কারও সঙ্গে কথা বলার সময় হঠাৎ মুখের দুর্গন্ধ টের পেলে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে। অনেকেই বিষয়টি শুধু মুখের অপরিচ্ছন্নতা বলে মনে করেন। কিন্তু মুখের দুর্গন্ধ বা হ্যালিটোসিসের পেছনে থাকতে পারে দাঁত ও মাড়ির সমস্যা।
এ ছাড়া জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া জমা, মুখ শুষ্ক থাকা, ধূমপান কিংবা নাক-কান-গলার বিভিন্ন সমস্যায়ও মুখে গন্ধ হয়ে থাকে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যাসিড রিফ্লাক্স বা দীর্ঘমেয়াদি রোগও এর সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্গন্ধের মূল উৎস থাকে মুখের ভেতরেই। মুখের দুর্গন্ধ বিভিন্ন কারণে হতে পারে। সবচেয়ে সাধারণ কারণগুলো হলো :
দাঁতে প্লাক, খাদ্যকণা জমে ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি পেলে দুর্গন্ধ হয়।
জিনজিভাইটিস বা পেরিওডন্টাইটিস থাকলে মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে।
জিহ্বায় ব্যাকটেরিয়া ও মৃত কোষ জমে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে।
লালা কম তৈরি হলে মুখের ব্যাকটেরিয়া বেড়ে যায়।
ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার করলে এগুলো মুখে দীর্ঘস্থায়ী দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে এবং মাড়ির রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।
ক্যাভিটি, দাঁতের ফোড়া বা সংক্রমণ, টনসিলের পাথর, সাইনাসের সমস্যা বা গলার সংক্রমণ থেকেও দুর্গন্ধ হতে পারে।
পাকস্থলীর কিছু সমস্যা, যেমন অ্যাসিড রিফ্লাক্স। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে দুর্গন্ধের উৎস মুখের ভেতরেই থাকে। কিছু দীর্ঘমেয়াদি রোগ— যেমন অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, কিডনি বা লিভারের কিছু রোগেও বিশেষ ধরনের মুখের দুর্গন্ধ হতে পারে।
মুখের দুর্গন্ধের সবচেয়ে মূল কারণ দাঁত ও মাড়ির অপরিচ্ছন্নতা। দাঁতে প্লাক বা খাদ্যকণা জমে গেলে সেখানে ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এসব ব্যাকটেরিয়া দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস তৈরি করে। জিনজিভাইটিস বা মাড়ির প্রদাহ এবং পেরিওডন্টাইটিসের মতো মাড়ির রোগ থাকলেও মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। দাঁতের ক্যাভিটি, ফোড়া বা কোনো ধরনের সংক্রমণ থেকেও দুর্গন্ধ দেখা দিতে পারে।
জিহ্বার উপরিভাগেও অসংখ্য ছোট ছোট খাঁজ থাকে। সেখানে খাবারের কণা, মৃত কোষ ও ব্যাকটেরিয়া জমে যায়। বিশেষ করে জিহ্বার পেছনের অংশে এসব জমে দুর্গন্ধের অন্যতম কারণ তৈরি করতে পারে। তাই দাঁত ব্রাশ করার পাশাপাশি নিয়মিত জিহ্বা পরিষ্কার করাও জরুরি।
মুখের দুর্গন্ধের আরেকটি কারণ হলো লালা কম তৈরি হওয়া। লালা মুখের ভেতর পরিষ্কার রাখতে এবং ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মুখ শুকিয়ে গেলে ব্যাকটেরিয়া বেড়ে গিয়ে দুর্গন্ধ তৈরি করতে পারে। পর্যাপ্ত পানি পান না করা, মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়া কিংবা কিছু ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায় মুখ শুষ্ক হতে পারে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহারের কারণেও মুখের দুর্গন্ধ হতে পারে। একই সঙ্গে এগুলো মাড়ির রোগেরও ঝুঁকি বাড়ায়।
পেটের সমস্যা কি দায়ী?
অনেকের ধারণা, মুখের দুর্গন্ধ মানেই পাকস্থলীর সমস্যা। বাস্তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এর কারণ মুখের ভেতরের সমস্যা। পাকস্থলীর অ্যাসিড ও খাবার ওপরের দিকে উঠে এলে মুখে টক বা অস্বস্তিকর গন্ধ অনুভূত হতে পারে।
যদি দুর্গন্ধের সঙ্গে বুক জ্বালাপোড়া, টক ঢেকুর, পেট ব্যথা, বমি বা দীর্ঘদিনের হজমের সমস্যা থাকে, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
নাক-কান-গলার সমস্যাতেও দুর্গন্ধ
সাইনাসের সংক্রমণ, টনসিলের পাথর বা দীর্ঘদিনের টনসিলের প্রদাহ থেকেও মুখে দুর্গন্ধ হতে পারে। টনসিলের ছোট ছোট গর্তে খাবারের কণা, মৃত কোষ ও ব্যাকটেরিয়া জমে টনসিল স্টোন বা পাথর তৈরি করতে পারে। নাক বন্ধ থাকলে মুখ দিয়ে শ্বাস নেওয়ার কারণে মুখ শুকিয়ে গিয়েও দুর্গন্ধ বাড়তে পারে। গলার কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণও এর কারণ হতে পারে।
প্রতিরোধে যা করবেন
দিনে অন্তত দুইবার ফ্লোরাইডযুক্ত টুথপেস্ট দিয়ে দাঁত ব্রাশ করতে হবে। প্রতিদিন ডেন্টাল ফ্লস দিয়ে দাঁতের ফাঁক পরিষ্কার করা এবং জিহ্বা পরিষ্কার করার অভ্যাস করতে হবে। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে এবং ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য এড়িয়ে চলতে হবে। অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার কমিয়ে সুষম খাদ্য গ্রহণ করাও জরুরি। পাশাপাশি প্রতি ৬ থেকে ১২ মাস অন্তর দন্তচিকিৎসকের কাছে দাঁত ও মাড়ি পরীক্ষা করানো ভালো।
ভালোভাবে মুখের পরিচর্যা করার পরও যদি দুই থেকে তিন সপ্তাহের বেশি দুর্গন্ধ থাকে, কিংবা মাড়ি থেকে রক্ত পড়া, দাঁতে ব্যথা, মুখে ঘা, নাক বন্ধ থাকা, গলা ব্যথা বা বারবার টনসিলের সমস্যা দেখা দেয়, তা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
লেখক : ডিপার্টমেন্ট অব ডেন্টাল সার্জারি, মুকুল ডেন্টাল ক্লিনিক
সময়ের আলো/প্রিন্ট/জেডি