কেউ তোতলা হলে তাকে নিয়ে বিদ্রুপ না করে তার প্রতি আন্তরিক আচরণ করুন। ছবি : সংগৃহীত কেউ যদি তোতলা হন, অর্থাৎ কারও যদি কথা বলার সাবলীলতা না থাকে, স্বাভাবিক ছন্দ ব্যাহত হয়, মানুষ তাকে নিয়ে হাসাহাসি ও ঠাট্টা-বিদ্রূপ করেন। কথা বলার এই সমস্যার কারণে অনেক মেধাবী ও দক্ষ মানুষও অবমূল্যায়নের শিকার হন। আত্মবিশ্বাস হারানোর পাশাপাশি শিক্ষা, কর্মজীবন ও ব্যক্তিগত সম্পর্কেও তাদের নানা বাধার মুখে পড়তে হয়। কিন্তু এটি কী সমাধানযোগ্য কোনো সমস্যা?
কেউ কেউ পরিচিত পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে কথা বলতে পারলেও অপরিচিত মানুষের সামনে, শ্রেণিকক্ষে উপস্থাপনার সময় কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কারও সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রে বেশি আটকে যান। নিজের নাম, বাবার নাম, ঠিকানা বা ফোন নম্বর বলার সময়ও কারও কারও সমস্যা বেড়ে যেতে পারে। আবার একই ব্যক্তি সব সময় একই শব্দে আটকে যান না। পরিস্থিতি অনুযায়ী সমস্যার তীব্রতা বদলাতে পারে। কারও ক্ষেত্রে গান গাওয়ার সময় তোতলামি কমে যায় বা থাকে না।
কথা বলার স্বাভাবিক প্রবাহে ব্যাঘাত ঘটানো এই সমস্যার পেছনে মস্তিষ্কের কথা বলার প্রক্রিয়া, বংশগত প্রবণতা ও অন্যান্য বিকাশগত বিষয় ভূমিকা রাখতে পারে। উদ্বেগ ও মানসিক চাপ অনেকের ক্ষেত্রে তোতলামি বাড়িয়ে দিতে পারে।
যেসব বিষয় তোতলামি বাড়াতে পারে
- নতুন পরিবেশে বা অপরিচিত মানুষের সামনে কথা বলা।
- শ্রেণিকক্ষে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কিংবা উপস্থাপনা করা।
- মৌখিক পরীক্ষা ও চাকরির সাক্ষাৎকারে অংশ নেওয়া।
- প্রচণ্ড ভয়, উদ্বেগ, রাগ বা মানসিক চাপে থাকা।
- শারীরিক ক্লান্তি কিংবা দুর্বলতার মধ্যে কথা বলা।
- অন্যের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া বা উপহাসের আশঙ্কা করা।
এছাড়া, শৈশবে কথা বলার সময় অতিরিক্ত চাপ দেওয়া, ভুলের জন্য বকাঝকা করা কিংবা তোতলামি নিয়ে হাসাহাসি করা শিশুর উদ্বেগ বাড়াতে পারে। তাই শিশুর কথা বলার সমস্যাকে কেন্দ্র করে শাস্তি দেওয়া বা তাকে দ্রুত কথা বলতে বাধ্য করা উচিত নয়।
তোতলামি দূর করতে করণীয়
তোতলামি সমাধানের পরামর্শক রতন কুমার পালের মতে, তোতলামি নিয়ন্ত্রণে আনা এবং কথা বলার সাবলীলতা বাড়ানোর জন্য সঠিক মূল্যায়ন ও প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে বাক্ ও ভাষা চিকিৎসক বা স্পিচ-ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। ব্যক্তির বয়স, সমস্যার ধরন ও তীব্রতা অনুযায়ী চিকিৎসা ও অনুশীলনের পদ্ধতি নির্ধারণ করা হয়।
নিয়মিত অনুশীলন, কথা বলার গতি নিয়ন্ত্রণ, শ্বাস-প্রশ্বাসের সমন্বয় এবং যোগাযোগের কৌশল শেখা অনেকের ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে। তবে, কয়েক দিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সবার তোতলামি সম্পূর্ণ দূর হয়ে যাবে- এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায় না। উন্নতির জন্য সময়, ধৈর্য ও ধারাবাহিকতা প্রয়োজন।
যত দ্রুত সমস্যাটি শনাক্ত করে উপযুক্ত সহায়তা নেওয়া যায়, ততই ভালো। তবে, যেকোনো বয়সেই সহায়তা নেওয়া সম্ভব। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, তোতলামিতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে নিজের সমস্যা নিয়ে লজ্জিত না করে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলার পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া।
শিশুর মধ্যে তোতলামির লক্ষণ দেখা দিলে তাকে বকাঝকা করা, কথা বলার সময় বারবার সংশোধন করা কিংবা জোর করে দ্রুত কথা বলানোর চেষ্টা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। ধৈর্য ধরে শিশুর কথা শুনতে হবে এবং তাকে নিজের বক্তব্য শেষ করার যথেষ্ট সময় দিতে হবে।
একই সঙ্গে অবৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বা তথাকথিত টোটকার ওপর নির্ভর না করে যোগ্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। পরিবারের পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজকেও তোতলামিতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের প্রতি ইতিবাচক ও সহানুভূতিশীল আচরণ করতে হবে।
সময়ের আলো/মহু