ব্যবসায়িক মন্দা ও লোকসানের কারণে রাজধানীর শান্তিনগর-কাকরাইল মোড়ে অবস্থিত কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি শপিং কমপ্লেক্স বন্ধ হয়ে গেছে। একসময় অভিজাত শপিং মল হিসেবে পরিচিত এবং বহু মানুষের স্মৃতিবিজড়িত এই বিপণিবিতান দীর্ঘ ২৮ বছরের পথচলা শেষ করল। ১ অক্টোবর থেকে পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয় শপিংমলটি।
১৯৯৮ সালে চালু হওয়া মার্কেটটিতে পোশাক, জুতা, প্রসাধনী, উপহারসামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান ও ব্র্যান্ডের শোরুম ছিল। চতুর্থ তলায় ছিল ফুড কোর্ট ও বাগান। ২০ তলা ভবনটির নিচতলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত শপিং মল হিসেবে ব্যবহৃত হতো। বাকি তলাগুলো ছিল আবাসিক।
শুরুর দিকে মার্কেটটিতে ১৯৮টি দোকান থাকলেও ব্যবসায়িক মন্দায় ধীরে ধীরে দোকান কমতে থাকে। ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বন্ধ হওয়ার আগে সেখানে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি দোকান চালু ছিল। দীর্ঘদিন লোকসান গুনতে গুনতে শেষ পর্যন্ত মার্কেটটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন সংশ্লিষ্টরা।
শপিংমল বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষাদ বার্তা। ছবি : সংগৃহীত
এ মার্কেট ঘিরে রয়েছে বহু মানুষের স্মৃতি। কারও প্রথম স্কুলব্যাগ কেনার, কারও প্রথম এস্কেলেটরে ওঠার কিংবা ফুড কোর্ট ও বাগানে পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে কাটানো রঙিন সময় জমা ছিল মার্কেটটিতে। তেমনই একজন ফাহিম উবনে সারওয়ার। মার্কেট বন্ধের ঘোষণায় তিনি ব্যথিত হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লেখেন, শান্তিনগরের কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি মার্কেটটা বন্ধ হয়ে গেছে। বসুন্ধরা সিটি বা যমুনা ফিউচার পার্ক চালুর আগে এটি ছিল পশ একটা মার্কেট।
স্মৃতিচারণা করে ফাহিম লেখেন, এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে ঢাকায় বড় ফুফুর বাসাবোর বাসায় এসেছিলাম বেড়াতে, ২০০৩ সালের দিকে। তখন কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির রমরমা অবস্থা। বরিশালে ফিরে যাওয়ার আগে একদিন বিকালে শিবলী ভাইয়া ও আনু ফুফু আমাকে নিয়ে গেল এই মার্কেটে। শার্ট-প্যান্ট কিনে দিলো। জুস-বার্গার খেয়ে বাসায় চলে আসলাম। বিশাল মার্কেট, সেন্ট্রাল এসি, এক্সেলেটর, লিফট -এ সবকিছু তখন বিস্মিত করেছিল মফস্বলের সেই কিশোর ছেলেটাকে।
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘কিন্তু ঢাকায় আসার পরে ওদিকে আর যাওয়াই হয়নি। ততদিনে বসুন্ধরা সিটি জমজমাট। এক জায়গায় ফোন, জুতা-জামা সব পাওয়া যায়। পান্থপথের এক বসুন্ধরা সিটি যে কত মার্কেট খেয়ে দিলো ঢাকা শহরের। পারল না শুধু গাউছিয়া ও নিউ মার্কেটের সঙ্গে।’
স্মৃতিবিজড়িত শপিংমল বন্ধের খবরে একইভাবে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন কর্পোরেট চাকুরিজীবী খন্দকার ওবায়দুল্লাহ। তিনি বলেন, ‘আমার বাসা মুগদাতে। যখন সিটি কলেজে ভর্তি হই, তখন কলেজ ড্রেসটি বানিয়েছিলাম কর্ণফুলি গার্ডেন সিটি থেকে। আমার কলেজের স্মৃতির সঙ্গে শপিংমলটি জড়িয়ে গেছে তখন থেকেই। যখনই কলেজের কোনো পুরনো কথা মনে পড়ে, একইসঙ্গে শপিংমলটির কথাও মনে পড়ে। হঠাৎ স্মৃতিময় জায়গাটি এভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়াতে মন খারাপ হচ্ছে।’
মার্কেটের ব্যবসায়ীরা বলছেন, গত এক দশকে ধাপে ধাপে পতন হয়েছে এই শপিং মলের। মোটা দাগে এর জন্য ৪টি কারণ দায়ী বলে মনে করছেন তারা। প্রথমত, শান্তিনগর ফ্লাইওভার নির্মানকালীন সময়ে ক্রেতা কমে আসা। দ্বিতীয়ত, কোভিডকালীন ব্যবসায়ীক মন্দা। তৃতীয়ত, ভালো ব্যবসায়ীদের চলে যাওয়া ও চতুর্থত কিছু অসৎ ব্যবসায়ীর প্রতারণা। ফলে ক্রেতা কমে যাওয়া, সার্ভিস চার্জ না পাওয়া এবং বিদ্যুৎ বিল ৫০ লাখ টাকার বেশি বকেয়া পড়ার পর টানা লোকসানের মুখে পড়ে কর্তৃপক্ষ। অবশেষে দোকান মালিক সমিতি সম্মিলিতভাবে কর্ণফুলি গ্রুপের হাত ধরে তৈরি হওয়া এই স্মৃতিময় মার্কেট বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।