শীতকালে পর্যটকদের ভেতর দ্বীপে ক্যাম্পিং করার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। গ্রাফিক : সময়ের আলো বাংলাদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেকগুলো দ্বীপ। এসব দ্বীপের প্রকৃতি মানুষকে মুগ্ধ করে। সারাবছরই বিভিন্ন দ্বীপে ভ্রমণ করে থাকেন প্রকৃতিপ্রেমীরা। বিশেষ করে শীতকালে দ্বীপে ক্যাম্পিং করার প্রবণতা বেশি দেখা যায় পর্যটকদের ভেতর। আপনিও এই শীতে ঘুরে আসতে পারেন এমন ৭টি দ্বীপে।
সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, কক্সবাজার
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন স্থানীয়দের কাছে ‘নারিকেল জিঞ্জিরা’ নামে পরিচিত। কক্সবাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ১৭ বর্গকিলোমিটারের দ্বীপটি দেশের মূল ভূখণ্ডের দক্ষিণ প্রান্তে। একদিকে দিগন্তজোড়া নীল সমুদ্র, অন্যদিকে সারি সারি নারিকেল গাছ- প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এমন মেলবন্ধন পর্যটকদের সহজেই আকৃষ্ট করে।
বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়, সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত দ্বীপটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকে। কক্সবাজার থেকে জাহাজে করে এখানে যেতে পারবেন।
ছেঁড়া দ্বীপ, কক্সবাজার
সেন্ট মার্টিন দ্বীপের দক্ষিণে অবস্থিত ছেঁড়া দ্বীপ স্থানীয়দের কাছে ‘ছেঁড়াদিয়া’ বা ‘সিরাদিয়া’ নামেও পরিচিত। নামের মধ্যে দ্বীপ থাকলেও এটি মূলত কয়েকটি ছোট দ্বীপের সমষ্টি। ২০০০ সালের দিকে পরিচিতি পাওয়া এই দ্বীপপুঞ্জ সেন্ট মার্টিনে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।
নারিকেল গাছ, প্রাকৃতিক পাথর ও প্রবালের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা দ্বীপটির সৌন্দর্য মুগ্ধ করে দর্শনার্থীদের। জোয়ারের সময় এর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পানির নিচে তলিয়ে যায়। তখন পাথরে আছড়ে পড়া নীল ঢেউ তৈরি করে মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। স্বচ্ছ সমুদ্র, খোলা আকাশ ও সূর্যাস্তের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পর্যটকেরা এখানে ভিড় করেন। সেন্ট মার্টিন থেকে ট্রলারে কিংবা ভাটার সময় সাইকেলে বা হেঁটে ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া যায়।
কুতুবদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার
প্রাচীন বাতিঘরের ধ্বংসাবশেষ, নির্জন সমুদ্রসৈকত ও কুতুব আউলিয়ার মাজার কুতুবদিয়া দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ। প্রায় ২১৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্বীপটি বাংলাদেশের একমাত্র বায়ুবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং প্রাকৃতিক উপায়ে লবণ উৎপাদনের জন্যও পরিচিত।
কুতুবদিয়া যেতে প্রথমে কক্সবাজার থেকে চকরিয়া বাসস্ট্যান্ডে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মগনামা ঘাটে গিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় কুতুবদিয়া চ্যানেল পেরিয়ে দ্বীপটিতে পৌঁছানো যায়।
মহেশখালী দ্বীপ, কক্সবাজার
কক্সবাজার থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত মহেশখালী বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়ি দ্বীপ। কথিত আছে, ১৫৫৯ সালে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে এটি মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। প্রায় ২০০ বছর আগে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুর সম্মানে দ্বীপটির নাম রাখা হয় মহেশ্বর, যা পরবর্তী সময়ে মহেশখালী নামে পরিচিতি পায়।
দ্বীপটি পান, মাছ, শুঁটকি, চিংড়ি, লবণ ও মুক্তা উৎপাদনের জন্য প্রসিদ্ধ। মৈনাক পাহাড়ে অবস্থিত আদিনাথ মন্দির এখানকার অন্যতম প্রধান দর্শনীয় স্থান। প্রতি ফাল্গুনে আদিনাথ উৎসব উপলক্ষে বহু দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। পাহাড়, ম্যানগ্রোভ বন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় স্থাপনা মিলিয়ে দ্বীপটি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়।
কক্সবাজার থেকে স্পিডবোট বা ট্রলারে সরাসরি মহেশখালী যাওয়া যায়। এ ছাড়া, চট্টগ্রাম থেকে সড়কপথে চকরিয়া হয়ে বাধারখালী দিয়েও দ্বীপটিতে পৌঁছানো সম্ভব।
সোনাদিয়া দ্বীপ, কক্সবাজার
কক্সবাজার সদর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য নিরিবিলি এক গন্তব্য। বিস্তীর্ণ বালিয়াড়ি, ঝিনুক ও বিভিন্ন ধরনের সামুদ্রিক শাঁখ দ্বীপটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। বিশেষ করে শীতকালে যারা শহরের কোলাহল থেকে দূরে শান্ত পরিবেশে সময় কাটাতে বা ক্যাম্পিং করতে চান, তাদের জন্য সোনাদিয়া আকর্ষণীয় স্থান।
এখানে যেতে কক্সবাজারে নামার পর ৬ নম্বর জেটিতে (কস্তুরী ঘাট) গিয়ে মহেশখালী দ্বীপের স্পিডবোট ধরতে হবে। তারপর মহেশখালী ঘাট থেকে রিকশা করে যেতে হবে গোরকঘাটা বাজারে। যতটা সম্ভব কম পানিপথ পার হতে চাইলে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক ধরে যাওয়ার সময় চকরিয়ায় নেমে যেতে হবে। সেখান থেকে জীপ বা সিএনজিচালিত অটোরিকশা করে বদরখালি হয়ে গোরকঘাটা বাজারে যাওয়া যায়। গোরকঘাটা বাজার পর্যন্ত আসার পর অটোরিকশা বদলে যেতে হবে ঘটিভাঙায়।
ঘটিভাঙ্গা থেকে ইঞ্জিনচালিত বা খেয়া নৌকাগুলো সোনাদিয়া চ্যানেল পাড়ি দিয়ে সোনাদিয়া পৌঁছে দেয়। পশ্চিম সোনাদিয়া থেকে প্রতিদিন মাত্র একবার একটি ট্রলার আসে ঘটিভাঙ্গা পর্যন্ত। এই ট্রলারের আসা-যাওয়ার সময়টি মূলত জোয়ার ভাটার সময়ের ওপর নির্ভরশীল। সাধারণত সময়টি সকাল ১০টা বা এর আশপাশে হয়ে থাকে।
ঘটিভাঙ্গা থেকে সোনাদিয়ার পূর্ব পাড়া পর্যন্ত পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়। কিন্তু যাত্রাটি বেশ কষ্টসাধ্য। তাই সরাসরি পশ্চিম পাড়া চলে যাওয়াই ভালো। আবার কক্সবাজার থেকেও সরাসরি পশ্চিম পাড়া যাওয়া যায় ট্রলার বা স্পিডবোট রিজার্ভ নিয়ে।
মনপুরা দ্বীপ, ভোলা
মেঘনা নদীবেষ্টিত ভোলার মনপুরা দ্বীপ সূর্যোদয়, সূর্যাস্ত ও হরিণ দেখার জন্য পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়। নদীর ভেতরে প্রায় ৫০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত মনপুরা ল্যান্ডিং স্টেশনে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত স্থানীয় মানুষ ও দর্শনার্থীদের সমাগম ঘটে। এ ছাড়া মাছের ঘের, বিস্তীর্ণ নারিকেলবাগান এবং নদীর তীরের সবুজ পরিবেশ দ্বীপটির সৌন্দর্য বাড়িয়েছে। সাইক্লিং ও ক্যাম্পিংয়ের জন্যও এটি আকর্ষণীয় স্থান।
ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চে করে মনপুরা যাওয়া যায়। বিকল্প হিসেবে সড়কপথে ভোলা হয়ে তজুমদ্দিন ঘাট থেকে সি-ট্রাকে দ্বীপটিতে যাওয়া সম্ভব।
নিঝুম দ্বীপ, নোয়াখালী
নোয়াখালীর হাতিয়া অঞ্চলে বঙ্গোপসাগরবেষ্টিত নিঝুম দ্বীপের আয়তন প্রায় ১৪ হাজার ৫০ একর। শীতকালে অতিথি পাখির আগমনে দ্বীপটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। তবে, এখানকার প্রধান আকর্ষণ চিত্রা হরিণ। একসঙ্গে অনেক হরিণ দেখার সুযোগ পর্যটকদের বিশেষভাবে টানে। দ্বীপের নামার বাজার সৈকত থেকে উপভোগ করা যায় মনোমুগ্ধকর সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত।
নিঝুম দ্বীপে যেতে সড়কপথে প্রথমে চেয়ারম্যান ঘাটে পৌঁছাতে হবে। সেখান থেকে সি-ট্রাক বা ট্রলারে হাতিয়ার নলচিরা ঘাটে গিয়ে মোটরসাইকেলে মোক্তারিয়া ঘাটে পৌঁছানো যায়। এরপর ট্রলারে করে নিঝুম দ্বীপে যেতে হবে। সরাসরি যাওয়ার আরেকটি উপায় হলো ঢাকার সদরঘাট থেকে হাতিয়াগামী লঞ্চে যাওয়া। হাতিয়ায় পৌঁছে তমুরদ্দী ঘাট থেকে নিঝুম দ্বীপের ট্রলার পাওয়া যায়।
সময়ের আলো/মহু