ করে না। আবার পাখির শরীরে পিঁপড়ার কামড় মানেই যে অ্যাসিড প্রবেশ করছে, বিষয়টি এমনও নয়। অনেক ক্ষেত্রে পিঁপড়ারা পালকের ওপর রাসায়নিক ছড়িয়ে দেয়।

প্রাকৃতিক কীটনাশক হিসেবে কাজ করে?

অ্যান্টিং নিয়ে বিজ্ঞানীদের আগ্রহের অন্যতম কারণ হলো এর সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত উপকারিতা। দীর্ঘদিন ধরে ধারণা করা হচ্ছে, পিঁপড়ার নিঃসৃত রাসায়নিক পাখির পালকে থাকা উকুন, মাইট ও অন্যান্য ক্ষতিকর পরজীবী নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করতে পারে। এ কারণে অ্যান্টিংকে অনেক সময় পাখিদের স্বাভাবিক আত্মপরিচর্যা কিংবা সম্ভাব্য স্ব-চিকিৎসার কৌশল হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।


তবে বিষয়টি নিয়ে গবেষণায় এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসেনি। পরীক্ষাগারে বিশুদ্ধ ফরমিক অ্যাসিডের ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকবিরোধী কার্যকারিতা পাওয়া গেলেও পিঁপড়ার শরীর থেকে স্বাভাবিকভাবে নিঃসৃত অ্যাসিডের ঘনত্ব অনেক ক্ষেত্রে এতটাই কম যে, তা একইভাবে কাজ করে না। 

২০০৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, পিঁপড়ার রাসায়নিক নিঃসরণ পাখির পালকের কিছু ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাক দমনে কার্যকর হওয়ার পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এমনকি পাখির শরীর থেকে উকুন ও মাইট দূর করার ক্ষেত্রেও এর কার্যকারিতা এখনো নিশ্চিত নয়।

তাহলে পাখিরা কেন এমন করে? এর একটি বিকল্প ব্যাখ্যা দিয়েছেন গবেষকেরা।

পিঁপড়াকে খাওয়ার উপযোগী করে তোলার কৌশল!

পাখিদের অ্যান্টিং আচরণের পেছনে আরেকটি চমকপ্রদ ব্যাখ্যা রয়েছে। সেটি হলো, পিঁপড়াকে খাওয়ার আগে তার আত্মরক্ষার রাসায়নিক নিঃসরণ বের করে নেওয়া। কারণ, কিছু পিঁপড়া শত্রুর আক্রমণ ঠেকাতে ফরমিক অ্যাসিড ব্যবহার করে। এই রাসায়নিক তাদের স্বাদকে তীব্র ও অপছন্দনীয় করে তুলতে পারে।

২০০৯ সালে ব্লু জে নামের এক প্রজাতির পাখি নিয়ে প্রকাশিত গবেষণায় এ ধারণার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যায়। গবেষকেরা দেখতে পান, পাখিগুলো পিঁপড়াকে খাওয়ার আগে পালকের মধ্যে ঘষে নেয়। এতে পিঁপড়ার শরীরে থাকা অ্যাসিডের থলি থেকে প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক বেরিয়ে যায়। পরে পাখিরা তুলনামূলক কম রাসায়নিকযুক্ত পিঁপড়াগুলো খেয়ে ফেলে।

অর্থাৎ, পিঁপড়ার শরীর থেকে অ্যাসিড বের করে নেওয়ার পর সেটিকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করা সহজ হয়। এই গবেষণা থেকে ধারণা করা হয়, কিছু পাখির ক্ষেত্রে অ্যান্টিং কেবল শরীর পরিচর্যার কৌশল নয়, বরং খাবার প্রস্তুত করার একটি পদ্ধতিও হতে পারে।

অ্যান্টিংয়ের রয়েছে দুই ধরন

পাখিদের এই আচরণ সাধারণত দুইভাবে দেখা যায়। প্রথমটি ‘অ্যাকটিভ অ্যান্টিং’। এ ক্ষেত্রে পাখি নিজেই ঠোঁট দিয়ে একটি বা একাধিক পিঁপড়া ধরে নিজের পালকের মধ্যে ঘষতে থাকে। কখনো পিঁপড়াকে ডানা, লেজ কিংবা শরীরের বিভিন্ন অংশে চেপে ধরে। এতে পিঁপড়ার শরীর থেকে প্রতিরক্ষামূলক রাসায়নিক বেরিয়ে আসে এবং পালকে ছড়িয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়টি ‘প্যাসিভ অ্যান্টিং’। এ পদ্ধতিতে পাখি পিঁপড়ার বাসা কিংবা চলাচলের পথের ওপর বসে পড়ে। এরপর ডানা মেলে, পালক ফুলিয়ে কিংবা শরীর নড়াচড়া করে পিঁপড়াদের নিজের গায়ে ওঠার সুযোগ দেয়। পিঁপড়ারা তখন পাখির শরীরে ঘুরে বেড়ায় এবং আত্মরক্ষার জন্য রাসায়নিক নিঃসরণ করে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, পাখিটি ইচ্ছা করেই পিঁপড়ার আক্রমণ সহ্য করছে।


এখন পর্যন্ত দুই শতাধিক প্রজাতির পাখির মধ্যে অ্যান্টিং আচরণ নথিভুক্ত হয়েছে। তবে সব পাখি একই কারণে কিংবা একই পদ্ধতিতে এই আচরণ করে না। পিঁপড়ার পাশাপাশি কোনো কোনো পাখিকে মিলিপিড, কিছু পোকামাকড় এবং উদ্ভিজ্জ উপাদানও পালকে মাখতে দেখা গেছে। অর্থাৎ শরীর পরিচর্যার ক্ষেত্রে পাখিরা পরিবেশ থেকে পাওয়া বিভিন্ন উপাদান ব্যবহার করতে পারে।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, অ্যান্টিংয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে এখনো গবেষণা চলছে। পরজীবী নিয়ন্ত্রণ, পালকের পরিচর্যা, শরীরের অস্বস্তি কমানো কিংবা খাবার প্রস্তুত—একাধিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কোনো একটি কারণ সব প্রজাতির পাখির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।

তাই পিঁপড়ার বাসায় গিয়ে কাকের কামড় খাওয়ার দৃশ্যকে নিছক বোকামি ভাবার সুযোগ নেই। এটি প্রাণিজগতের দীর্ঘ অভিযোজনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এক বিস্ময়কর আচরণ। যে পিঁপড়াকে আমরা সাধারণত বিরক্তিকর পোকা হিসেবে দেখি, সেই পিঁপড়ার আত্মরক্ষার কৌশলই কোনো কোনো পাখির কাছে হয়ে উঠতে পারে শরীর পরিচর্যা কিংবা খাবার প্রস্তুতির উপায়। প্রকৃতির এই ছোট্ট ঘটনাই মনে করিয়ে দেয়, প্রাণীদের প্রতিটি আচরণের পেছনে থাকতে পারে এমন কোনো রহস্য, যার উত্তর খুঁজতে বিজ্ঞানীদেরও বছরের পর বছর গবেষণা করতে হয়। 

সময়ের আলো/জেডি 
  বিষয়:   অসুস্থ কাক  পিঁপড়ার কামড়  অ্যান্টিং  প্রাণ প্রকৃতি 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: