হারনেস জিপলাইন : শূন্যে ভেসে নদী পার হওয়ার গল্প

সাজলিন মেহজাবীন চৌধুরী

ফিচার

পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে একটি নদী, নাম কালিগণ্ডকী। হিমালয়ের গলে যাওয়া বরফ ও পাথুরে খাদ পেরিয়ে এই নদী শতাব্দীর

2026-09-16T16:06:04+00:00
2026-09-16T16:13:12+00:00
 
  বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
১ আশ্বিন ১৪৩৩
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
হারনেস জিপলাইন : শূন্যে ভেসে নদী পার হওয়ার গল্প
সাজলিন মেহজাবীন চৌধুরী
প্রকাশ: বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:০৬ পিএম  আপডেট: ১৬.০৯.২০২৬ ৪:১৩ পিএম
কালিগণ্ডকী নদীর ওপর পাখির মতো ভেসে চলা। ছবি : সংগৃহীত
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলেছে একটি নদী, নাম কালিগণ্ডকী। হিমালয়ের গলে যাওয়া বরফ ও পাথুরে খাদ পেরিয়ে এই নদী শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নেপালের বুক চিরে বয়ে যাচ্ছে। নদীর ঠিক উপরেই শূন্যে ভাসমান একটা তার বেয়ে মানুষ উড়ে যায়। এর নাম হারনেস জিপলাইন, যা নেপালের গন্ডকী প্রদেশের পার্বত জেলার কুসমা পৌরসভাকে করেছে অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের পছন্দের গন্তব্য। 

কুসমার চাকলে এলাকার জিপলাইনটি ২০২২ সালের জানুয়ারিতে সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়, যা দৈর্ঘ্যে প্রায় ১ হাজার ৪৮০ মিটার। এখানে সাধারণ বসে যাওয়ার জিপলাইনের বদলে চালু করা হয় অন্যরকম এক স্টাইল, যেখানে যাত্রী শুয়ে থাকা অবস্থায়, দুহাত সামনে বাড়িয়ে উড়ে যান নদীর ওপর দিয়ে। এই অনুভূতিটাই আসলে এই জায়গার মূল আকর্ষণ, যেখানে মানুষ কয়েক সেকেন্ডের জন্য সত্যিই পাখি হয়ে যায়।

কালিগণ্ডকী নদী। ছবি : সংগৃহীত

কালিগণ্ডকী নদী। ছবি : সংগৃহীত


জিপলাইনটির শেষ প্রান্তে গড়ে রয়েছে ‘অ্যাডভেঞ্চার রিসোর্ট’, যা ‘হারনেস জিপলাইন অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার রিসোর্ট’ নামে পরিচিত। রিসোর্টটির অবস্থান গোদাম এলাকায়, কুসমা রোডে। 

পাহাড়ি সকাল কল্পনা করলে আমাদের মনে হয় ঠান্ডা বাতাস, পাখির কিচিরমিচির শব্দ, বারান্দায় বসে চায়ের কাপ হাতে সূর্যোদয় দেখা। এমন জায়গা শুধু অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের নয়, প্রকৃতির নীরবতা খুঁজতে আসা মানুষদেরও টানে। দারুণ ব্যাপার হলো, এ রিসোর্টে থাকার অনেক সুব্যবস্থার পাশাপাশি নদীর ধারে তাঁবুতে রাত কাটানোর ব্যবস্থাও আছে। আছে জিওডেসিক ইগলু রুম বা বাংক বেড রুমও। এই সুযোগগুলো আপনাকে প্রকৃতিকে অন্যরকমভাবে উপভোগ করতে শেখাবে। এছাড়া, এর কাছেই আছে কালিকা ভগবতী মন্দির, পঞ্চকোট ধাম ও কান্দে বরাহা থানের মতো তীর্থস্থান। একবারে সেগুলোও ঘুরে দেখা যাবে।

হারনেস জিপলাইন অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার রিসোর্ট। ছবি : সংগৃহীত

হারনেস জিপলাইন অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার রিসোর্ট। ছবি : সংগৃহীত


আবার, রিসোর্টটির পাশেই রয়েছে কালিগণ্ডকী নদীর গিরিখাতের ওপর নির্মিত ৫২৫ মিটার দীর্ঘ ঝুলন্ত সেতু, যা পার্বত জেলার কুসমাকে বাগলুং জেলার সঙ্গে যুক্ত করেছে। সেখানে বাঞ্জি জাম্প ও ক্যানিয়ন সুইং করার সুযোগ রয়েছে। একই এলাকায় আছে স্কাই সাইক্লিংও। 

এখানে আছে জিওডেসিক ইগলু রুম বা বাংক বেড রুমও। ছবি : সংগৃহীত

এখানে আছে জিওডেসিক ইগলু রুম বা বাংক বেড রুমও। ছবি : সংগৃহীত


কুসমার এই এলাকা তাই একইসঙ্গে একাধিক ধরনের ভ্রমণকারীকে আকর্ষণ করে। যারা উইকেন্ড গেটওয়ে খোঁজেন, তাদের জন্য নদীর ধারের শান্ত পরিবেশ ও ভিউ পয়েন্ট আছে। পরিবার নিয়ে যারা আসেন, তাদের জন্য আছে তুলনামূলক নিরাপদ পরিবেশ ও একাধিক ধরনের রুম। বন্ধুদের দল যারা রোমাঞ্চের খোঁজে আসেন, তাদের জন্য তো জিপলাইন এবং পাশের সেতুর বানজি জাম্প, ক্যানিয়ন সুইং মিলিয়ে গোটা দিনের পরিকল্পনাই তৈরি হয়ে যায়।

এবার একটু কালিগণ্ডকী নদীর কাছে ফিরে যাই। হিমালয়ের অন্যতম প্রাচীন নদীপথ হিসেবে পরিচিত এই নদী মুস্তাংয়ের বরফঢাকা উপত্যকা থেকে নেমে এসে পার্বত জেলার বুক চিরে বয়ে গেছে, পথে পথে গড়ে তুলেছে গভীর গিরিখাত। ভূতাত্ত্বিকরা বলেন, পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর গিরিখাতগুলোর একটি এই কালিগণ্ডকীর গর্ভেই লুকিয়ে আছে। শালগ্রাম শিলার জন্যও এই নদী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র। তাই যখন কেউ হারনেস জিপলাইনে চড়ে এই নদীর উপর দিয়ে উড়ে যান তখন তিনি আসলে হাজার বছরের পুরনো এক ভূমির উপর দিয়ে কয়েক সেকেন্ডের জন্য ভেসে বেড়ান। এই ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক প্রেক্ষাপটটাই জায়গাটাকে আরও গভীর অর্থবহ করে তোলে। 

হিমালয়ের অন্যতম প্রাচীন নদীপথ কালিগণ্ডকী। ছবি : সংগৃহীত

হিমালয়ের অন্যতম প্রাচীন নদীপথ কালিগণ্ডকী। ছবি : সংগৃহীত



যারা এই অভিজ্ঞতা নিতে চান, তাদের জন্য যাত্রাপথটাও কম আকর্ষণীয় নয়। কাঠমান্ডু বা পোখরা থেকে সড়কপথে কুসমা পৌঁছানো যায়। পোখরা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গাড়িতে সময় লাগে মোটামুটি দেড় থেকে দুই ঘণ্টা। পথের দুপাশে ধাপে ধাপে সাজানো ধানখেত, পাহাড়ি গ্রাম এবং দূরে ধবলগিরি পর্বতমালা। 

ঋতু বিবেচনায় নেপালে অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজমের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সময় ধরা হয় সাধারণত অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর এবং মার্চ থেকে মে, যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে, দৃশ্য ভালো থাকে এবং তাপমাত্রা বাইরের কার্যক্রমের জন্য আরামদায়ক থাকে। বর্ষাকালে (জুন থেকে সেপ্টেম্বর) নদীর স্রোত বেড়ে যায় ও পাহাড়ি রাস্তায় ধসের ঝুঁকি থাকে বলে অনেক অপারেটর এই সময়ে কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ রাখে। তাই ভ্রমণের আগে অবশ্যই সরাসরি রিসোর্ট বা স্থানীয় ট্যুর অপারেটরের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেই সময়ের কার্যক্রম সচল আছে কিনা, তা নিশ্চিত হয়ে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।

হাজার বছরের পুরনো ভূমির উপর পাখির মতো ভেসে বেড়ানো। ছবি : সংগৃহীত

হাজার বছরের পুরনো ভূমির উপর পাখির মতো ভেসে বেড়ানো। ছবি : সংগৃহীত


নদীর ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সেই কয়েক মুহূর্ত যখন হৃৎপিণ্ড গলার কাছে চলে আসে, চোখের সামনে দিয়ে বয়ে যায় সবুজ পাহাড় আর ফেনিল জলরাশি, এই অনুভূতি হাজার ছবিতে ধরা পড়ে না। কুসমার এই জিপলাইন নেপালের অন্যতম দীর্ঘ জিপলাইনগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। আর এটা এমনই এক অভিজ্ঞতা, যা পাহাড়ি নেপালকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরেকভাবে চিনিয়ে দিচ্ছে যে শুধু ট্রেকিং বা পবিত্র মন্দিরের দেশ হিসেবে নয়, বরং রোমাঞ্চ আর সাহসিকতার এক নতুন গন্তব্য হিসেবে নেপাল সেরা।

যারা রোমাঞ্চকে ভালোবাসেন, যারা জীবনে অন্তত একবার শূন্যে ভেসে নদী পার হতে চান, তাদের জন্য কুসমার এই কোণটা এক উদার আমন্ত্রণ।

সময়ের আলো/মহু



  বিষয়:   হারনেস জিপলাইন  নেপাল  অ্যাডভেঞ্চার  রিসোর্ট  ভ্রমণ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: