গোলাপি যে নারীদের সবচেয়ে প্রিয় রং, এমন কোনো সর্বজনীন প্রমাণ নেই। ছবি : সংগৃহীত অনেকেই মনে করে থাকেন গোলাপি মেয়েদের এবং নীল, কালো কিংবা সাদা ছেলেদের পছন্দের রং। পোশাক, খেলনা, স্কুলব্যাগ থেকে শুরু করে প্রসাধনীর প্যাকেট- সবখানে গোলাপি রঙের বহুল ব্যবহার এই ধারণাকে আরও প্রতিষ্ঠিত করেছে। কিন্তু সত্যিই কী নারীদের সবচেয়ে প্রিয় রং গোলাপি? নাকি দীর্ঘদিনের সামাজিক চর্চা ও বিপণন কৌশল এই ধারণা তৈরি করেছে?
গবেষণায় দেখা যায়, গোলাপি যে নারীদের সবচেয়ে প্রিয় রং, এমন কোনো সর্বজনীন প্রমাণ নেই। বরং বিভিন্ন গবেষণায় নীল, লাল ও বেগুনিসহ একাধিক রং নারীদের পছন্দের তালিকায় উঠে এসেছে।
২০০৭ সালে কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি আলোচিত গবেষণায় যুক্তরাজ্য ও চীনের তরুণ-তরুণীদের রঙের পছন্দ বিশ্লেষণ করেন নিউক্যাসল ইউনিভার্সিটির গবেষক আনিয়া হার্লবার্ট ও ইয়াজু লিং। এতে ২০ থেকে ২৬ বছর বয়সী ২০৮ জন অংশ নেন।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন রঙের জোড়া থেকে দ্রুত পছন্দের রং বেছে নিতে বলা হয়। ফলাফলে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ উভয়ের মধ্যেই নীল রঙের প্রতি সাধারণ ঝোঁক রয়েছে। তবে, নারীদের পছন্দ তুলনামূলকভাবে লালচে আভার দিকে কিছুটা বেশি ছিল। এ প্রবণতার কারণে গোলাপি, বেগুনি কিংবা লালচে বেগুনি রং নারীদের পছন্দের তালিকায় আসতে পারে।
তবে গবেষকেরা এমন কোনো সিদ্ধান্ত দেননি যে, নারীদের মস্তিষ্কে গোলাপি পছন্দ করার নির্দিষ্ট কোনো প্রবণতা জন্মগতভাবে রয়েছে। তারা রঙের পছন্দে নারী-পুরুষের পার্থক্যের সম্ভাব্য জৈবিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেছিলেন। বিবর্তনগত কারণের বিষয়টিও ছিল একটি অনুমান, চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত সত্য নয়।
তাহলে নারীদের সবচেয়ে প্রিয় রং কোনটি? এর নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নেই। কারণ দেশ, সংস্কৃতি, বয়স ও গবেষণাপদ্ধতির ভিন্নতার সঙ্গে রঙের পছন্দও বদলে যায়।
২০১১ সালে চীনের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় ৩৫৯ জনের রঙের পছন্দ বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে নারীদের পছন্দের তালিকায় প্রথমে ছিল বেগুনি। এরপর ছিল নীল, হলুদ, সবুজ ও গোলাপি। অন্যদিকে পুরুষদের পছন্দের তালিকায় প্রথমে ছিল নীল, এরপর সবুজ ও লাল। গবেষণাটিতে নারীরা পুরুষদের তুলনায় গোলাপি, বেগুনি ও সাদা রং বেশি পছন্দ করেছেন বলে দেখা যায়।
পোল্যান্ড ও পাপুয়া নিউগিনির ইয়ালি জনগোষ্ঠীর মানুষের রঙের পছন্দ নিয়ে আরেকটি গবেষণায়ও ভিন্ন চিত্র পাওয়া যায়। সেখানে দুই সংস্কৃতির নারীদের মধ্যে মিলিয়ে ২১ শতাংশ লালকে তাদের পছন্দের রং হিসেবে বেছে নেন। পুরুষদের মধ্যে নীল ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়, যা বেছে নেন ১৯ শতাংশ।
গোলাপির সঙ্গে নারীদের সম্পর্ক তৈরি হলো কীভাবে?
গোলাপি রঙের সঙ্গে নারীত্বের সম্পর্ক গড়ে ওঠার পেছনে সংস্কৃতি, সামাজিক অভ্যাস ও বাজারজাতকরণের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করেন গবেষকেরা। বর্তমানে গোলাপিকে কোমলতা ও নারীত্বের প্রতীক হিসেবে দেখা হলেও ইতিহাসে এই সম্পর্ক সব সময় এমন ছিল না।
ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, উনিশ ও বিশ শতকের শুরুর দিকে পশ্চিমা সমাজে শিশুদের পোশাকে গোলাপি ও নীল- দুই রঙেরই ব্যবহার ছিল। তবে কোন রং ছেলেদের আর কোনটি মেয়েদের জন্য উপযুক্ত, সে বিষয়ে তখন সর্বত্র একই ধারণা প্রচলিত ছিল না। ১৯১৮ সালের একটি মার্কিন বাণিজ্যবিষয়ক প্রকাশনায় বরং গোলাপিকে ছেলেদের এবং নীলকে মেয়েদের জন্য উপযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়েছিল। বিভিন্ন দোকান ও প্রকাশনায় এ বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন মতও পাওয়া যায়।
পরবর্তী সময়ে পোশাক, খেলনা, বিজ্ঞাপন ও বিপণন কৌশলের মাধ্যমে গোলাপির সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। বিশেষ করে বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে এই রঙের বিভাজন স্পষ্ট হতে থাকে। ফলে ‘গোলাপি মেয়েদের রং’-এমন ধারণা শুধু প্রাকৃতিক পছন্দের ভিত্তিতে তৈরি হয়নি; সামাজিক অভ্যাস ও ব্যবসায়িক প্রচারও এতে ভূমিকা রেখেছে।
‘পিঙ্ক অ্যান্ড ব্লু : টেলিং দ্য বয়েজ ফ্রম দ্য গার্লস ইন আমেরিকা’ বইয়ের লেখক জো বি. পাওলেত্তি ২০১১ সালে স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, একসময় শিশুদের পোশাকে লিঙ্গভিত্তিক রঙের বিভাজন এতটা স্পষ্ট ছিল না। ছেলে-মেয়ে উভয়েই সাদা পোশাক পরত, কারণ সাদা কাপড় ব্লিচ দিয়ে সহজে পরিষ্কার করা যেত। পরে শিশুদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করার সামাজিক প্রবণতা বাড়ার সঙ্গে পোশাকের রংও পরিচয়ের অংশ হয়ে ওঠে।
গোলাপির প্রতি পছন্দ জন্মগত, নাকি সামাজিক শিক্ষা?
এ প্রশ্নের উত্তর এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত নয়। কিছু গবেষকের ধারণা, রঙের প্রতি নারী-পুরুষের পছন্দের পার্থক্যের পেছনে জৈবিক কারণ থাকতে পারে। ২০০৭ সালের হার্লবার্ট ও লিংয়ের গবেষণায়ও এমন একটি সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছিল। তবে, বিভিন্ন সংস্কৃতিতে রঙের পছন্দের ভিন্নতা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের গুরুত্বও সামনে আনে।
২০২১ সালে চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট সাময়িকীতে প্রকাশিত একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় নারী-পুরুষের রঙের পছন্দের ক্ষেত্রে জৈবিক ও সাংস্কৃতিক- দুই ধরনের ব্যাখ্যা নিয়েই আলোচনা করা হয়।
শিশুরা ছোটবেলা থেকেই পরিবার, পোশাক, খেলনা, কার্টুন ও বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কোন রং মেয়েদের আর কোনটি ছেলেদের- এমন সামাজিক সংকেত পেতে থাকে। এসব অভিজ্ঞতা তাদের রঙের পছন্দ গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে, বড় হওয়ার পর কোনো নারীর গোলাপির প্রতি বিশেষ আকর্ষণ তৈরি হলে সেখানে ব্যক্তিগত রুচির পাশাপাশি সামাজিক শিক্ষার প্রভাবও থাকতে পারে।
সূত্র : ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক, স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ও ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন
সময়ের আলো/মহু