এক হাতে নোটবুক, চোখে দুরবিন আর সামনে ঘন আফ্রিকান জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন বসে এক তরুণী পর্যবেক্ষণ করতেন শিম্পাঞ্জিদের জীবনযাপন। সেই তরুণীই জেন গুডঅল। হাতে ছিল না কোনো বড় গবেষণাগারের সুযোগ-সুবিধা, ছিল না প্রচলিত বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণও। ছিল প্রাণীদের প্রতি গভীর ভালোবাসা, কৌতূহল আর অদম্য ধৈর্য। কখন তারা গাছ থেকে নামবে, কীভাবে খাবার সংগ্রহ করবে, পরস্পরের সঙ্গে কীভাবে যোগাযোগ করবে, সবকিছুই তিনি গভীর মনোযোগে দেখছেন। তার গবেষণা শুধু শিম্পাঞ্জি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দেয়নি, মানুষ ও প্রাণীর সম্পর্ক নিয়েও তৈরি করেছে নতুন ভাবনা। বিজ্ঞানী হিসেবে তার পথচলা যেমন ব্যতিক্রমী, তেমনি প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় তার ভূমিকার গল্পও অনুপ্রেরণার।
১৯৩৪ সালের ৩ এপ্রিল ইংল্যান্ডের লন্ডনে জন্ম জেন গুডঅলের। ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের প্রতি তার ছিল গভীর টান। অন্য শিশুরা যখন খেলাধুলায় ব্যস্ত, তখন জেন মুগ্ধ হয়ে দেখতেন পাখি, পোকামাকড় কিংবা অন্য প্রাণীর আচরণ। আফ্রিকার বন্যপ্রকৃতি দেখার স্বপ্নও তার মনে তৈরি হয় তখনই। কিন্তু সে সময় একজন তরুণীর পক্ষে আফ্রিকার দুর্গম জঙ্গলে গিয়ে বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণা করা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। তবু জেন থেমে থাকেননি। ১৯৫৭ সালে তিনি আফ্রিকা সফরে যান। সেখানেই তার পরিচয় হয় বিখ্যাত প্রত্নতত্ত্ববিদ ও জীবাশ্মবিজ্ঞানী লুইক লিকির সঙ্গে। জেনের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও প্রাণীদের প্রতি আগ্রহ দেখে লিকি তাকে শিম্পাঞ্জি নিয়ে গবেষণার সুযোগ দেন। তার উৎসাহেই ১৯৬০ সালে তানজানিয়ার গোম্বে অঞ্চলে শিম্পাঞ্জি নিয়ে গবেষণা শুরু করেন জেন।
গোম্বের জঙ্গলে জেনের গবেষণা ছিল ধৈর্যের এক কঠিন পরীক্ষা। দিনের পর দিন তিনি দূর থেকে শিম্পাঞ্জিদের আচরণ দেখতেন। ধীরে ধীরে শিম্পাঞ্জিরাও তার উপস্থিতিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। তিনি তাদের আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য দেখে চিনতে এবং নাম দিতে শুরু করেন।
তার গবেষণার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণগুলোর একটি ছিল শিম্পাঞ্জিদের হাতিয়ার ব্যবহার। জেন দেখেছিলেন, তারা ঘাসের কাণ্ড বা ডালপালা ব্যবহার করে গাছের ভেতর থেকে উইপোকা বের করে খাচ্ছে। এর আগে হাতিয়ার তৈরি ও ব্যবহারের ক্ষমতাকে অনেকটাই মানুষের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা হতো। জেনের পর্যবেক্ষণ সেই ধারণাকে বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়। জেন আরও দেখান, শিম্পাঞ্জিদের সমাজে রয়েছে বন্ধুত্ব, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সহযোগিতা এবং আবেগের জটিল প্রকাশ। ফলে প্রাণীদের শুধু ‘সহজাত প্রবৃত্তিতে পরিচালিত জীব’ হিসেবে দেখার ধারণায় পরিবর্তন আসে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জেন বুঝতে পারেন, প্রাণীদের আচরণ নিয়ে গবেষণা করাই যথেষ্ট নয়। তাদের টিকে থাকার জন্য দরকার নিরাপদ বন, সুস্থ পরিবেশ এবং মানুষের সচেতনতা। বন উজাড়, শিকার ও পরিবেশগত পরিবর্তনে শিম্পাঞ্জিসহ বহু প্রাণী ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ছিল। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন জেন গুডঅল ইনস্টিটিউট। সংগঠনটি শিম্পাঞ্জি গবেষণা ও সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিবেশ, শিক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবনমান উন্নয়নেও কাজ করে। একজন তরুণীর জঙ্গলে বসে শিম্পাঞ্জি দেখার সেই গল্প আজ বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞান, পরিবেশ ও নারী-অগ্রযাত্রার অনুপ্রেরণার গল্প। জেন গুডঅল প্রমাণ করেছেন, কখনো কখনো পৃথিবী বদলে দেওয়ার শুরুটা হয় খুব নীরবে, একটি জঙ্গলের ভেতর, একজন মানুষের গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে।
সময়ের আলো/মহু