গ্রাফিক : সময়ের আলোআমাদের অনেকেরই ধারণা, ঘর সুন্দর করে সাজাতে হলে প্রয়োজন দামি আসবাব, নানা ধরনের শোপিস, বাহারি পর্দা কিংবা নিত্য নতুন গৃহসজ্জার উপকরণ। তাই ঘরের সৌন্দর্য বাড়ানোর জন্য প্রতিনিয়ত চলে কেনাকাটা। পুরোনো জিনিসের সঙ্গে যোগ হয় নতুন জিনিস। একসময় ঘর ভরে ওঠে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রীতে। অথচ এত কিছুর মধ্যেও কোথাও যেন স্বস্তির অভাব থেকে যায়। ঘর পরিষ্কার রাখতে সময় বেশি লাগে, জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার ঝামেলা বাড়ে, আবার প্রয়োজনের সময় দরকারি জিনিসটি খুঁজে পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে।
অন্যদিকে, এমন অনেক ঘর আছে, যেখানে আসবাবের সংখ্যা কম, সাজসজ্জাও সাধারণ। কিন্তু সেখানে ঢুকলেই একধরনের প্রশান্তি অনুভব করা যায়। খোলামেলা পরিবেশ, গোছানো আসবাব, জানালা দিয়ে আসা আলো আর প্রয়োজনীয় জিনিসের সুশৃঙ্খল বিন্যাস ঘরটিকে করে তোলে আরামদায়ক। এর পেছনে রয়েছে একটি সহজ ভাবনা, কম জিনিসে বেশি স্বস্তি।
প্রয়োজন বুঝে ঘর সাজানো
ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে প্রথমেই ভাবতে হবে, কোন জিনিসটি সত্যিই প্রয়োজন আর কোনটি শুধু দেখতে ভালো বলে কেনা হচ্ছে। অনেক সময় বিজ্ঞাপন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা সাজানো ঘরের ছবি কিংবা অন্যের জীবনযাপনের সঙ্গে তুলনা করে আমরা নানা জিনিস কিনে ফেলি। কিন্তু সবকিছু নিজের ঘরের সঙ্গে মানানসই হয় না। ফলে ঘরের জায়গা কমে, পরিষ্কার করার কাজ বাড়ে এবং অপ্রয়োজনীয় খরচও হয়।
ইন্টেরিয়র ডিজাইনার ইসরাত জাহান বলেন, একটি ছোট বসার ঘরে আরামদায়ক সোফা, প্রয়োজনমতো বসার ব্যবস্থা, ছোট একটি সেন্টার টেবিল এবং এক-দুটি গাছ দিয়েই সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব। এর সঙ্গে যদি থাকে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, তা হলে ঘরটি আরও খোলামেলা দেখাবে। সেখানে একাধিক টেবিল, বড় শোপিস কিংবা অতিরিক্ত আসবাব রাখার প্রয়োজন নেই। কম জিনিসে ঘর সাজানোর অর্থ একেবারে ফাঁকা ঘর তৈরি করা নয়। বরং ঘরের আয়তন, পরিবারের সদস্যসংখ্যা, দৈনন্দিন অভ্যাস এবং প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে জিনিসপত্র নির্বাচন করা।
অপ্রয়োজনীয় জিনিস কমানোর অভ্যাস
ঘর গোছানোর কাজ শুরু করতে চাইলে এক দিনেই সবকিছু বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং একটি আলমারি, রান্নাঘরের একটি তাক বা বসার ঘরের একটি কোণ দিয়ে শুরু করা যায়। দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়নি, ভবিষ্যতেও প্রয়োজন হওয়ার সম্ভাবনা কম, এমন জিনিস আলাদা করে রাখা যেতে পারে। ভালো অবস্থায় থাকা ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী অন্যকে দিয়ে দেওয়া যায়। নষ্ট জিনিস মেরামত করা সম্ভব কি না, সেটিও বিবেচনা করা উচিত।
অনেকের ঘরে একই ধরনের একাধিক জিনিস জমে থাকে। যেমন— প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কাপ, প্লেট, বিছানার চাদর, কুশন, ফুলদানি কিংবা রান্নাঘরের সরঞ্জাম। এগুলোর কিছু নিয়মিত ব্যবহার করা হলেও বাকিগুলো বছরের পর বছর আলমারিতে পড়ে থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী সংখ্যা কমিয়ে আনলে জায়গা যেমন বাঁচে, তেমনি জিনিসপত্রের যত্ন নেওয়াও সহজ হয়।
গৃহিণীর কাছে গোছানো ঘরের স্বস্তি
সংসারের দৈনন্দিন কাজের সঙ্গে ঘর পরিষ্কার রাখা ও জিনিসপত্র গুছিয়ে রাখার বিষয়টি গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। রান্নাঘরে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সরঞ্জাম থাকলে রান্নার সময় কাজের জায়গা কমে যায়। আবার আলমারিতে অতিরিক্ত পোশাক জমে থাকলে প্রয়োজনের পোশাকটি খুঁজে পেতেও সময় লাগে। তাই সংসারের কাজ সহজ করতে জিনিসপত্রের সংখ্যা ও বিন্যাসের দিকে নজর দেওয়া জরুরি।
গৃহিণী কাজী পারভীন বলেন, ঘর গোছানোর দায়িত্ব শুধু একজনের ওপর থাকা উচিত নয়। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য নিজের ব্যবহৃত জিনিস নির্দিষ্ট স্থানে রাখার অভ্যাস করলে কাজ অনেকটাই সহজ হয়। শিশুদের খেলনা ব্যবহারের পর গুছিয়ে রাখা, বড়দের পোশাক ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্দিষ্ট স্থানে রাখা এবং পরিবারের সবার অংশগ্রহণে ঘর পরিষ্কার করার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে একজনের ওপর কাজের চাপ কমে। পাশাপাশি পরিবারের সদস্যদের মধ্যেও দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়।
ছোট ঘরেও তৈরি হতে পারে প্রশান্তি
শহরের বাসাবাড়িতে জায়গার সীমাবদ্ধতা থাকে। বিশেষ করে ছোট ফ্ল্যাটে বসার ঘর, খাবার জায়গা ও শোবার ঘরের মধ্যে ভারসাম্য রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এ ক্ষেত্রে জিনিস রাখার জায়গা আছে এমন খাট, ভাঁজ করে রাখা যায় এমন টেবিল কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করা যায় এমন ছোট টুল ঘরের জায়গা বাঁচাতে সাহায্য করে।
দেয়ালের রং ও পর্দা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও হালকা রং ব্যবহার করলে ঘর তুলনামূলক উজ্জ্বল ও খোলামেলা দেখাতে পারে। তবে সবকিছু একই রঙের হতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। পছন্দের রং, একটি সুন্দর ছবি কিংবা ছোট একটি গাছ ঘরে ব্যক্তিগত রুচির প্রকাশ ঘটাতে পারে। জানালার সামনে অপ্রয়োজনীয় আসবাব না রাখলে প্রাকৃতিক আলো ঘরে প্রবেশ করতে সুবিধা হয়। দিনের বেলায় পর্যাপ্ত আলো থাকলে
কৃত্রিম আলোর ওপর নির্ভরতা কমতে পারে। একই সঙ্গে ঘরের বাতাস চলাচলের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
ঘর সাজানোর ক্ষেত্রে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার, সুন্দর পরিবেশ তৈরির জন্য প্রতিটি কোণ সাজিয়ে তোলার প্রয়োজন নেই। কোথাও কিছুটা খালি জায়গা থাকলেও সমস্যা নেই। বরং সেই জায়গা ঘরের সামগ্রিক বিন্যাসকে ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলতে পারে।
কেনাকাটায় সচেতনতা, জীবনেও স্বস্তি
কম জিনিসে স্বস্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সচেতন কেনাকাটা। কোনো কিছু কেনার আগে নিজেকে কয়েকটি প্রশ্ন করা যেতে পারে। জিনিসটি কি সত্যিই প্রয়োজন? বাড়িতে এর বিকল্প কিছু আছে কি? এটি রাখার উপযুক্ত জায়গা আছে? নিয়মিত ব্যবহার করা হবে, নাকি কিছু দিন পরই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে? এই প্রশ্নগুলো অভ্যাসে পরিণত হলে হঠাৎ করে জিনিস কেনার প্রবণতা কমতে পারে। ফলে অর্থের অপচয় যেমন কমবে, তেমনি ঘরও অপ্রয়োজনীয় সামগ্রীতে ভরে উঠবে না।
মানসিক স্বস্তির সঙ্গে ঘরের সম্পর্ক
ঘরের পরিবেশ আমাদের দৈনন্দিন অনুভূতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অগোছালো পরিবেশে প্রয়োজনীয় জিনিস খুঁজে পেতে বারবার সময় নষ্ট হয়। কাজের চাপও বেড়ে যেতে পারে। বিপরীতে, জিনিসপত্র নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা থাকলে দৈনন্দিন কাজের মধ্যে শৃঙ্খলা বজায় রাখা সহজ হয়।
তবে মনে রাখতে হবে, সব সময় নিখুঁতভাবে সাজানো ঘরই স্বস্তির একমাত্র শর্ত নয়। বাড়িতে শিশু থাকলে খেলনা ছড়িয়ে থাকতে পারে, ব্যস্ত দিনে কাপড় গুছিয়ে রাখার সময় নাও মিলতে পারে। তাই ঘরকে এমনভাবে সাজানো উচিত, যাতে তা পরিবারের জীবনযাপনের সঙ্গে মানানসই হয়। পরিচ্ছন্নতার জন্য অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা তৈরি করে, এমন কোনো ব্যবস্থা স্বস্তিদায়ক নয়।
একইভাবে, কম জিনিস ব্যবহার করলেই যে প্রত্যেকের জীবন সহজ হয়ে যাবে, তা-ও নয়। কারও বই পড়ার অভ্যাস আছে, কারও রান্নার সরঞ্জাম বেশি প্রয়োজন, আবার কারও ঘরে শিশুদের খেলার জন্য আলাদা জায়গা দরকার। তাই অন্যের জীবনযাপনের ধরন অনুকরণ না করে নিজের প্রয়োজন বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়াই ভালো।
স্বস্তির শুরু ছোট পরিবর্তনে
কম জিনিসে বেশি স্বস্তি পেতে বড় কোনো পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন ব্যবহৃত জিনিস নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা এড়িয়ে চলা, ঘরের আলো-বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কাজ ভাগ করে নেওয়ার মতো ছোট অভ্যাস থেকেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে। সপ্তাহে এক দিন ঘরের একটি অংশ গুছিয়ে রাখা, কেনাকাটার আগে তালিকা তৈরি করা এবং নতুন জিনিস আনার আগে পুরোনো জিনিসের ব্যবহার নিশ্চিত করার অভ্যাসও কাজে আসতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ঘর যেন শুধু দেখানোর জন্য সুন্দর না হয় বরং সেখানে বসবাসকারী মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সহজ করে তোলে।
সময়ের আলো/এসএকে