বিচ্ছেদের পরও অনেকেই প্রাক্তনের খবর জানতে তার সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখে। ছবি : সংগৃহীত সম্পর্ক শেষ হয়েছে, বন্ধ হয়েছে যোগাযোগও। দুজনের জীবন হয়ত এগিয়ে চলছে আলাদা পথে। তারপরও হঠাৎ গভীর রাতে কিংবা কাজের ফাঁকে ফোন হাতে নিয়ে প্রাক্তনের নাম লিখে সার্চ করেন অনেকে। তার নতুন পোস্ট, ছবি কিংবা জীবনের নানা আপডেট দেখার এই প্রবণতা কী নিছক কৌতূহল, নাকি এর পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক কারণ?
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন বেঙ্গালুরুর মার্গ মাইন্ড কেয়ারের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে.। তার আলোচনায় উঠে এসেছে বিচ্ছেদের পরও প্রাক্তনের সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল ঘুরে দেখার অভ্যাসের পেছনে কাজ করতে পারে পুরোনো স্মৃতি, অসমাপ্ত আবেগ, সামাজিক তুলনা এবং একাকীত্বের মতো বিষয়।
ডিজিটাল মাধ্যমে পুরোনো স্মৃতির উপস্থিতি
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রাক্তনের উপস্থিতি পুরোপুরি এড়িয়ে চলা কঠিন। পারস্পরিক বন্ধুদের স্টোরি, পরিচিত অ্যাকাউন্টের পোস্ট কিংবা অ্যালগরিদমের পরামর্শে হঠাৎ তার ছবি বা আপডেট সামনে চলে আসতে পারে। এতে পুরোনো স্মৃতি জেগে ওঠে, তৈরি হয় কৌতূহল। সেই সূত্র ধরেই অনেকে ঢুঁ মারেন প্রাক্তনের প্রোফাইলে।
আগে প্রাক্তনের খবর জানতে সরাসরি যোগাযোগ কিংবা পরিচিতদের ওপর নির্ভর করতে হতো। এখন একই ডিজিটাল পরিসরে থাকার কারণে তার জীবন সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া অনেক সহজ।
নিজের জীবনের সঙ্গে প্রাক্তনের তুলনা
বিচ্ছেদের পর প্রাক্তন কেমন আছেন, কতটা সুখী কিংবা কতটা সফল হয়েছেন- এসব জানার আগ্রহ অনেকের মধ্যে দেখা যায়। কেউ কেউ জানতে চান, বিচ্ছেদের পর অন্যজন কত দ্রুত স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন। আবার প্রাক্তন নিজের নতুন জীবনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কীভাবে তুলে ধরছেন, তা দেখেও নিজের বর্তমান অবস্থার সঙ্গে তুলনা শুরু করেন। এ ধরনের তুলনা কখনো কখনো মানসিক অস্থিরতা বাড়াতে পারে।
অসমাপ্ত আবেগ ও মানসিক সমাপ্তির খোঁজ
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার অর্থ সব সময় সম্পর্কে ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নয়। এর পেছনে থাকতে পারে জমে থাকা আবেগ, পুরোনো স্মৃতির প্রতি টান কিংবা বিচ্ছেদের পর মানসিকভাবে বিষয়টি মেনে নেওয়ার চেষ্টা।
অনেকে জানতে চান, প্রাক্তনও তাদের মতো কষ্ট পাচ্ছেন কি না, কিংবা কতটা সহজে নতুন জীবনে এগিয়ে গেছেন। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে তারা বারবার প্রোফাইল দেখেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের তথ্য সব সময় এসব প্রশ্নের নির্ভরযোগ্য উত্তর দেয় না।
কিছু মিস করার ভয় ও অভ্যাস
‘ফিয়ার অব মিসিং আউট’ বা গুরুত্বপূর্ণ কিছু থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয়ও প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার প্রবণতা বাড়াতে পারে। তার জীবনে নতুন কী ঘটছে, এমন কিছু হচ্ছে কি না যা নিজের অজানা থেকে যাচ্ছে- এ ধরনের ভাবনা মানুষকে বারবার খোঁজ নিতে উদ্বুদ্ধ করে।
কখনো একাকীত্ব, একঘেয়েমি কিংবা অবসর সময়ে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস থেকেও এমনটা হতে পারে। নিয়মিত একই কাজ করতে করতে একপর্যায়ে প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখা স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হয়।
ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট সুহাস কে. এ অভ্যাস থেকে বেরিয়ে আসতে কয়েকটি উপায় অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।
কোন বিষয় আপনাকে প্ররোচিত করে, তা বুঝুন
কখন প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখতে ইচ্ছা করে, তা খেয়াল করুন। একাকীত্ব, অলস সময়, বন্ধুর পোস্ট কিংবা পুরোনো কোনো স্মৃতি- কোনটি এই তাগিদ তৈরি করছে, তা শনাক্ত করা জরুরি। কারণ বুঝতে পারলে সেই পরিস্থিতিতে বিকল্প কোনো কাজে মনোযোগ দেওয়া সহজ হবে।
প্রোফাইলে প্রবেশের সুযোগ কমান
প্রাক্তনের অ্যাকাউন্ট মিউট বা আনফলো করা, পুরোনো বার্তা আর্কাইভে রাখা এবং সহজে তার প্রোফাইলে প্রবেশের সুযোগ সীমিত করা যেতে পারে। এতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার উপস্থিতি কম চোখে পড়বে, যা বারবার প্রোফাইল দেখার প্রবণতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।
তাগিদ অনুভব করলেই সঙ্গে সঙ্গে সাড়া দেবেন না
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার ইচ্ছা জাগলে তাৎক্ষণিকভাবে ফোন হাতে না নিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট অপেক্ষা করুন। এই সময়ে একটু হাঁটাহাঁটি করা, বন্ধুর সঙ্গে কথা বলা কিংবা গান শোনার মতো কাজে মনোযোগ দিতে পারেন। এতে তাৎক্ষণিক আবেগের বশে কাজ করার প্রবণতা কমতে পারে।
সোশ্যাল মিডিয়ার জীবনকে পুরো বাস্তবতা ভাববেন না
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষ সাধারণত নিজের জীবনের বাছাই করা মুহূর্তগুলোই তুলে ধরেন। তাই প্রাক্তনের হাসিমুখের ছবি কিংবা আনন্দঘন পোস্ট দেখে ধরে নেওয়া ঠিক নয় যে, তার জীবনে কোনো কষ্ট নেই। একইভাবে তার অনলাইন উপস্থিতির সঙ্গে নিজের মানসিকভাবে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ার তুলনা করাও ঠিক নয়।
প্রোফাইল দেখার পর নিজের অনুভূতি খেয়াল করুন
প্রাক্তনের প্রোফাইল দেখার পর আপনার মনে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে, তা বোঝার চেষ্টা করুন। যদি বারবার দেখার কারণে দুশ্চিন্তা, হতাশা, ঈর্ষা, ঘুমের সমস্যা কিংবা মানসিক অশান্তি বাড়ে, তাহলে এই অভ্যাস আপনার ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা গুরুত্ব দিয়ে ভাবুন। প্রয়োজন হলে অভ্যাসটি কমাতে সচেতন পদক্ষেপ নিন।
কখন বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া প্রয়োজন?
বিচ্ছেদের পর কিছু সময় মন খারাপ থাকা বা পুরোনো স্মৃতি মনে পড়া অস্বাভাবিক নয়। তবে প্রাক্তনের অনলাইন কার্যক্রম দেখা কিংবা বিচ্ছেদের অভিজ্ঞতার কারণে যদি দীর্ঘদিন তীব্র মানসিক চাপ, হতাশা ও ঘুমের সমস্যা চলতে থাকে এবং দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, তাহলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সময়ের আলো/মহু