ডা. মো. হাসনাত
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে সুস্থ থাকবে হৃদযন্ত্র। গ্রাফিক : সময়ের আলো রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে তা অনেক সময় শরীরে কোনো লক্ষণ প্রকাশ করে না। অথচ দীর্ঘদিন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে না থাকলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই কোলেস্টেরলকে শুধু একটি পরীক্ষার রিপোর্টের বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রম, ওজন নিয়ন্ত্রণ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার মাধ্যমে শুরু থেকেই এ বিষয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
কোলেস্টেরল কী এবং কেন প্রয়োজন : কোলেস্টেরল হলো এক ধরনের চর্বিজাতীয় পদার্থ, যা শরীরের স্বাভাবিক কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন। কোষের আবরণ তৈরি, কিছু হরমোন উৎপাদন এবং ভিটামিন ডি তৈরির প্রক্রিয়ায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শরীরের প্রয়োজনীয় কোলেস্টেরলের বেশিরভাগই যকৃতে তৈরি হয়। পাশাপাশি আমরা যেসব খাবার খাই, সেগুলোর মাধ্যমেও শরীরে কোলেস্টেরল প্রবেশ করতে পারে।
কেন বাড়ে কোলেস্টেরল : কোলেস্টেরল বেড়ে যাওয়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। অতিরিক্ত চর্বি ও ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার খাওয়া, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম না করা, অতিরিক্ত ওজন, ধূমপান এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এ ছাড়া থাইরয়েডের সমস্যা, কিছু ওষুধ এবং বংশগত কারণেও কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে যেতে পারে।
অনেকের ধারণা, কেবল বেশি তেল-চর্বিযুক্ত খাবার খেলেই কোলেস্টেরল বাড়ে। বাস্তবে খাবারের ধরন, শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও জীবনযাপনের সম্মিলিত প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ এলডিএল কোলেস্টেরল বাড়াতে পারে।
লক্ষণ না থাকলেও পরীক্ষা জরুরি : রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। তাই সুস্থ বোধ করলেও প্রয়োজন অনুযায়ী লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করানো উচিত। এ পরীক্ষায় সাধারণত মোট কোলেস্টেরল, এলডিএল, এইচডিএল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা জানা যায়। কত বয়সে এবং কত ঘন ঘন পরীক্ষা করতে হবে, তা ব্যক্তির বয়স, পারিবারিক ইতিহাস, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগের ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে। রিপোর্টে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি পাওয়া গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
নিয়ন্ত্রণ রাখবেন যেভাবে : কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে প্রথম পদক্ষেপ হলো খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা। খাবারে শাকসবজি, ফল, ডাল, ওটস, লাল চাল বা আটার রুটি এবং আঁশসমৃদ্ধ খাবার বাড়াতে হবে। মাছ, বাদাম ও পরিমিত পরিমাণে স্বাস্থ্যকর উদ্ভিজ্জ তেল খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
অন্যদিকে অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, প্রক্রিয়াজাত মাংস, ডালডা, বনস্পতি এবং ট্রান্স ফ্যাটসমৃদ্ধ খাবার কমাতে হবে। ভাজাপোড়া ও ফাস্টফুড নিয়মিত খাওয়ার অভ্যাস পরিহার করা ভালো। নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার ব্যায়াম, যেমন দ্রুত হাঁটার অভ্যাস উপকারী। পাশাপাশি ওজন নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান বর্জন এবং পর্যাপ্ত ঘুম সামগ্রিক হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করে।
কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণের মূল কথা হলো, অসুস্থ হওয়ার অপেক্ষা না করে আগেই সচেতন হওয়া। সঠিক খাদ্যাভ্যাস, নিয়মিত ব্যায়াম, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চললে হৃদরোগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
লেখক : ক্লিনিক্যাল কো-অর্ডিনেশন বিভাগ, কাউন্টেস অব চেস্টার হাসপাতাল, ইউকে
সময়ের আলো/প্রিন্ট/মহু