যারা অন্যের যত্ন নেয়, তাদেরও যত্নের প্রয়োজন। ছবি : সংগৃহীত প্রিয় মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে প্রতিদিন নিজেদের সময়, শ্রম ও স্বপ্নের অনেকটা বিসর্জন দেন অসংখ্য মানুষ। কেউ বৃদ্ধ মা-বাবার দেখাশোনা করেন, কেউ অসুস্থ সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে লড়াই করেন, কেউবা দীর্ঘদিন ধরে শয্যাশায়ী স্বজনের সেবা করে চলেছেন। কিন্তু যারা অন্যের কষ্ট লাঘব করতে গিয়ে নিজের ক্লান্তি আড়াল করেন, তাদের খোঁজ রাখেন কতজন?
পরিবারের কাউকে খাওয়ানো, গোসল করানো, ওষুধ খাওয়ানো, হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া কিংবা রাত জেগে পাশে বসে থাকা- এসব কাজের প্রতিটিতেই প্রয়োজন সময়, শ্রম ও ধৈর্য। অথচ পরিবারের সদস্যদের জন্য করা এসব কাজকে অনেক সময় আলাদা কোনো শ্রম হিসেবেই বিবেচনা করা হয় না। এর বিনিময়ে মেলে না পারিশ্রমিক, থাকে না নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা কিংবা ছুটির সুযোগ।
বিশেষ করে নারীদের ওপর এ দায়িত্বের চাপ বেশি। এই শ্রমের কারণে অনেক নারীকে চাকরি, পড়াশোনা কিংবা নিজের পেশাগত উন্নতির সুযোগ ছাড়তে হয়। কেউ কর্মঘণ্টা কমিয়ে আনেন, কেউ নিজের বিশ্রাম ও বিনোদনের সময়টুকু অন্যের প্রয়োজনে ব্যয় করেন। পরিবারের জন্য তাদের এই অবদান গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক মূল্য অনেক সময় যথাযথ স্বীকৃতি পায় না।
পরিচর্যার দায়িত্ব শুধু শারীরিক শ্রমের নয়, মানসিক চাপেরও। অসুস্থ স্বজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি, চিকিৎসার ব্যয়, ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কিংবা দীর্ঘদিন একই দায়িত্ব পালন করতে করতে পরিচর্যাকারীর মধ্যে ক্লান্তি ও একাকিত্ব তৈরি হতে পারে। যিনি অন্যের যত্ন নিচ্ছেন, তার নিজেরও বিশ্রাম, মানসিক সমর্থন এবং চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু দায়িত্বের চাপে অনেকেই নিজের সমস্যাকে গুরুত্ব দেন না। মনে করেন, একটু বিশ্রাম নিলে কিংবা দায়িত্ব অন্য কারও হাতে দিলে অসুস্থ স্বজনের যত্নে ঘাটতি হবে। এভাবে নিজের প্রয়োজন উপেক্ষা করতে করতে একসময় তারা শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারেন।
পরিবারে অসুস্থ বা নির্ভরশীল সদস্য থাকলে তার দেখাশোনার দায়িত্ব একজনের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। পরিবারের অন্য সদস্যদেরও দায়িত্ব ভাগ করে নিতে হবে। কেউ ওষুধ ও চিকিৎসার বিষয়টি দেখবেন, কেউ খাবার তৈরি করবেন, কেউ প্রয়োজনীয় কাজে সহায়তা করবেন। আবার পরিচর্যাকারীকে নিয়মিত বিশ্রামের সুযোগ করে দেওয়াও জরুরি।
কর্মক্ষেত্রেও পরিচর্যার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। অসুস্থ স্বজনকে হাসপাতালে নেওয়া কিংবা প্রবীণ মা-বাবার দেখাশোনার জন্য ছুটির প্রয়োজন হতে পারে। নমনীয় কর্মঘণ্টা, পরিচর্যার ছুটি এবং কর্মীদের পারিবারিক পরিস্থিতির প্রতি সহানুভূতিশীল নীতি তাদের চাপ কমাতে সহায়তা করবে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন প্রশিক্ষিত পরিচর্যাকারী তৈরির উদ্যোগ, সাশ্রয়ী হোম কেয়ার সেবা, শিশু পরিচর্যাকেন্দ্র এবং প্রবীণদের জন্য উপযুক্ত সহায়তা ব্যবস্থা। এসব সুবিধা থাকলে পরিবারের সদস্যদের ওপর এককভাবে সব দায়িত্ব বর্তাবে না।
২৯ অক্টোবর পালিত হয় আন্তর্জাতিক যত্ন ও সহায়তা দিবস। দিবসটি মনে করিয়ে দেয়, পরিচর্যার কাজের স্বীকৃতি, ন্যায্য মূল্যায়ন এবং টেকসই সহায়তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা কতটা জরুরি।
যারা প্রতিদিন অন্যের কষ্ট কমাতে নিজের সময় ও শ্রম ব্যয় করেন, তাদেরও একটু বিশ্রাম দরকার, প্রয়োজন সহমর্মিতা ও সহযোগিতা। তাদের পাশে দাঁড়ানোর অর্থ শুধু দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া নয়, বরং তাদের অনুভূতি, সীমাবদ্ধতা ও ব্যক্তিগত প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া।
সময়ের আলো/মহু