দ্রব্যমূল্য বাড়লেই আলোচনায় আসে মুঘল শাসনামলে বাংলার সুবাদার শায়েস্তা খানের সময়ের কথা। প্রচলিত আছে, তার শাসনামলে এক টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। ইতিহাসবিদদের লেখায়ও এই তথ্যের উল্লেখ রয়েছে। তবে চালের দাম এত কম থাকার অর্থ কি তখন বাংলার সাধারণ মানুষ সুখে ছিল? এর পেছনে কী ছিল অর্থনৈতিক বাস্তবতা?
মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে শায়েস্তা খান দুই দফায় প্রায় ২২ বছর বাংলা শাসন করেন। তার সময়ে প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা, কৃষির উন্নয়ন, দুর্নীতি দমন ও বাণিজ্য সম্প্রসারণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হয়। কৃষকদের দ্বৈত করের চাপ থেকে রক্ষা এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেওয়ার বিষয়টিও ইতিহাসবিদদের লেখায় উঠে এসেছে।
ইতিহাসবিদ ড. নাসিমা হামিদের মতে, শায়েস্তা খানের আমলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম কম ছিল। ঐতিহাসিক ও বিদেশি পর্যটকদের বিবরণেও টাকায় আট মণ চাল পাওয়ার তথ্য রয়েছে।
তবে গবেষকদের কেউ কেউ মনে করেন, চালের দাম কম থাকার পেছনে শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, উৎপাদন ও সরবরাহের পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সে সময় বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদিত হতো বলে মনে করেন গবেষকেরা।
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক গোলাম রাব্বানীর মতে, চাল রফতানিতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে দেশে চালের সরবরাহ বেড়ে যায়। তিনি বলেন, চাল রফতানি বন্ধের পর তখন কৃষকের ঘরে ঘরে চাল পঁচতে শুরু করলো, তখন টাকা আট মণেরও বেশিও চাল পাওয়া যেতো।
গবেষকদের মতে, চালের দাম কম থাকলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যে স্বচ্ছন্দ ছিল, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। কৃষকদের অতিরিক্ত খাজনা দিতে হতো এবং উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগও ছিল।
অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের মতে, মুঘল আমলে দৈনন্দিন লেনদেনে মুদ্রার ব্যবহার ছিল সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে ধান বা অন্যান্য পণ্যের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় সেবা নেওয়া হতো। ফলে সে সময়ের এক টাকার সঙ্গে বর্তমানের এক টাকার সরাসরি তুলনা করা যায় না।
মুঘল আমলের এক টাকার মুদ্রা ছিল রুপার তৈরি। তাই শুধু চালের দাম দিয়ে তখনকার মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা বা অর্থনৈতিক অবস্থা বিচার করা কঠিন।
শায়েস্তা খানের সময়ে টাকায় আট মণ চাল পাওয়ার তথ্য বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। তবে এই সস্তা দামের পেছনে কৃষি উৎপাদন, বাজারে সরবরাহ, রপ্তানি নীতি ও মানুষের ক্রয়ক্ষমতা সবই বিবেচনায় নিতে হবে।
সময়ের আলো/এমকে