কিছু অভ্যাস নীরবেই লিভারের ক্ষতি করে। ছবি : সংগৃহীত অ্যালকোহল পান না করলেও লিভারে চর্বি জমতে পারে। রাতে দেরিতে খাওয়া, প্যাকেটজাত ফলের রস পান করা কিংবা দীর্ঘ সময় বসে কাজ করার মতো অভ্যাসকে অনেকেই তেমন গুরুত্ব দেন না। কিন্তু এসব অভ্যাস নিয়মিত চলতে থাকলে শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে লিভারে চর্বি জমার সম্পর্ক রয়েছে।
অ্যালকোহল পান করেন না- এমন ব্যক্তিদেরও ফ্যাটি লিভারের সমস্যা হতে পারে। প্রাথমিক পর্যায়ে এ রোগের লক্ষণ অনেক সময় বোঝা যায় না। তবে দীর্ঘদিন ধরে লিভারে চর্বি জমে থাকলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রদাহ, লিভারে ক্ষত তৈরি হওয়া এবং সিরোসিসের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।
দৈনন্দিন জীবনের এমন ৫টি অভ্যাস সম্পর্কে সচেতন থাকা জরুরি।
রাতে দেরিতে খাওয়া ও খেয়েই ঘুমিয়ে পড়া
রাতে দেরিতে খাবার খেলেই লিভারের ক্ষতি হবে, এমন নয়। তবে নিয়মিত ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খাওয়া, অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ এবং রাতের বেলায় বারবার স্ন্যাকস খাওয়ার অভ্যাস বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে অতিরিক্ত খাবার, চিনিযুক্ত মিষ্টান্ন এবং পরিশোধিত শর্করাযুক্ত খাবার বেশি খেলে শরীরে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি প্রবেশ করে। দীর্ঘদিন এভাবে চলতে থাকলে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ ঝুঁকি কমাতে রাতের খাবারে পরিমিত পরিমাণে সুষম খাবার রাখা এবং ঘুমানোর আগে কিছুটা সময় বিরতি দেওয়া ভালো। পাশাপাশি প্রতিদিনের খাবারের পরিমাণ ও পুষ্টিগুণের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।
নিয়মিত প্যাকেটজাত ফলের রস পান করা
ফল স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী। তবে, আস্ত ফলের পরিবর্তে নিয়মিত প্যাকেটজাত ফলের রস পান করা সব সময় ভালো বিকল্প নয়। আস্ত ফলে থাকা আঁশ ফলের রসে অনেক কম থাকতে পারে। আবার কিছু প্যাকেটজাত রসে বাড়তি চিনিও মেশানো থাকে। চিনিযুক্ত পানীয় থেকে সহজেই অতিরিক্ত ক্যালরি শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এসব পানীয় পান করার পর অনেক সময় পেট ভরা অনুভূতিও হয় না। ফলে, অন্য খাবার থেকে ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ কমে না। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত চিনি ও ক্যালরি গ্রহণ করলে লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ফলের রসের বদলে আস্ত ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা ভালো। তৃষ্ণা মেটাতে পানিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং চিনিযুক্ত পানীয়ের পরিমাণ কমানোও গুরুত্বপূর্ণ।
কিছুক্ষণ ব্যায়াম করে বাকি সময় বসে থাকা
সকালে হাঁটা বা জিমে ব্যায়াম করা নিঃসন্দেহে উপকারী। কিন্তু দিনের বাকি সময় দীর্ঘক্ষণ বসে থাকলে শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার প্রভাব পুরোপুরি এড়ানো যায় না। দীর্ঘ সময় বসে থাকা শরীরের গ্লুকোজ ও চর্বি প্রক্রিয়াজাত করার স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিনের প্রতি শরীরের সাড়া কমে যাওয়া লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার সঙ্গে সম্পর্কিত। এ কারণে শুধু নির্দিষ্ট সময়ে ব্যায়াম করলেই হবে না, দিনের অন্য সময়গুলোতেও সক্রিয় থাকা প্রয়োজন। কাজের ফাঁকে উঠে দাঁড়ানো, অল্প হাঁটাহাঁটি করা কিংবা নিয়মিত বিরতিতে শরীর নড়াচড়া করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে।
নিয়মিত কম ঘুমানো
পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম, ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণ ও রক্তে শর্করার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। নিয়মিত কম ঘুমালে এসব প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে ওজন নিয়ন্ত্রণ ও শরীরের শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে। দীর্ঘদিন অপর্যাপ্ত ঘুমের সঙ্গে বিপাকীয় সমস্যা এবং ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে এক রাত কম ঘুমালেই লিভারের ক্ষতি হবে, এমনটি নয়। বরং নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি এবং এর সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য অভ্যাস দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগের কারণ হতে পারে। অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের জন্য প্রতি রাতে সাত থেকে নয় ঘণ্টা ঘুমের লক্ষ্য রাখা ভালো।
স্বাভাবিক ওজন মানেই লিভার সুস্থ- এমন ধারণা
শরীরের ওজন স্বাভাবিক থাকলেই লিভারে চর্বি জমার ঝুঁকি নেই, এমন ধারণা সঠিক নয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে কারও কারও ওজন স্বাভাবিক হলেও পেটের ভেতরে বা অভ্যন্তরীণ অঙ্গের চারপাশে অতিরিক্ত চর্বি জমতে পারে। এই চর্বিকে ভিসেরাল ফ্যাট বলা হয়। এটি শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমে প্রভাব ফেলে এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সসহ বিভিন্ন সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে, আপাতদৃষ্টিতে চিকন বা সুস্থ দেখালেও কারও ফ্যাটি লিভার থাকতে পারে। তাই শুধু ওজনের ওপর নির্ভর না করে কোমরের মাপ, রক্তে শর্করা ও কোলেস্টেরলের মাত্রার মতো স্বাস্থ্যসূচকগুলোর দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। তবে, এসব তথ্যের ভিত্তিতে একা ফ্যাটি লিভার শনাক্ত করা যায় না। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শে উপযুক্ত পরীক্ষা করাতে হবে।
সময়ের আলো/মহু