জোনাকিরা কি গল্প হয়ে গেল?

শাহনেওয়াজ

ফিচার

একসময় গরমের সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের ঘুটঘুটে অন্ধকার ঠেলে জ্বলে উঠত ছোট ছোট আলো। কখনো উঠানের ঘাসে, কখনো পুকুরপাড়ে, আবার কখনো

2026-09-15T07:15:24+00:00
2026-09-15T07:15:24+00:00
 
  মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
৩১ ভাদ্র ১৪৩৩
মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
জোনাকিরা কি গল্প হয়ে গেল?
শাহনেওয়াজ
প্রকাশ: মঙ্গলবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৭:১৫ এএম 
ছবি : সংগৃহীত
একসময় গরমের সন্ধ্যা নামলেই গ্রামের ঘুটঘুটে অন্ধকার ঠেলে জ্বলে উঠত ছোট ছোট আলো। কখনো উঠানের ঘাসে, কখনো পুকুরপাড়ে, আবার কখনো ঝোপঝাড়ে কিংবা ধানক্ষেতের আল ধরে হঠাৎ মিটমিট করে জ্বলে উঠত দুয়েকটি জোনাকি। কিছুক্ষণ পরপর আরও কয়েকটি। কখনোবা একসঙ্গে অসংখ্য জোনাকির আলোয় অন্ধকার রাত হয়ে উঠত যেন নক্ষত্রভরা আকাশের মতো।

সেই দৃশ্য এখন অনেকটাই স্মৃতি। জোনাকির মিটিমিটি আলো যেন ধীরে ধীরে আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় যে জোনাকিকে গ্রামের রাতের স্বাভাবিক সৌন্দর্যের অংশ মনে হতো, এখন সেটিই অনেকের কাছে প্রায় বিস্মৃত এক গল্প।

জোনাকি নিয়ে কবি বুদ্ধদেব বসুরও একটি কবিতা রয়েছে। কবিতার শুরুতেই তিনি লিখেছেন—‘এ কী জোনাকি/ তুই কখন এলি বল তো’। অন্ধকারে জোনাকির হঠাৎ জ্বলে ওঠাকে কবি দেখেছেন বিস্ময় আর মুগ্ধতার চোখে।

বাংলাদেশের কিংবদন্তি শিল্পীর জীবনের প্রথম বেতারে গাওয়া আধুনিক গানের কলিতেও ছিল জোনাকির আলো—‘রাত্রি ঘনায় আঁধারের ডানা মেলে/ জোনাকিরা জ্বলে মিটিমিটি দীপ জ্বেলে’। একসময় গান, কবিতা আর মানুষের স্মৃতিতে যে জোনাকি এতটা জীবন্ত ছিল, আজ বাস্তবের  প্রকৃতিতে তাদেরই দেখা মিলছে ক্রমেই কম।

অন্ধকারে আর জ্বলে না সেই আলো : বেলজিয়ামের গবেষক রাফায়েল দ্য কক জোনাকি নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার গবেষণাতেও উঠে এসেছে উদ্বেগজনক চিত্র। গরমের রাতে একসময় যে জোনাকিরা সহজেই চোখে পড়ত, অনেক জায়গাতেই তা এখন আর দেখা যায় না।

জোনাকি হারিয়ে যাওয়ার পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। এর মধ্যে প্রধান হলো আবাসস্থল ধ্বংস, আলোকদূষণ, অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তন। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত পর্যটনও।

পৃথিবীতে জোনাকির প্রায় ২ হাজার ৬০০ প্রজাতি রয়েছে। অ্যান্টার্কটিকা ছাড়া প্রায় সব মহাদেশেই তাদের দেখা যায়। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫০টি প্রজাতির সংরক্ষণগত অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০ শতাংশ প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে।

গবেষকদের মতে, জোনাকি হারিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো তাদের আবাসস্থল হারিয়ে যাওয়া। যে জলাভূমি, বন, ঘাসভূমি ও ঝোপঝাড়ে তারা বসবাস করত এবং বংশবিস্তার করত, সেগুলো দ্রুত কমে যাচ্ছে। শহরের পাশাপাশি গ্রামের চেহারাও বদলে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক জায়গাগুলো দখল করে তৈরি হচ্ছে বাড়িঘর, সড়ক ও শিল্প-কারখানা। ফলে জোনাকির জীবনচক্র সম্পন্ন করার মতো স্বাভাবিক পরিবেশ ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ম্যানগ্রোভ হারালে জোনাকিও হারায় : মালয়েশিয়ায় জোনাকির একটি প্রজাতি রয়েছে, যার জীবনযাপন ও বংশবিস্তার ম্যানগ্রোভ বনের ওপর বিশেষভাবে নির্ভরশীল। কিন্তু সেই ম্যানগ্রোভ এলাকায় গড়ে উঠছে পাম তেলশিল্প। পাশাপাশি জলজ খামার তৈরির কারণে সংকুচিত হচ্ছে তাদের আবাসস্থল। ফলে সেখানে জোনাকির সংখ্যাও কমে আসছে।

বেলজিয়ামের গবেষক রাফায়েল দ্য কক নিজেও জোনাকির ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাড়তে দেখেছেন। কোনো কোনো এলাকায় দীর্ঘায়িত খরার কারণে জোনাকির বসবাসের উপযোগী পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। পানি ও আর্দ্রতার ওপর নির্ভরশীল অনেক প্রজাতির জন্য পরিস্থিতি হয়ে উঠছে আরও কঠিন।

এর সঙ্গে বড় হুমকি হয়ে এসেছে কীটনাশক। কৃষিকাজে অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার জোনাকির জীবনচক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে ক্ষতি করছে। শুধু পূর্ণাঙ্গ জোনাকিই নয়, তাদের লার্ভা ও অন্যান্য জীবনপর্যায়ও এর নেতিবাচক প্রভাব থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

জোনাকির শত্রু কৃত্রিম আলো : জোনাকির আরেক বড় শত্রু কৃত্রিম আলো। রাস্তার বাতি, বাড়িঘরের আলো কিংবা উজ্জ্বল সাইনবোর্ড—সবই তাদের জন্য তৈরি করছে নতুন বিপদ।

জোনাকি মূলত আলোকে সংকেত হিসেবে ব্যবহার করে। প্রজননের সময় পুরুষ ও স্ত্রী জোনাকি একে অপরকে খুঁজে পেতে নির্দিষ্ট আলোর সংকেত দেয়। কিন্তু রাতের অন্ধকার যখন কৃত্রিম আলোয় ভরে যায়, তখন সেই ক্ষীণ আলোর সংকেত আর সহজে দৃশ্যমান হয় না। ব্যাহত হয় তাদের যোগাযোগ ও প্রজনন।

গবেষকদের হিসাবে, পৃথিবীর স্থলভাগের ২৩ শতাংশের বেশি এলাকায় রাতে কোনো না কোনো মাত্রায় কৃত্রিম আলো রয়েছে। ফলে জোনাকির জন্য প্রয়োজনীয় স্বাভাবিক অন্ধকার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

অথচ জোনাকির জীবনচক্রের জন্য অন্ধকার রাত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাত যত আলোকিত হচ্ছে, তাদের পৃথিবী ততটাই অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে।

পর্যটনের চাপেও বিপন্ন জোনাকি : জোনাকির আলো এখন শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য নয়, পর্যটনেরও আকর্ষণ। জোনাকি দেখার জন্য প্রতি বছর বহু মানুষ ছুটে যাচ্ছেন বিভিন্ন দেশে। জাপান, তাইওয়ান ও মালয়েশিয়ায় জোনাকি পর্যবেক্ষণ দীর্ঘদিনের জনপ্রিয় বিনোদন হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি বছর দুই লাখের বেশি মানুষ জোনাকি দেখার জন্য বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেন। কিন্তু প্রকৃতির এই ক্ষুদ্র আলোকশিল্পীদের দেখতে মানুষের ভিড়ও কখনো কখনো তাদের জন্য বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

থাইল্যান্ডের ম্যানগ্রোভ নদীগুলোতে পর্যটকদের মোটরবোট চলাচলের কারণে যেমন গাছপালা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তেমনি নষ্ট হচ্ছে জোনাকির আবাসস্থল। মেক্সিকোর কোনো কোনো এলাকায় আবার উড়তে না পারা জোনাকি পর্যটকদের পায়ের নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছে। অর্থাৎ যে প্রাণীকে দেখতে মানুষ প্রকৃতির কাছে ছুটে যাচ্ছে, সেই মানুষের উপস্থিতিই কখনো কখনো তার অস্তিত্বের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে।

বাঁচাতে হলে ফিরিয়ে দিতে হবে অন্ধকার : জোনাকিকে বাঁচাতে হলে সবার আগে ফিরিয়ে দিতে হবে তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল। গবেষকদের পরামর্শ, জলাভূমি, বন, ঘাসভূমি, ম্যানগ্রোভ ও ঝোপঝাড়ের মতো প্রাকৃতিক এলাকা সংরক্ষণ করতে হবে। কমাতে হবে অপ্রয়োজনীয় কীটনাশকের ব্যবহার। একই সঙ্গে রাতের অপ্রয়োজনীয় কৃত্রিম আলো কমিয়ে জোনাকির জন্য অন্ধকারের পরিসর বাড়াতে হবে।

শুকনো পাতাও জোনাকির জীবনচক্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিচ্ছন্নতার নামে সব শুকনো পাতা ও প্রাকৃতিক আবর্জনা সরিয়ে ফেলার বদলে জোনাকির আবাসস্থলে সেগুলো স্বাভাবিকভাবে পড়ে থাকতে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকরা।

২০১৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ ইউনিয়ন (আইইউসিএন) বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের জোনাকি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করছে। প্রজাতিগুলোর তালিকা তৈরি এবং তাদের সংরক্ষণগত অবস্থা মূল্যায়নের কাজও চলছে।

জোনাকিরা কি শুধু গল্প হয়ে থাকবে : জোনাকির মিটিমিটি আলো একসময় ছিল আমাদের গ্রামীণ রাতের অতি পরিচিত দৃশ্য। শিশুরা সেই আলো ধরতে ছুটত, কিশোররা বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকত, আর কবিরা খুঁজে নিতেন উপমা। অন্ধকারকে ভয়ংকর না করে যে ছোট্ট প্রাণীটি একসময় তাকে সৌন্দর্যে ভরিয়ে দিত, আজ সেই প্রাণীর অস্তিত্বই হুমকির মুখে। 

গবেষকরা বলছেন, এখনও সময় ফুরিয়ে যায়নি। প্রকৃতিকে যদি তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরতে দেওয়া যায়, আবাসস্থল রক্ষা করা যায়, অপ্রয়োজনীয় আলো ও কীটনাশকের ব্যবহার কমানো যায়, তা হলে হয়তো আবারও কোনো এক গরমের সন্ধ্যায় অন্ধকার মাঠের ধারে জ্বলে উঠবে ছোট্ট একটি আলো। তারপর আরেকটি। তারপর আরও অনেক।

হয়তো কোনো একদিন শিশুরা আবার জোনাকি ধরতে ছুটবে। আর আমরা বুঝতে পারব—জোনাকিরা হারিয়ে যায়নি। তারা ফিরে এসেছে।

শুধু একটি পোকার হয়ে নয়, প্রকৃতির জীবন্ত গল্প হয়ে।

সময়ের আলো/প্রিন্ট/টিকে
  বিষয়:   জোনাকি  কি গল্প  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: