গহনা ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় সোনা

সময়ের আলো ডেস্ক

ফিচার

সোনা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গহনা, বিয়ে কিংবা ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারের ছবি। তবে মূল্যবান এই ধাতুর ব্যবহার শুধু সাজসজ্জার মধ্যেই

2026-10-21T12:00:51+00:00
2026-10-21T12:11:04+00:00
 
  বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬,
৫ কার্তিক ১৪৩৩
বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬
ফিচার
গহনা ছাড়াও যেসব কাজে ব্যবহার হয় সোনা
সময়ের আলো ডেস্ক
প্রকাশ: বুধবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৬, ১২:০০ পিএম  আপডেট: ২১.১০.২০২৬ ১২:১১ পিএম
সোনার রয়েছে বহুমুখী ব্যবহার। ছবি : এআই কোলাজ
সোনা বলতেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে গহনা, বিয়ে কিংবা ঐতিহ্যবাহী অলঙ্কারের ছবি। তবে মূল্যবান এই ধাতুর ব্যবহার শুধু সাজসজ্জার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খাবার সাজানো থেকে শুরু করে স্মার্টফোন, কম্পিউটার, মহাকাশযান, চিকিৎসা ও দাঁতের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয় সোনা। এমনকি বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ সোনা মজুত রাখে।


খাবার সাজাতেও লাগে সোনা

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মিষ্টি, চকলেট, কেক, আইসক্রিমসহ নানা বিলাসবহুল খাবার সাজাতে ব্যবহার করা হয় খাওয়ার উপযোগী সোনার পাত, যা ‘এডিবল গোল্ড লিফ’ নামে পরিচিত। ইউরোপীয় ইউনিয়নে খাবারে ব্যবহারের জন্য সোনা ‘ই১৭৫’ নামে অনুমোদিত ফুড অ্যাডিটিভ।

খাবারে ব্যবহৃত সোনা সাধারণত ২২ থেকে ২৪ ক্যারেট বিশুদ্ধতার হয়ে থাকে। তবে, এতে বিশেষ কোনো পুষ্টিগুণ নেই। ধাতব সোনা মানুষের পরিপাকতন্ত্রে উল্লেখযোগ্যভাবে শোষিত হয় না। তাই খাবারে এর ব্যবহার মূলত সৌন্দর্য ও বিলাসিতা বাড়ানোর জন্য, পুষ্টির জন্য নয়।


বিশেষ করে দামি হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাবার ও পানীয় আকর্ষণীয় করে তুলতে সোনার পাত, ছোট টুকরা, গুঁড়া কিংবা ক্ষুদ্র পাপড়ির মতো অংশ ব্যবহার করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় মিষ্টি সাজাতে সোনা ও রুপার পাত ব্যবহারের দীর্ঘদিনের প্রচলন রয়েছে। এ ধরনের পাত সাধারণভাবে ‘ভারক’ বা ‘ওয়ার্ক’ নামে পরিচিত।

খাবারে সোনার ব্যবহার নিয়ে স্বাস্থ্যগত প্রভাবের গবেষণাও হয়েছে। ২০২৩ সালে পার্টিকল অ্যান্ড ফাইবার টক্সিকোলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত ইঁদুরের ওপর ৯০ দিনের এক গবেষণায় দেখা যায়, ‘ই১৭৫’ খাওয়ানোর পর তাদের যকৃৎ, প্লীহা বা অন্ত্রে সরাসরি কোনো ক্ষতি পাওয়া যায়নি। তবে, অন্ত্রের জীবাণুর পরিমাণ ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থায় কিছু পরিবর্তন দেখা যায়। মানুষের স্বাভাবিক গ্রহণমাত্রার চেয়ে বেশি সোনা খাওয়ানো স্ত্রী ইঁদুরের অন্ত্রে হালকা প্রদাহও দেখা গিয়েছিল।


মোবাইল-কম্পিউটারের ভেতরেও থাকে সোনা

স্মার্টফোন, কম্পিউটার, ট্যাবলেটসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক যন্ত্রের ভেতরে অল্প পরিমাণে সোনা ব্যবহার করা হয়। সার্কিট বোর্ড, কানেক্টর, সুইচ ও বৈদ্যুতিক সংযোগস্থলে এ ধাতুর ব্যবহার রয়েছে।

সোনার মধ্য দিয়ে সহজে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হয় এবং এটি সহজে ক্ষয় বা মরিচা ধরে না। ফলে, বৈদ্যুতিক সংযোগ দীর্ঘদিন কার্যকর রাখতে সোনা বেশ উপযোগী। একটি স্মার্টফোনে সোনার পরিমাণ খুব সামান্য হলেও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ইলেকট্রনিক পণ্য তৈরি হওয়ায় এই খাতে সোনার সম্মিলিত ব্যবহার উল্লেখযোগ্য। এ কারণে পুরোনো মোবাইল ফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ইলেকট্রনিক বর্জ্য থেকে সোনা সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহারের ব্যবস্থাও গড়ে উঠেছে।


মহাকাশ গবেষণায় সোনার ব্যবহার

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও সোনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার তথ্য অনুযায়ী, সোনা আলো ও তাপ বিকিরণ প্রতিফলিত করতে পারে এবং সহজে এর উজ্জ্বলতা নষ্ট হয় না। এসব বৈশিষ্ট্যের কারণে জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের আয়নাগুলোতে সোনার অত্যন্ত পাতলা প্রলেপ দেওয়া হয়েছে।

বিশেষ করে ইনফ্রারেড আলো প্রতিফলনে সোনা কার্যকর। এই আলো শনাক্ত করার মাধ্যমেই জেমস ওয়েব মহাবিশ্বের দূরবর্তী নক্ষত্র, ছায়াপথসহ বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু পর্যবেক্ষণ করে।

মহাকাশচারীদের হেলমেটেও সোনা ব্যবহার করা হয়। হেলমেটের সামনে চোখ-মুখ ঢেকে রাখা স্বচ্ছ অংশে সোনার পাতলা প্রলেপ থাকে। এটি সানগ্লাসের মতো কাজ করে সূর্যের তীব্র আলো ও ক্ষতিকর বিকিরণ থেকে মহাকাশচারীদের সুরক্ষা দিতে সাহায্য করে। এ ছাড়া মহাকাশযানের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও বৈদ্যুতিক সংযোগেও সোনা ব্যবহৃত হয়।


রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসায় সোনা

চিকিৎসাবিজ্ঞানে সোনার ব্যবহার নতুন নয়। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ‘গোল্ড সল্ট’ নামে পরিচিত সোনার কিছু যৌগ একসময় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হতো। তবে, আরও কার্যকর ওষুধ আসায় এ ক্ষেত্রে সোনার ব্যবহার কমেছে।

বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে সোনার নতুন ব্যবহার নিয়ে গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যানসার ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, অতি ক্ষুদ্র ‘গোল্ড ন্যানোপার্টিকল’ ব্যবহার করে রোগ শনাক্ত, শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেওয়া এবং ক্যানসার নির্ণয় ও চিকিৎসার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

রোগ নির্ণয়ের কিছু পরীক্ষাতেও সোনার ন্যানোকণা ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে দ্রুত পরীক্ষার কিছু কিটে ফলাফল বোঝাতে যে রঙিন রেখা দেখা যায়, তা তৈরিতে এসব কণা ভূমিকা রাখে।


দাঁতের চিকিৎসায়ও ব্যবহৃত হয় সোনা

দাঁত মেরামত ও পুনর্গঠনের কাজে দীর্ঘদিন ধরে সোনা এবং সোনার সংকর ধাতু ব্যবহার করা হচ্ছে। আমেরিকান ডেন্টাল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, সহজে ক্ষয় না হওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে দাঁতের চিকিৎসায় এই ধাতু উপযোগী। তবে, সোনার উচ্চমূল্য এবং বিকল্প উপকরণের সহজলভ্যতার কারণে বর্তমানে দাঁতের চিকিৎসায় এর ব্যবহার আগের তুলনায় কমেছে।


রিজার্ভ হিসেবে সোনা জমা রাখে কেন্দ্রীয় ব্যাংক

সোনা শুধু গহনা বা শিল্পের উপকরণ নয়, বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক সম্পদেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ডলার ও অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার পাশাপাশি রিজার্ভ হিসেবে সোনা মজুত রাখে। একসময় অনেক দেশের মুদ্রার মূল্য সরাসরি সোনার মজুতের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। বর্তমানে সেই ব্যবস্থা প্রচলিত না থাকলেও সোনা এখনো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বৈদেশিক সম্পদের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সোনার রিজার্ভ রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে। দেশটির মজুত প্রায় ৮ হাজার ১৩৩ টন, যা ৮১ লাখ ৩৩ হাজার কিলোগ্রামের সমান।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর কাছে সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬ হাজার ৪০০ টন সোনা ছিল। এসব দেশের বৈদেশিক রিজার্ভের ৭০ শতাংশেরও বেশি সোনা দিয়ে গঠিত।

সোনার ব্যবহার কোথায় কত?

দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার একটি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে সোনার ব্যবহার বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ অলঙ্কার তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।

প্রকাশিত হিসাবটির ভিত্তিতে সোনার ব্যবহার খাতভিত্তিকভাবে এমন :

অলঙ্কার : ৫১ শতাংশ
কয়েন ও বার : ২৫ শতাংশ
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ : ১৫ শতাংশ
ইলেকট্রনিকস ও শিল্পখাত : ৭ শতাংশ
এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ড : ১ শতাংশ
দাঁতের চিকিৎসা ও অন্যান্য চিকিৎসা : ১ শতাংশ

এই হিসাব অনুযায়ী, গহনা তৈরিতে সোনার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। তবে প্রযুক্তি, চিকিৎসা ও আর্থিক খাতেও ধাতুটির ব্যবহার রয়েছে।


সোনা কেনায় এগিয়ে চীন

সোনার মজুত বাড়ানোর ক্ষেত্রেও বিভিন্ন দেশের মধ্যে প্রতিযোগিতা রয়েছে। গত কয়েক বছরে চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক তাদের রিজার্ভে সোনার পরিমাণ বাড়িয়েছে।

ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের শেষে চীনের সোনার রিজার্ভ ছিল ২ হাজার ২৭৯ টন। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে দেশটি আরও প্রায় ১৯ টন সোনা কিনেছিল। ওই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো সোনা কেনেনি। এর আগে, ২০২৩ সালেও চীন প্রায় ৮৮ টন সোনা কিনেছিল।

সূত্র : অ্যাজিনকোর্ট রিসোর্সেস ডট কম, বিবিসি বাংলা, অ্যানার্জি অ্যান্ড মাইনিং.এসএ.গভ. এইউ, ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল

সময়ের আলো/মহু
  বিষয়:   গহনা  সোনা  স্বর্ণ  গোল্ড  ব্যবহার  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: