ছোটোবেলায় ঈদের পোশাক কিনতে গিয়ে অন্যদের মতো তৈরি পোশাক বেছে নিতেন না এলমা খন্দকার এষা। কাপড় কিনে নিজের পছন্দমতো নকশা করতেন তিনি। কখনো সিকুয়েন্স, কখনো স্টোন; নানা উপকরণ দিয়ে সাজিয়ে নিতেন নিজের পোশাক। সেই পছন্দই ডালপালা মেলে আজ রূপ নিয়েছে ‘মাইসারা’ নামে নিজের ফ্যাশন ব্রান্ডে। বনানী সুপার মার্কেটে দিয়েছেন শো-রুম। বারিশা হকের মতো জনপ্রিয় মুখকে করেছেন ব্রান্ড অ্যাম্বাসেডর।
মাইসারার যাত্রাপথটা অবশ্য খুব সহজ ছিল না। এলমার ভাষায়, এই যাত্রায় তাকে অসংখ্যবার হোঁচট খেতে হয়েছে। তবে, হোঁচট খেতে খেতেই একসময় দাঁড়াতে শিখেছেন।
এই পথচলায় অবশ্য নিজের একার কৃতিত্ব দেখতে চান না এলমা। তার কাছের মানুষ ও বন্ধুরা পাশে ছিলেন, এখনো আছেন। তাদের সহযোগিতা ছাড়া মাইসারাকে এই পর্যায়ে নিয়ে আসা সম্ভব হতো না বলেই মনে করেন তিনি। তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন।
এলমা খন্দকার এষা ও বারিশা হক। ছবি : সৌজন্য
ফ্যাশন নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতায় এলমা বুঝেছেন, নিজের পছন্দ ও ক্রেতার পছন্দ সব সময় এক হবে না। এমন অনেকবার হয়েছে, কোনো পোশাকের নকশা করে যে ধরনের সাড়া আশা করেছিলেন, তা পাননি। আবার কখনো পোশাক তৈরি হয়ে আসার পর নিজেরই সেটি খুব একটা পছন্দ হয়নি, অথচ ক্রেতারা আগ্রহ নিয়ে কিনে নিয়েছেন। এই অভিজ্ঞতাগুলোকে তিনি নেতিবাচকভাবে দেখেন না। বরং তার কাছে এগুলো ক্রেতাদের পছন্দ ও রুচি বোঝার অংশ।
তার মতে, প্রত্যেক মানুষের পছন্দ আলাদা। নকশাকারের নিজস্ব চিন্তা ও নকশার ধরন থাকবে, আবার ক্রেতাদেরও থাকবে নিজস্ব রুচি। এই ভিন্নতার মধ্য দিয়েই তৈরি হয় পারস্পরিক বোঝাপড়া ও নতুন অভিজ্ঞতা। কোনো পোশাক নিজের প্রত্যাশামতো না হলেও ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় জায়গা করে নিলে তিনি আনন্দ পান; যেহেতু সেই নকশা তারই তৈরি। নিজের ভাবনার সঙ্গে ক্রেতার পছন্দের এই মিলে যাওয়াটাও তার কাছে কাজের অন্যতম আনন্দের জায়গা।
মাইসারার পোশাক। ছবি : সৌজন্য
অনলাইন ব্যবসায় ক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগের ধরন নিয়েও মাইসারার নিজস্ব একটি পদ্ধতি রয়েছে। ফেসবুক পেজের ইনবক্সে ক্রেতাদের সঙ্গে কেবল পণ্য বা অর্ডার নিয়ে কথা বলার বদলে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেন তারা।
এলমা জানান, অনেক সময় ক্রেতাদের সঙ্গে গল্প করেন, তাদের পছন্দের রং জানতে চান, কী ধরনের পোশাক তারা দেখতে চান, তা নিয়ে আলোচনা করেন। শোরুমে আসা ক্রেতাদের কথাও মন দিয়ে শোনেন। তাদের পছন্দ ও চাহিদা সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেন। যাতে সেই অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের নকশা ও পোশাক তৈরিতে কাজে লাগে।
অনলাইন ও অফলাইন দুই মাধ্যমেই ক্রেতাদের মতামতকে গুরুত্ব দেন তারা। এমন ক্রেতাও আছেন, যারা প্রথমে অনলাইনে পোশাক কিনেছেন, পরে সরাসরি শোরুমে এসেছেন। এই যোগাযোগের ধারাবাহিকতা ব্র্যান্ডটির সঙ্গে ক্রেতাদের সম্পর্ক তৈরিতে ভূমিকা রাখছে।
নিজের উদ্যোগ দাঁড় করাতে গিয়ে নানা বাধার মুখোমুখি হয়েছেন এলমা। তবে তার অভিজ্ঞতায়, সমস্যাগুলো শুধু ব্যবসার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পরিবার, সমাজ ও নারীকে ঘিরে প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গিও। তিনি মনে করেন, একজন নারীকে নিজের পথে এগোতে গিয়ে অনেক ধরনের বাধা সামলাতে হয়। ব্যবসার ক্ষেত্রে সেই চ্যালেঞ্জ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বিশেষ করে যখন উদ্যোগটি অনলাইনভিত্তিক হয়। এলমার কথা অনুযায়ী, কেউ চাকরি করলে সমাজে তার পরিচয়কে যেভাবে দেখা হয়, অনলাইন ব্যবসা করলে অনেক সময় সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অথচ একটি ব্যবসা দাঁড় করানোর পেছনে যে পরিমাণ শ্রম, সময় ও প্রচেষ্টা প্রয়োজন, তা বাইরে থেকে সব সময় বোঝা যায় না।
মাইসারার গয়না। ছবি : সৌজন্য
এই পরিস্থিতিতে কীভাবে এগিয়ে গেছেন তিনি? এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি জানান, নিজের লক্ষ্য থেকে মনোযোগ সরতে দেননি। তিনি জানতেন, ব্যবসা করবেন এবং নিজের নকশা করা পোশাক মানুষের কাছে পৌঁছে দেবেন। এই লক্ষ্যটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
এলমার মতে, চারপাশ থেকে বাধা আসতেই পারে। কিন্তু নিজের কাজ নিয়ে মনোযোগ পরিষ্কার থাকলে সেই বাধাগুলোকে অতিক্রম করে সামনে এগোনো সম্ভব। মাইসারার পথচলায় এই মানসিকতাই তাকে এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করেছে।
মাইসারা থেকে পোশাক কেনার অভিজ্ঞতাকে আলাদা করে দেখতে চান এই উদ্যোক্তা। তার লক্ষ্য, ক্রেতারা যেন এমন পোশাক পরতে পারেন, যা তাদের নিজস্ব রুচি ও ব্যক্তিত্বকে প্রকাশ করে। বিশেষ করে পোশাকের ক্ষেত্রে অনেকেই চান, তাদের পরনের নকশাটি যেন সবার মতো না হয়।
এলমার মতে, মাইসারার নকশা বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বাতন্ত্র্যের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ক্রেতারা এখানে এমন পোশাক পাবেন, যা অন্য কোথাও সহজে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মাইসারাকে নিয়ে এলমার পরিকল্পনা শুধু একটি শোরুম বা ফ্যাশন ব্র্যান্ডের পরিসর বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশের ফ্যাশনশিল্পকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও পরিচিত করে তোলার ইচ্ছাও রয়েছে তার। বিশেষ করে দেশীয় কাপড়ের সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদী তিনি। মাইসারার কাজে মসলিন ও সিল্কের মতো কাপড় ব্যবহারের পাশাপাশি খাদি, কটন ও টাঙ্গাইলের সেমি-মসলিনের মতো কাপড় নিয়েও কাজ করার আগ্রহ রয়েছে তার।
এলমা মনে করেন, বাংলাদেশের নিজস্ব কাপড় ও ঐতিহ্যের মধ্যে এমন অনেক সম্ভাবনা আছে, যেগুলোকে সৃজনশীল নকশার মাধ্যমে আরও বিস্তৃত পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব। যারা পোশাক নকশা করেন, তারা কাজ করতে গিয়েই এসব কাপড়ের বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে দেশীয় কাপড়কে আরও বড় পরিসরে পরিচিত করাতে চান তিনি।
এই উদ্যোক্তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা যশোরে। পড়াশোনা করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানে। তবে, ফ্যাশনের প্রতি ভালোলাগাটা যেন ছোটবেলা থেকেই তার মনের গহীনে জন্ম নিয়েছিল। তাইতো দিন-রাত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে, ভালোলাগাটাকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে।