সিলেট বর্ডার হাইকিংয়ের এ টু জেড

রোমেল

ফিচার

ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে পাহাড়ি ছড়া, নদী, ঝরনা ও সবুজ বনের বুক চিরে পায়ে হেঁটে রোমাঞ্চকর পথচলার নাম ‘সিলেট বর্ডার

2026-09-13T16:19:42+00:00
2026-09-13T16:23:33+00:00
 
  রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,
২৯ ভাদ্র ১৪৩৩
রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
ফিচার
সিলেট বর্ডার হাইকিংয়ের এ টু জেড
রোমেল
প্রকাশ: রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ৪:১৯ পিএম  আপডেট: ১৩.০৯.২০২৬ ৪:২৩ পিএম
পায়ে হেঁটে রোমাঞ্চকর পথচলার নাম ‘সিলেট বর্ডার হাইকিং’। গ্রাফিক : সময়ের আলো
ভারতের মেঘালয় সীমান্ত ঘেঁষে পাহাড়ি ছড়া, নদী, ঝরনা ও সবুজ বনের বুক চিরে পায়ে হেঁটে রোমাঞ্চকর পথচলার নাম ‘সিলেট বর্ডার হাইকিং’। প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে পাহাড়, ঝরনা ও সীমান্তের অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করার সুযোগ থাকায় দিন দিন এই হাইকিংয়ের জনপ্রিয়তা বাড়ছে। এখানে হাইকিং করার ইচ্ছে থাকলে ভ্রমণের আগে রুট, সময়, খরচ ও নিরাপত্তা সম্পর্কে বিস্তারিত জানা জরুরি।

সিলেট বর্ডার হাইকিংয়ের যাত্রা শুরু করতে হলে প্রথমে চলে আসতে হবে সিলেট শহরের আম্বরখানা পয়েন্টে। সেখান থেকে জনপ্রতি প্রায় ৮০ টাকা ভাড়ায় ট্যুরিস্ট বাসে যাওয়া যায় সাদাপাথর স্পটের নৌকা ঘাটে। ঘাট থেকে জনপ্রতি ১০০ টাকা ভাড়ায় ৮ জনের একটি নৌকায় চড়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে সাদাপাথরের মূল স্পটে। কিছুক্ষণ সাদাপাথরের সৌন্দর্য উপভোগ করে শুরু হবে আসল যাত্রা। সামনে গন্তব্য বিছানাকান্দি, পথটি এগিয়ে যাবে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে।

সাদাপাথর থেকে উৎমাছড়া পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলোমিটারের পথ। এই অংশটি চাইলে হেঁটেই পাড়ি দেওয়া যায়। তবে, পুরোটা হাঁটতে না চাইলে সড়কপথে সিএনজি নিয়ে উৎমাছড়া যেতে পারেন। সেক্ষেত্রে জনপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা খরচ পড়বে এবং ৫ জন যাত্রী হলে এই হিসাবে যেতে পারবেন। নাহলে, পুরো সিএনজি ভাড়া নিতে হবে প্রায় ৭০০ টাকা দিয়ে। অবশ্য দরদাম করে ভাড়া কিছুটা কমিয়ে নেওয়ারও সুযোগ আছে।


উৎমাছড়া থেকে শুরু হবে হাইকিংয়ের আরও রোমাঞ্চকর পর্ব। প্রায় দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা হাঁটার পর দেখা মিলবে স্বর্গীয় সৌন্দর্যে ঘেরা তুরুংছড়ার। এই পুরো পথেই সীমান্ত সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের পিলারগুলো চোখে পড়বে পথে পথে। অসাবধানতাবশত যেন সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের অংশে ঢুকে না পড়েন, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

সিলেট বর্ডার হাইকিংয়ের জন্য নির্দিষ্ট কোনো পথ নেই। তাই পথ চিনতে অভিজ্ঞ কারও সহযোগিতা নেওয়াই নিরাপদ। উৎমাছড়া থেকে বিছানাকান্দি পর্যন্ত স্থানীয় কিছু কিশোর বা তরুণ প্রায় ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকার বিনিময়ে পথ দেখিয়ে থাকে। তবে, এটি কোনো অফিশিয়াল গাইড সেবা নয়। তাই কাউকে সঙ্গে নেওয়ার ক্ষেত্রে অবশ্যই স্থানীয় পরিস্থিতি ও নিজের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

এই রুটের আরেকটি বিষয় মাথায় রাখা দরকার- সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাসিন্দারা সাধারণত পর্যটকদের বর্ডার লাইন ধরে হাঁটাকে খুব একটা স্বাভাবিকভাবে নেন না। বিভিন্ন কারণে এতে তাদের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে পারে। ফলে, স্থানীয় মানুষের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা বা তর্কে না জড়িয়ে তাদের প্রতি সম্মান দেখানোই বুদ্ধিমানের কাজ। তারা সাধারণত সীমান্ত পথের পরিবর্তে গ্রামের রাস্তা দেখিয়ে দেন। কিন্তু এই হাইকিংয়ের আসল সৌন্দর্যই তো সীমান্তঘেঁষা পাহাড়ি পথ, ছড়া ও প্রকৃতির মধ্যে হাঁটায়।


তুরুংছড়া পেরিয়ে কুড়িছড়া হয়ে আরও প্রায় দুঘণ্টা হাঁটলেই পৌঁছে যাওয়া যাবে বিছানাকান্দি মাঠে। বর্ডার হাইকিংয়ের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ এই বিছানাকান্দি। একদিকে বিস্তীর্ণ খেলার মাঠ, অন্যদিকে মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়ের সারি- সব মিলিয়ে জায়গাটির সৌন্দর্য অন্যরকম। কাছেই রয়েছে সুন্দর একটি ঝরনা। বিছানাকান্দির বটগাছের কাছ থেকে দেখতে পাওয়া যায় দারুণ দৃশ্য।

চেষ্টা করতে হবে বিকেল ৪টার মধ্যে বিছানাকান্দি পৌঁছানোর। কারণ, সন্ধ্যার পর মূল পর্যটন এলাকায় প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। সেখানে খাবার ও থাকার ব্যবস্থাও রয়েছে। হাতে থাকা সময়ের মধ্যেই দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানাকান্দি ঘুরে নিয়ে বিশ্রাম নিতে পারেন। এখানে মোটামুটি মানের হোটেলে জনপ্রতি প্রায় ২৫০ টাকার মধ্যে রাত কাটাতে পারবেন।

দ্বিতীয় দিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠুন। সকালের আলোয়, মানুষের ভিড় শুরু হওয়ার আগেই বিছানাকান্দির আসল সৌন্দর্য উপভোগ করুন। সকালের নাস্তা হিসেবে স্থানীয় দোকানগুলোতে চা-কফিসহ হালকা খাবারও পাওয়া যায়। নাস্তা ও প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি শেষে জনপ্রতি প্রায় ৩০ টাকা খরচে বিছানাকান্দির মূল নদী পার হয়ে আবার শুরু করতে হবে সীমান্তঘেঁষা পথের হাঁটা।


প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট হাঁটার পর দেখা মিলবে কুলুমছড়ার। সেখানে কিছুক্ষণ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করে আবার পা বাড়াতে হবে সামনে। দীর্ঘ হাঁটার পর পাবেন দিনের দ্বিতীয় গন্তব্য- লক্ষণছড়া। এখানে খুব কাছ থেকে দেখা যায় লক্ষণছড়ার ব্রিজ এবং দূরে মেঘে ঢাকা মেঘালয়ের পাহাড়। পাহাড়, মেঘ ও পানির এই মিলবন্ধন হাইকিংয়ের ক্লান্তি অনেকটাই ভুলিয়ে দেবে।

লক্ষণছড়া থেকে পরবর্তী গন্তব্য পান্থুমাই ঝরনা। প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা হাঁটার পর পৌঁছে যাবেন পান্থুমাই গ্রামে। সেখান থেকে উপভোগ করা যায় বিখ্যাত পান্থুমাই ঝরনার সৌন্দর্য, যেটি ভারতের অংশে ‘বড়হিল ফলস’ নামে পরিচিত। ঝরনাটি সীমান্তের ওপারে হলেও বাংলাদেশ অংশ থেকেই এর অপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করা যায়।

সময় হাতে থাকলে পান্থুমাই মাঠে গিয়ে ফুটবলও খেলতে পারেন। এক ঘণ্টার জন্য ৫০ টাকায় ফুটবল ভাড়া নিতে পারবেন। তবে মূল লক্ষ্য যেহেতু দীর্ঘ হাইকিং, তাই এখানে বেশি সময় না কাটিয়ে হালকা নাস্তা করে আবার রওনা দিন।

এরপর শুরু হবে দিনের সবচেয়ে দীর্ঘ হাঁটা। পান্থুমাই থেকে জাফলংয়ের দিকে প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা হাঁটার পর দেখা মিলবে মায়াবী ঝরনার। সেখান থেকে এগিয়ে শেষ পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে জাফলং জিরো পয়েন্টে। 


জিরো পয়েন্ট থেকে একটু উপরে উঠলেই পাওয়া যাবে বেশ কিছু খাবার হোটেল। সেখানে গোসল করে বা ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার সেরে নিতে পারেন। এরপর বিকেল ৪টার মধ্যে ঘুরে আসতে পারেন ‘বাংলাদেশ লাস্ট হাউস’। অটোরিকশায় জাফলংয়ের এই জনপ্রিয় জায়গায় যেতে জনপ্রতি প্রায় ৮০ টাকা (আসা-যাওয়া) খরচ হবে। ২০ টাকা প্রবেশমূল্য দিয়ে হাউসটি দেখতে যেতে হয়।

সবশেষে মামার বাজার অথবা তামাবিল বর্ডার এলাকা থেকে গেইটলক বাসে সিলেট শহরের উদ্দেশে রওনা দিন। ভাড়া জনপ্রতি প্রায় ১৫০ টাকা। সিলেট শহরে পৌঁছাতে সাধারণত দুই ঘণ্টা বা তার কিছু বেশি সময় লাগতে পারে। শেষ গন্তব্য কদমতলী বাস টার্মিনাল হলেও সুবিধামতো জায়গায় আপনি নেমে যেতে পারেন।

২ দিন ১ রাতের এই হাইকিং ট্যুরে সাদাপাথর টু জাফলং হাঁটতে হবে প্রায় ৪৮ কিলোমিটার। যদি উৎমাছড়া থেকে মূল হাইকিং শুরু হয়, তাহলে হাঁটতে হবে ৪১ কিলোমিটার। প্রথম দিন হাঁটতে হবে ২৫/১৮ কিলোমিটার। শেষ গন্তব্য হবে বিছানাকান্দি। দ্বিতীয় দিন হাঁটতে হবে মোট ২৩ কিলোমিটার। শেষ গন্তব্য হবে জাফলং।


চূড়ান্ত রুটম্যাপ
আম্বরখানা থেকে সাদাপাথর, সেখান থেকে উৎমাছড়া, সবুজ ছড়া, তুরুংছড়া, বিছানাকান্দি, কুলুমছড়া, লক্ষণছড়া, পান্থুমাই ঝরনা, খাসিয়া পুঞ্জি, মায়াবী ঝরনা হয়ে জাফলং এবং সবশেষে সিলেট শহর।

খরচ
সিলেট থেকে সিলেট পুরো যাত্রায় মূল যাতায়াত ও অন্যান্য খরচ হিসেবে আম্বরখানা থেকে সাদাপাথর ৮০ টাকা, নৌকা ১০০ টাকা, সাদাপাথর থেকে উৎমাছড়া বাইপাসে গেলে ১৫০ টাকা, নৌকা পারাপার ২০ টাকা, বিছানাকান্দিতে থাকা ২৫০ টাকা, পরবর্তী নৌকা পারাপার ৪০ টাকা, আরও একটি নৌকা পারাপারে ১০ টাকা, জাফলংয়ে অটোরিকশা ৮০ টাকা, বাংলাদেশ লাস্ট হাউসের প্রবেশ টিকিট ২০ টাকা এবং জাফলং থেকে সিলেট ১৫০ টাকা ধরতে পারেন। এর সঙ্গে দুদিনের খাবার ও অন্যান্য ব্যক্তিগত খরচ যোগ করতে হবে।

সতর্কতা
সীমান্ত এলাকায় কখনোই সীমারেখা অতিক্রম করা যাবে না। স্থানীয় মানুষ, সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলতে হবে। কোনো স্থানে ছবি তুলতে বা যেতে নিষেধ করা হলে, সেটি অমান্য করা উচিত নয়। প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে গিয়ে পরিবেশের ক্ষতি করা, ময়লা ফেলা কিংবা স্থানীয় মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় বিঘ্ন ঘটানো থেকেও বিরত থাকতে হবে। এছাড়া, পর্যাপ্ত পানিসহ প্রয়োজনীয় জিনিস সঙ্গে নিতে ভুলবেন না।

লেখক : প্রতিষ্ঠাতা, সেইভ টু এক্সপ্লোর

সময়ের আলো/মহু

  বিষয়:   সিলেট  বর্ডার হাইকিং  ভ্রমণ  সময়ের আলো 


Advertisement
Loading...
Loading...
ফিচার- এর আরো খবর
Loading...
Loading...
Advertisement
© 2026 Daily Shomoyer Alo
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সৈয়দ শাহনেওয়াজ করিম, আমিন মোহাম্মদ মিডিয়া কমিউনিকেশন লিমিটেড এর পক্ষে প্রকাশক মো. ফয়সাল রহমতউল্লাহ ফেরদৌস। নাসির ট্রেড সেন্টার, ৮৯, বীর উত্তম সি আর দত্ত সড়ক (সোনারগাঁও রোড), বাংলামোটর, ঢাকা।
ফোন : ৪১০৬২৩৬৮-৭৪, ফ্যাক্স : ৪১০৬২৩৭৫
সময়ের আলোর খবর পেতে ফলো করুন: